শিরোনাম:
পাইকগাছা, শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ন ১৪২৮
SW News24
সোমবার ● ৮ নভেম্বর ২০২১
প্রথম পাতা » উপকূল » ভয়াল ১২ নভেম্বর উপকূল দিবস চাই
প্রথম পাতা » উপকূল » ভয়াল ১২ নভেম্বর উপকূল দিবস চাই
৫৯ বার পঠিত
সোমবার ● ৮ নভেম্বর ২০২১
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

ভয়াল ১২ নভেম্বর উপকূল দিবস চাই

প্রকাশ ঘোষ বিধান

ভয়াল ১২ নভেম্বর। উপকূলবাসীর কাছে এক ভয়াবহ কালরাত হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭০ সালের এইদিনে বাংলাদেশের উপকূলে প্রবল শক্তি নিয়ে আঘাত করেছিল ‘ভোলা সাইক্লোন’। প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় দশ লক্ষ মানুষ। এখনও শোকগাঁথা মিশে আছে উপকূলের মাটি ও মানুষের মাঝে। এখনও বিরাজমান সেই দিনের ধ্বংসের ধারাবাহিকতা। উপকূলের প্রবীণ মানুষেরা স্বাক্ষী হয়ে আছেন সেই প্রলয়ের। উপকূলীয় দ্বীপচরসহ বহু এলাকার ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে বিরান জনপদে পরিণত হয়। এই ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতায় আজও অনেকে শিউরে ওঠেন। ২০১৭ সাল থেকে ১২ নভেম্বর উপকূল দিবস পালিত হয়ে আসছে।  ১৫ থেকে ২৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপগুলো প্লাবিত হয়। এ ঘূর্ণিঝড় গোটা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এটি সিম্পসন স্কেলে ক্যাটাগরি ৩ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় ছিল। একে ‘ভোলা সাইক্লোন’ও বলা হয়। এছাড়া দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও এ ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়ে। ---

ঘূর্ণিঝড়ে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে ভোলা এবং তৎকালীন নোয়াখালী (নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর) উপকূলে। রামগতি, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, ভোলা ও পটুয়াখালী পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। তজুমুদ্দিন উপজেলায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষের মধ্যে বেঁচে ছিল মাত্র ৭৭ হাজার। মনপুরা দ্বীপের ৩২ হাজার মানুষের মধ্যে ২০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। সাগর-নদী-খাল-বিলে ভেসে ছিল অসংখ্য লাশ। মৃতদেহের সৎকার করাও সম্ভব হয়নি। ঘরবাড়ি, স্বজন হারিয়ে পথে বসেন উপকূলের লাখ লাখ মানুষ। ওই সময়ে মানুষ আবহাওয়ার পূর্বাভাসও সঠিকভাবে পায়নি। কারণ আজকের মতো যোগাযোগব্যবস্থা সেদিন ছিল না। এ বছর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের অর্ধশত বছর পূর্ণ হচ্ছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এ ঘূর্ণিঝড়কে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করেছে। তথ্যমতে, ১২ নভেম্বর সন্ধ্যা থেকে ১৩ নভেম্বর ভোর পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়টি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৮৫ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানে।

ঘূর্ণিঝড়ের বাতাস, জোয়ার-ভাটার বিস্তৃতি ও লবণাক্ততার প্রভাব- এ তিনটি নির্দেশকের আওতাভুক্ত উপকূলীয় ১৯টি জেলা। এর মধ্যে ১৬ জেলা প্রত্যক্ষভাবে উপকূলবর্তী। এগুলো হল- পূর্ব উপকূলের ৬ জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর; মধ্য উপকূলের ৭ জেলা ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, শরীয়তপুর এবং পশ্চিম উপকূলের ৩ জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা। বাকি ৩ জেলা অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ; এগুলো হচ্ছে- যশোর, নড়াইল ও গোপালগঞ্জ। টেকনাফের নাফ নদের মোহনা থেকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল-কালিন্দী পর্যন্ত উপকূল অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার তটরেখা।

এসব উপকূলজুড়ে যেমন রয়েছে নানা সমস্যা; তেমনি রয়েছে অপার সম্ভাবনা। জাতীয় অর্থনীতিতে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল জিডিপিতে কম-বেশি প্রায় ২৫ শতাংশ অবদান রাখছে। বিপুলসংখ্যক মৎস্যজীবী সমুদ্র-নদীতে মাছ ধরে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন। সেই আহরিত মাছ জাতীয় অর্থনীতির বড় অংশীদার।

উপকূলের সমস্যা, সম্ভাবনা এবং মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার দাবি তুলে ধরতে উপকূলের জন্য একটি বিশেষ দিন অপরিহার্য। পত্রপত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে ২০১৬ সালে এই দিবসের প্রস্তাব তুলে জনমত গঠণের চেষ্টা । লেখার শিরোনাম ছিল- ‘১২ নভেম্বর হোক উপকূল দিবস’। সমগ্র উপকূল থেকেই ব্যাপক সাড়া পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো ১২ নভেম্বর বেসরকারিভাবে ‘উপকূল দিবস’ হিসাবে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপকূল দিবস বাস্তবায়ন কমিটির আহবানে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রায় ১০০ সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান দিবস পালনে এগিয়ে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, গণমাধ্যকর্মীদের সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, কিশোর-তরুণদের ফোরাম ইত্যাদি। দিবস পালনের প্রধান উদ্যোক্তা হিসাবে রয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উপকূল বাংলাদেশ, কোস্টাল জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ- আলোকযাত্রা। পাশাপাশি অন্যান্য সংগঠনও এ দাবির পক্ষে সোচ্চার রয়েছে।

উপকূলের প্রায় ৫ কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত বহুমুখী দুর্যোগের সঙ্গে বসবাস করেন। ঝড়-ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ এক জনপদ উপকূল। বৈরী প্রতিকূলতা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততার প্রভাব প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে ফেরে উপকূলের শ্রমজীবী মানুষকে। উপকূলের মানুষ প্রতিনিয়ত বহুমুখী দুর্যোগের সঙ্গে বসবাস করেন। কেবল দুর্যোগ এলেই এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খবরাখবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু স্বাভাবিক সময়েও তাদের জীবন যে কতটা অস্বাভাবিক, সে বিষয়ে খুব একটা খোঁজ রাখা হয় না। উপকূলের দিকে গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকদের নজর বাড়িয়ে উপকূলবাসীর জীবনমান উন্নয়ন করাই উপকূলের জন্য একটি দিবস প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য। আমাদের বিশ্বাস, ’৭০-এর ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের পাঁচ দশকে সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ১২ নভেম্বরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘উপকূল দিবস’ হিসেবে পালনের দাবি বাস্তবায়ন করবে---

১২ নভেম্বর ‘উপকূল দিবস’ প্রস্তাবের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে উদ্যোক্তারা বলেন, দিবস বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ১২ নভেম্বরকে বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে, ১৯৭০ সালের এই দিনটি উপকূলবাসীর জন্য স্মরণীয়। এদিন বাংলাদেশের উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যায় সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘ভোলা সাইক্লোন’। সরকারি হিসাবে ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় পাঁচ লাখ লোকের প্রাণহানি হয় বলা হলেও বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)২০১৭ সালের ১৮ মে বিশ্বের পাঁচ ধরনের ভয়াবহ প্রাণঘাতি আবহাওয়ার ঘটনার শীর্ষ তালিকা প্রকাশ করে। ওই তালিকায় বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়টিকে পৃথিবীর সর্বকালের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতি ঝড় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ দিনটিকে স্মরণে রাখতে ‘উপকূল দিবস’ দাবি।শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই এই দিনটি হোক ওয়াল্ড কোস্টাল ডে।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের উপকূলের নতুন নতুন দুর্যোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এগুলো সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তুলতেও একটি দিবসের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। যে দিবস উপকূল সুরক্ষার কথা বলবে,উপকূলের সংকট-সম্ভাবনার কথা বলবে, উপকূলকে এগিয়ে নেওয়া কথা বলবে। আর এভাবেই উপকূল এগিয়ে যাবে বিকাশের ধারায়। সে লক্ষ্যেই জেলা উপজেলায় পালিত হচ্ছে স্মরণসভা, আলোচনা সভা ও উপকূল দিবসের দাবিতে মানববন্ধন।

লেখকঃ সাংবাদিক



আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)