শিরোনাম:
পাইকগাছা, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

SW News24
রবিবার ● ১৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » উপকূলীয় অঞ্চলের সমস্যা ও সম্ভাবনা
প্রথম পাতা » মুক্তমত » উপকূলীয় অঞ্চলের সমস্যা ও সম্ভাবনা
৭৩ বার পঠিত
রবিবার ● ১৯ এপ্রিল ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

উপকূলীয় অঞ্চলের সমস্যা ও সম্ভাবনা

---প্রকাশ ঘোষ বিধান

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, এবং বন্যা উপকূলীয় মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী, যা জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করে। সমস্যা থাকলেও উপকূলীয় অঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উপকূলীয় অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম।

উপকূলীয় অঞ্চল বলতে মূলত সমুদ্র বা বড় কোনো জলাশয়ের তীরবর্তী এলাকাকে বোঝায়। যেখানে স্থলভাগ ও জলভাগের সরাসরি সংযোগ ঘটে। বাংলাদেশের উপকূলীয় রেখা প্রায় ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা টেকনাফের নাফ নদীর মোহনা থেকে সাতক্ষীরার রায়মঙ্গল নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৪টি জেলায় বিস্তৃত ৩১০ কিমি সমতল ও সমুদ্রসৈকত, ১২৫ কিমি সুন্দরবন এবং ২৭৫ কিমি নদী মোহনা ও দ্বীপমালা। মোট ১৯টি জেলা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে খুলনা, বরিশাল এবং চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলো প্রধান।

ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে উপকূল তিনটি ভাগে বিভক্ত: পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চল, কেন্দ্রীয় উপকূলীয় অঞ্চল এবং পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল। উপকূলীয় অঞ্চল যা সমুদ্র ও স্থলভাগের মিলনস্থল, জোয়ার-ভাটা, লোনা পানি এবং ক্রমাগত ভূমি পরিবর্তনের মাধ্যমে গঠিত হয়। এই অঞ্চলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মৃদু ঢালু ভূমি, ম্যানগ্রোভ বন, পলি দোআঁশ মাটি, উচ্চ লবণাক্ততা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণতা। এখানে ভূমিরূপ প্রায়শই পরিবর্তিত হয়। সমুদ্র ও স্থলভাগের সংযোগস্থল, যা ভূমিরূপ পরিবর্তনের একটি গতিশীল এলাকা। মাটি সাধারণত পলি দোআঁশ প্রকৃতির এবং এতে লবণাক্ততা ও জৈব পদার্থের পরিমাণ কম থাকে। উপকূলীয় অঞ্চলে লোনা পানি ও মিষ্টি পানির মিশ্রণ দেখা যায়। এখানে জোয়ার-ভাটার প্রভাব অত্যন্ত বেশি।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের ১৯টি জেলা নিয়ে গঠিত, যা দেশের মোট ভূমির প্রায় ৩২ শতাংশ। দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ এই অঞ্চলে বাস করে। এখানে চট্টগ্রাম ও মোংলার মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এবং দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার অবস্থিত। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর, সুন্দরবন, এবং মৎস্য ও পর্যটন শিল্প এই অঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন অবস্থিত, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। তবে লবণাক্ততা বাড়ার কারণে সুপেয় পানির অভাব ও ফসলি জমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে।  জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চল নানা সমস্যার সম্মুখীন। এর মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানির তীব্র লবণাক্ততা, সুপেয় পানির অভাব এবং ঘনঘন ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস অন্যতম। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের প্রধান পেশা মৎস্য চাষ, মধু আহরণ, মাছ ধরা, চিংড়ি চাষ, লবণ উৎপাদন এবং সমুদ্রবন্দর ভিত্তিক কার্যক্রমের জন্য পরিচিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই অঞ্চলে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলটি চরম ঝঁকির মুখে রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং ক্রমাগত লবণাক্ততা বৃদ্ধি এখানকার অন্যতম প্রধান সমস্যা, যার ফলে কৃষি ব্যাহত হচ্ছে এবং সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রধান সমস্যাগুলো হলো সুপেয় পানির তীব্র সংকট, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, দুর্বল বেড়িবাঁধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট ভূমিহীনতা। লবণাক্ত পানি ভূগর্ভস্থ ও উপরিভাগের পানির উৎসগুলোকে দূষিত করছে, যা কৃষি ও স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। লবণাক্ততা ও দুর্যোগের কারণে কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং প্রথাগত মৎস্য চাষ হুমকির মুখে পড়ছে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে চর্মরোগ, ডায়রিয়া এবং নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

উপকূলের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো খাবার পানির অভাব। পুকুর ও বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল উপকূলের মানুষ, যা শুকনো মৌসুমে দুর্লভ হয়ে পড়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জোয়ারের পানিতে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে। এতে আবাদি জমি চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়ছে এবং সুপেয় পানির উৎস নষ্ট হচ্ছে।

উপকূলীয় অঞ্চল নিয়মিত ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং বন্যা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক এলাকার বেড়িবাঁধ জরাজীর্ণ, যা স্বাভাবিক জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসের সময় ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এর ফলে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। লোনা বাতাসের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাচীন স্থাপনা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদগুলো দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে ও বিলীন হওয়ার পথে।

বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক বিশাল উৎস।
সমুদ্রের বিশাল জলরাশি থেকে মাছ আহরণ, খনিজ সম্পদ গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান এবং সামুদ্রিক শৈবাল চাষের মাধ্যমে বিলিয়ন ডলার আয়ের সুযোগ রয়েছে। কক্সবাজার, কুয়াকাটা এবং সুন্দরবনের মতো বিশ্বখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রগুলো উপকূলীয় অঞ্চলেই অবস্থিত। পরিবেশবান্ধব বা ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়নের মাধ্যমে এখানে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।

উপকূলের বাতাসের গতিবেগকে কাজে লাগিয়ে বায়ুবিদ্যুৎ এবং অফুরন্ত সূর্যালোক ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। পায়রা ও মাতারবাড়ীর মতো গভীর সমুদ্র বন্দরগুলো দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যিক হাব হওয়ার ক্ষমতা রাখে। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশকে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেবে। দেশের লবণের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আসে উপকূল থেকে। এছাড়া আধুনিক পদ্ধতিতে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বন শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকেই রক্ষা করে না, বরং মধু, মোম ও গোলপাতার মতো কাঁচামালের বড় উৎস হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল দেশের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশের আবাসস্থল। ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে এই অঞ্চলটি যেমন অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এটি চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

প্রতিকুল পরিবেশে জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখতে না পেরে উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক মানুষ শহরমুখী হচ্ছে, যা জলবায়ু উদ্বাস্তু সমস্যা তৈরি করছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের এই সমস্যাগুলো সমাধানে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, লবণাক্ততা সহিষ্ণু কৃষির প্রসার এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুপেয় পানির টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)