শিরোনাম:
পাইকগাছা, সোমবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৩, ১৭ মাঘ ১৪২৯

SW News24
সোমবার ● ১৬ জানুয়ারী ২০২৩
প্রথম পাতা » পরিবেশ » জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে
প্রথম পাতা » পরিবেশ » জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে
৩৫ বার পঠিত
সোমবার ● ১৬ জানুয়ারী ২০২৩
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে

বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে খুলনা জেলার সর্বদক্ষিণে উপকূলীয় এলাকা পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলায় বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে এলাকায় লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটছে। ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ। সুপেয় পানির অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। দিন দিন বাড়ছে এলাকায় লবণাক্ততার পরিমাণ। পৃথিবীতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন সময় অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, জলোচ্ছাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। এদিকে দিন যত গড়াচ্ছে ততই লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলার বিভিন্ন নদ-নদীতে। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে নানারকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, বন্যা, নদীভাঙ্গন উলে­খযোগ্য। আগে ১৫ কিংবা ২০ বছর পরপর বড় ধরণের কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে ২ থেকে ৩ বছর পরপরই বড় ধরণের দুর্যোগে হানা দিচ্ছে। ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্রাফ্ট এর তালিকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার আগে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জার্মান ওয়াচ-এর ২০১০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৯০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বড় ধরণের প্রায় ২৫টি দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। 
দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ বাংলাদেশ। এর দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। ভূতাত্তি¡কভাবে দেশটি থেকে উত্তর দিকে রয়েছে সুউচ্চ হিমালয় পার্বত্যঞ্চল। যেখান থেকে বরফগলা পানির প্রবাহে সৃষ্ট বড় বড় নদী দেশের ভিতর দিয়ে প্রবাহমান এবং নদীগুলি গিয়ে পড়েছে বঙ্গোপসাগরে। বর্ষাকালে নদীবাহিত পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে নদী উপচে পানি লোকালয়ে পৌঁছে যায় এবং বন্যার সৃষ্টি হয়। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন সময়ের ঘূর্ণিঝড় ও অতিরিক্ত জলোচ্ছাসের সময় সমুদ্র থেকে আসা লোনা পানি জেলার পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলার অনেক নিম্নভূমিতে ঢুকে পড়ে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। ফলে লবণাক্ততার পরিমাণ অনেকাংশে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের প্রভাবে ভেঙে পড়ে উপকূলীয় অঞ্চলের অবকাঠামো, ভেড়িবাঁধ। ফলে অবাধে লোনা পানি প্রবেশ করে জলবদ্ধতাকে স্থায়ী রূপ দেয়। অতিরিক্ত ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের ফলে রাস্তাঘাট, ভেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অপরদিকে লবণ পানি প্রবেশের ফলে ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। দেখা দেয় সুপেয় পানিরও মারাত্মক অভাব। এমনকি মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয় উপকূলের বাসিন্দারা। অতিরিক্ত লবণ পানির প্রভাবে বিভিন্ন গাছাপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত লবণাক্ততার ফলে অনেক কৃষককে কৃষির আবাদ করতে অনীহা দেখা গেছে। প্রতিবছর উপজেলার উপকূলীয় এলাকার উর্বর জমি লবণ পানিতে তলিয়ে গেলে, বৃষ্টিতে সেই লবণাক্ততা কাটাতে প্রায় দুই-তিন বছর সময় লাগে। কিন্তু লবণাক্ততা কাটতে না কাটতেই আবার প্লাবিত হয় এলাকা। 
 --- জানা গেছে, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর ১৯৯৫, ১৯৯৭, ২০০০, ২০০১ সালে ঘূর্ণিঝড় হলেও তা তেমন ক্ষয়ক্ষতি করেনি। এছাড়া ২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বলতে গেলে তেমন কোন ঘূর্ণিঝড়ই হয়নি। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে একদিকে যেমন বেড়েছে এসব জলোচ্ছাসের তীব্রতা, তেমনি বেড়েছে এদের সংখ্যা। ২০০৭ সালে ১৫ নভেম্বর আঘাত হানে সিডর এর প্রভাবকাটতে না কাটতে  ২০০৮ সালের ২ মে ধেয়ে আসে ঘূর্ণিঝড় নার্গিস, একই বছর ২৬ অক্টোবর রেশমি, ১৫ নভেম্বর খাইমুক, ২৬ নভেম্বর নিসা, ২০০৯ সালের ১৭ এপ্রিল বিজলি এবং একই বছর ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা, এরপর মহাসেন, তিতলি, ফণী, ২০১৯ সালে ৯ নভেম্বর বুলবুল, ২০২০ সালে ২০ মে আম্ফান ও ২০২২ সালে ২৫ অক্টোবরে সিত্রাং আঘাত হানে। এসব ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে পাইকগাছা-কয়রা উপজেলার বির্ভিন্ন স্থানের ভেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এসময় সমুদ্রের লোনাপানি বিভিন্ন ভেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়সহ ফসলের মাঠে প্রবেশ করে এবং স্বাদু পানিকে লোনা করে দেয়।
পাইকগাছার গড়ইখালী ইউনিয়নের বাইনবাড়িয়া গ্রামের খগেন্দ্রনাথ মন্ডল জানান, অতিরিক্ত লবণ পানির ফলে এলাকায় কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গড়ইখালী ইউনিয়নে তরমুজের ফলন একসময় খুবই ভালো হতো। কিন্তু বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে ফসলের জমিতে লবণ পানি ঢুকে পড়ে। ফসলের ক্ষেত লবণ পানিতে তলিয়ে যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে তরমুজ চাষে ব্যাপক ক্ষতি হয়। বেশি লবণাক্ততার ফলে তরমুজের বৃদ্ধি এবং উৎপাদনও কম হয়। লস্করের হরিপদ মন্ডল জানান, ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছাসে এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। এলাকার বাড়ি-ঘরসহ বিভিন্ন জায়গা লবণ পানিতে তলিয়ে যায়। সমুদ্রের লোনাপানি ভেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে এবং ফসলের মাঠে প্রবেশ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় লাখ লাখ মানুষের বসবাস দুর্বিষহ হয়ে উঠে। উপকূলীয় অঞ্চলে লোনাপানির কারণে নষ্ট হয়েছে সুপেয় পানি। প্রতিনিয়ত নদ-নদীর বাঁধভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। জলবায়ু প্রভাবের ফলে সবচেয়ে ঝুঁঁকিপূর্ণ এ এলাকার বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত বড় ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের স্বীকার হচ্ছে। বিভিন্ন সময় নদী ভাঙ্গনের ফলে এলাকা ছেড়ে লোকজন অন্য এলাকায়ও আশ্রয় নিচ্ছে। 

 

পাইকগাছার গড়ইখালীর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম কেরু জানান, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন সময় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের সৃষ্টি হচ্ছে। অতিরিক্ত জলোচ্ছাসের ফলে এলাকার রাস্তা-ঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লবণ পানি এলাকায় ঢুকে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ভেড়িবাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। বিভিন্ন গাছপালা অতিরিক্ত লবণাক্ততায় মারা যাচ্ছে। তিনি জানান, যে সব এলাকায় লবণ পানি ঢুকছে সেখানে ধান উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সুপেয় খাওয়ার পানির অভাব হচ্ছে মারাত্মক। খাবার পানি সংরক্ষণের জন্য এলাকায় ডরপ ও পানিই জীবন প্রকল্প এলাকায় পানির ট্যাংকি দিচ্ছে। 
ডরপ ও পানিই জীবন প্রকল্পের খুলনার পাইকগাছা, কয়রা ও বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার প্রকল্প সমন্বয়কারী মোঃ আবু সায়েম হোসেন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তাদের পক্ষ থেকে পানির ট্যাংক, বসত ঘর, সোলার পিএসএফ, নরমাল পিএসএফ দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, পাইকগাছা উপজেলার গড়ইখালী, কপিলমুনি, রাড়–লী, গদাইপুর এবং কয়রা উপজেলার কয়রা সদর, আমাদী, বাগালী ও মাহারাজপুর ইউনিয়নে তাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত দু’টি উপজেলা ৮টি ইউনিয়নে প্রায় ১১৫০টি পানির ট্যাংক ও ৩১ টি পিএসএফ, প্রজেক্ট থেকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জলবায়ু সহনশীল এ্যাটাষ্ট টয়লেট ২৮ টি প্রদর্শনীর জন্য ২টি উপজেলায় দেওয়া হয়েছে। আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র পরিবারের মাঝে পানির ট্যাংক এবং বসবাসের জন্য ৩৮টি ঘর প্রদান করা হয়েছিল। 
পাইকগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাগরে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ফসলের জমিতে লবণ পানি ঢুকে নিয়মিত ফসল উৎপাদন ব্যাহত করে। ফসলের ক্ষেত তলিয়ে যায়। ফসলের জমির উপরের মাটিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যায়। পরবর্তীতে স্বচ্ছ বৃষ্টির পানি এবং স্বচ্ছ নদীর পানিতে লবণাক্ততা কাটতে অনেক সময় লেগে যায়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তরমুজের ক্ষেতেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। উপজেলার সোলাদানা, লস্কর, গড়ইখালী ও দেলুটির কিছু অংশে লবণাক্ততার পরিমাণ বেশি থাকে। বর্ষা মৌসুমে নদীতে লবণাক্ততা কম থাকে। কিন্তু বর্ষা মৌসুম ছাড়া অন্য সময় যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় তাতে এলাকায় নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে এলাকায় লবণ পানি ঢুকে পড়ে। পাইকগাছার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা টিপু সুলতান জানান, লবণপানির জন্য মিষ্টি পানির মাছ বিলুপ্তির পথে। রুই, কাতলা, মৃগেল, শিং মাছ, মিষ্টি পানির টেংরা, কৈ, শোল মাছ আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। জলোচ্ছাসের ফলে ঘেরগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেশি।
কয়রার উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম জানান, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে জলোচ্ছাসের প্রভাবে ভেড়িবাঁধ ভেঙে এলাকায় লবণ পানি প্রবেশ করে। এতে যেমন ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হয়। তেমনি অনেক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করে থাকে। খাবার পানিরও মারাত্মক অভাব দেখা দেয়।
সংসদ সদস্য মোঃ আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, পাইকগাছা-কয়রা উপজেলায় সুপেয় পানি সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পানির ট্যাংক ও বদ্ধ খাল খনন করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেকসই ভেড়িবাঁধের জন্য দেড় হাজার কোটি টাকার যে প্রকল্পটা পাশ করেছিলেন তার মধ্য থেকে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর ১৬০ কোটি টাকার টেন্ডার হয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন স্থানে টেকসই ভেড়িবাঁধের কাজ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আস্তে আস্তে সকল কাজ সম্পন্ন হবে। পাইকগাছা-কয়রার নদী খননের কাজও চলমান রয়েছে। 

 





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)