শিরোনাম:
পাইকগাছা, রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ৯ আশ্বিন ১৪২৯
SW News24
শনিবার ● ১৯ মার্চ ২০২২
প্রথম পাতা » মুক্তমত » বন প্রকৃতির প্রাণ
প্রথম পাতা » মুক্তমত » বন প্রকৃতির প্রাণ
১৮০ বার পঠিত
শনিবার ● ১৯ মার্চ ২০২২
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

বন প্রকৃতির প্রাণ

---প্রকাশ ঘোষ বিধান=

পরিবেশ সুরক্ষায় বনের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃতির প্রাণ বন। আর বন না থাকলে পরিবেশ বিপন্ন হবে। মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের পাশাপাশি প্রয়োজন সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশ। আর বনের বৃক্ষ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন, ছায়া, ফল ও ফুল দেয়। বন্যপ্রাণীদের খাবার ও আশ্রয় দেয়। বৃক্ষ ভূমিক্ষয়, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও বজ্রপাত থেকে মানুষকে রক্ষা করে। বন বাঁচলেই মানুষ বাঁচবে।

বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর যে পরিমাণ বন উজাড় হচ্ছে, তার তুলনায় বাংলাদেশে বেশি হচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে, বিশ্বব্যাপী ২০০০-২০১৫ সময়কালে প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বন উজাড় হয়েছে। বাংলাদেশে তা ২ দশমিক ৬ শতাংশ। দেশে বছরে ২ হাজার ৬শত হেক্টর বন উজাড় হয়। উজাড় হওয়া থেকে সংরক্ষিত বনও রক্ষা পাচ্ছে না। দেশে মোট বনভূমির পরিমাণ ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার ৭০০ একর। তবে বনভূমির একটি বিশাল অংশ প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে দখল করে নিচ্ছেন। বন বিভাগের উপস্থাপিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৫৮ একর বনভূমি দখল হয়ে গেছে। ১ লাখ ৬০ হাজার ৫৬৬ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান এসব বনভূমি জবরদখল করে রেখেছেন। জমি দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ, কৃষিকাজ থেকে শুরু করে তৈরি করা হয়েছে শিল্পকারখানা। বন বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দখলদারদের মধ্যে ৮৮ হাজার ২১৫ জন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৩ দশমিক শূন্য ৬ একর সংরক্ষিত বনভূমি দখল করেছেন। ৮২০ একর সংরক্ষিত বন দখল করে স্থায়ী স্থাপনাসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা করেছেন ১৭২ জন। ৪ হাজার ৯১৪ একর বন দখল করে ৩ হাজার ৩২৯ জন গড়েছেন হাটবাজার, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কটেজ, ফার্ম, রিসোর্ট ইত্যাদি। ঘরবাড়ি করেছেন ৫৮ হাজার ৪০৭ জন। স্থায়ী স্থাপনা না করে কৃষিকাজ, বাগান ইত্যাদি করেছেন ২৬ হাজার ৩০৭ জন। এ ছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন কাজে পাহাড়-টিলা কাটা বা অন্য কোনো উপায়ে ভূমিরূপ পরিবর্তন করা যাবে না বলা হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাহাড় কাটা চলছে। ফলে পাহাড়ি বন এবং পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে।

১৯৯২ সালে ‘রিও ঘোষণা’য় বন সৃজন ও রক্ষার্থে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় বন ও বনভূমির নিরাপত্তা রক্ষার্থে ২১ মার্চকে বিশ্ব বন দিবস ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে ২১ মার্চকে বিশ্ব বন দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে সারা পৃথিবীতে বনভূমির পরিমাণ কমে আসছে। কমে আসছে গাছপালা ও সবুজে আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণও। সেই সঙ্গে বিপন্ন হচ্ছে জীবজন্তু ও বন্যপ্রাণী। বিশ্ব বন দিবসের উদ্দেশ্য হলো দেশের প্রতিটি নাগরিককে বনভূমি ধ্বংসের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ এবং প্রত্যেককে সাধ্যমত বৃক্ষরোপণে সক্রিয় করা। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটা দৃশ্যমান হচ্ছে । যে সংখ্যক গাছ কাটা হয়েছে,রোপণ করা হয়েছে তার অনেক কম। তবে বন সংরক্ষনে সরকারের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা। গত ৭ ফেব্রুয়ারী সব ধরনের বন সংরক্ষণের বিধান রেখে ‘বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন আইন, ২০২২’ এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। খসড়া আইন অনুযায়ী, ব্যক্তি মালিকানায় লাগানো বড় গাছ কাটতেও সরকারের অনুমতি নিতে হবে।

পৃথিবীর মানুষ ক্ষুদ্রস্বার্থে বনভূমি ধ্বংস করছে। প্রকুতিকে রূপান্তর করছে ইট পাথরের নগরে।  পৃথিবীতে প্রতি বছর গড়ে এক শতাংশ বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে মানুষের হাতে। বিগত ৭০ বছরে পৃথিবীর মোট ক্রান্তীয় বনভূমির প্রায় ৫০ শতাংশ উজাড় হয়ে গেছে। প্রতি বছর পৃথিবী থেকে পৌনে ২ থেকে ২ কোটি হেক্টর বনভূমি মানুষের কর্মকান্ডে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে শুধু বনভূমিই নয় এর সঙ্গে বনে বসবাসকারী হাজার প্রজাতির কোটি কোটি জীব-জন্তুর জীবনও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

বর্তমান বিশ্বে শিল্পায়নের ফলে বায়ুমন্ডলে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে। ফলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চল লোনা পানিতে ডুবে গিয়ে সৃষ্ট হচ্ছে নানা ধরনের সমস্যা। মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে চাষাবাদ ব্যাহত ও সুপেয় পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। অসময়ে বন্যা, বৃষ্টিপাত ও নদীভাঙনের কারণে ফসলের যেমন ক্ষতি হচ্ছে তেমনি হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছে মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হলে বনভূমি সুরক্ষা করা খুব জরুরি।

কোনো দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য দেশটির মোট ভূমির ২৫ শতাংশে বনভূমি থাকা আবশ্যক। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে শতকরা ১৭ ভাগ জমিতে বনভূমি রয়েছে। আর বেসরকারি হিসেবে বনভূমির পরিমাণ আরো অনেক কম। বাংলাদেশের প্রধান বনভূমি সুন্দরবন দেশের মোট বনভূমির ৪৪ শতাংশ। নানা কারণে সুন্দরবনও আজ বিপন্ন হচ্ছে। এছাড়া আছে চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চল এবং মধুপুর, শ্রীপুর,  গাজীপুর, ভালুকা ও দিনাজপুরের শালবনসহ বিভিন্ন বনাঞ্চল, এ সবই সরকারি বনবিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন। বনবিভাগের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দুর্নীতি ও এক শ্রেণির রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের লোভের কারণে এসব সরকারি বনভূমি আজ হুমকির সম্মুখীন। ঢাকার ফুসফুস হিসেবে খ্যাত ভাওয়ালের গজারি বন আজ ধ্বংসের পথে। বন্যপ্রাণীরাও রেহাই পাচ্ছে না এদের হাত থেকে। বনভূমি উজাড় হওয়ার কারণে বিভিন্ন প্রজাতির বিপুল সংখ্যক প্রাণী আজ বিলুপ্তির মুখে।

বনবিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের জন্য কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগ নিয়ন্ত্রাধীন উখিয়া ও টেকনাফে ২ হাজার ২৭ একর সৃজিত বনভূমি এবং ৪ হাজার ১৩৬ একর প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়েছে। মোট ৬ হাজার ১৬৩ একর বনভূমি। হুমকির মুখে পড়েছে সেখানকার পরিবেশ, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য। এছাড়া বসতি স্থাপন করতে গিয়ে এশিয়ান হাতির আবাসস্থল ও বিচরণ ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন রক্ষায় বনবিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সক্রীয় করে তোলা। দখলকৃত বনভূমি উদ্ধার করে সেখানে বন সৃজন করা। বৃক্ষ ও বন্যপ্রাণী হত্যা এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করে ব্যবস্থা গ্রহণ। কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার নামে বনভূমি ধ্বংস যাবে না। বনের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি করতে হবে। মূলত নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই বন ও বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা অতীব জরুরি।

লেখকঃ সাংবাদিক



পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)