শিরোনাম:
পাইকগাছা, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩

SW News24
শনিবার ● ২০ জুন ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে করণীয়
প্রথম পাতা » মুক্তমত » সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে করণীয়
২৯ বার পঠিত
শনিবার ● ২০ জুন ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে করণীয়

---সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের অমূল্য উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী ও জলজ সম্পদ। জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ শিকার এবং অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে এই বনের অনন্য বাস্তুতন্ত্র বর্তমানে চরম হুমকির মুখে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড় বনভূমির স্বাভাবিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে সুন্দরীর মতো গুরুত্বপূর্ণ গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। চোরা শিকার এবং বনজ ও জলজ সম্পদের অবৈধ আহরণ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতিসাধন করছে।

সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বা লবণাক্ত বনভূমি, যা জীববৈচিত্র্যের এক বিশাল আধার। বাংলাদেশ ও ভারত জুড়ে বিস্তৃত এই বনে প্রায় ১,৫১৫ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে ৬৯৩ প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও প্রায় ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। ১৯৯২ সালে জীববৈচিত্র্যের প্রাচুর্যের জন্য এটি রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে রয়েছে প্রায় ৪৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৫৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর এবং অসংখ্য প্রজাতির পাখি। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, মেছো বিড়াল, উদবিড়াল, বানর ও প্রায় ২৬০ প্রজাতির পাখির আবাসস্থল। এর মধ্যে রয়েছে মাছরাঙা, বক, শকুন, সাদা বুকযুক্ত মাছরাঙা এবং বিভিন্ন পরিযায়ী পাখি। নোনা পানির কুমির, ভারতীয় অজগর এবং বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ। গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিন সহ প্রায় ২১০ প্রজাতির মাছ রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, এবং অবৈধ শিকারের কারণে এই অনন্য জীববৈচিত্র্য বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বনের জলাশয় ও গাছপালা দূষণমুক্ত রাখা, বন্যপ্রাণী শিকার কঠোরভাবে বন্ধ করা, বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বনের ওপর মানুষের ক্ষতিকর হস্তক্ষেপ ও দূষণ বন্ধ করা এবং বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ প্রজনন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করবে হবে।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও সম্পদ টিকিয়ে রাখতে বন্যপ্রাণী ও মৎস্য সম্পদ শিকার বন্ধ করা। বাঘ, হরিণ, ডলফিনসহ বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীদের আবাসস্থল নিরাপদ রাখতে হবে এবং অবৈধভাবে গাছ কাটা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরার মতো ধ্বংসাত্মক প্রবণতা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও হরিণসহ বন্যপ্রাণী শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

সুন্দরবনের পাশে শিল্পকারখানা ও নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা। আইন অনুযায়ী সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ক্ষতিকর লাল শ্রেণীর শিল্পকারখানাগুলো দ্রুত সরিয়ে নিতে হবে। মোংলা বন্দর ও সংলগ্ন কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য যাতে পশুর নদ হয়ে বনে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং তেল ও বর্জ্য ফেলে যাতে নদী ও খালের পানি দূষিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বনের বুক চিরে চলে যাওয়া শেলা নদীসহ অন্যান্য সংবেদনশীল নদীপথে সব ধরনের বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে।

প্রজনন মৌসুমে বনের সার্বিক সুরক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছরের ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা। এই তিন মাস বনের অভ্যন্তরে মানুষের কোলাহল ও যাতায়াত বন্ধ রেখে বন্যপ্রাণী ও মৎস্য সম্পদের নিরাপদ বংশবৃদ্ধির সুযোগ দিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও পরিবেশ পুনরুদ্ধার করতে হবে। উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়িয়ে বনের লবণাক্ততা দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বনের ক্ষয়ে যাওয়া অংশে স্থানীয় প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করে বনাঞ্চল পুনর্নির্মাণ করতে হবে। বনের মিষ্টি পানির পুকুরগুলো সংস্কার করতে হবে, যাতে বন্যপ্রাণী সহজে খাবার পানি পায়।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। বাওয়ালি, মৌয়াল ও জেলেদের বনের ওপর নির্ভরতা কমাতে টেকসই বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা। বনের ওপর চাপ কমাতে বন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের জন্য গবাদিপশু পালন, কুটিরশিল্প বা অন্যান্য টেকসই আয়ের বিকল্প সুযোগ তৈরি করতে হবে। সুন্দরবনে ইকো-ট্যুরিজম বা পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যেন পর্যটকদের অসচেতনতায় বনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের কোনো ক্ষতি না হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, এবং মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপ থেকে এই প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ চলমান রয়েছে। বন সুরক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করে অংশীদারিত্ব বাড়াতে হবে। স্থানীয়দের মাঝে বনের অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরতে নিয়মিত সভা-সেমিনার করতে হবে। বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বন বিভাগের নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে।





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)