শনিবার ● ২৭ জুন ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণে সাংবাদিকই এখন সাংবাদিকের বড় শত্রু
নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণে সাংবাদিকই এখন সাংবাদিকের বড় শত্রু
প্রকাশ ঘোষ বিধান
নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের কারণে বর্তমানে একজন সাংবাদিক অন্য আরেকজন সাংবাদিকের বড় শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। বস্তুনিষ্ঠতা, সততা ও পেশাদারিত্বের অভাব এবং ব্যক্তিস্বার্থ, হলুদ সাংবাদিকতা ও ক্ষমতার তোষণ নীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে আজ গণমাধ্যমের এই অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি হয়েছে।
সাংবাদিকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পেশাগত হিংসা এবং নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণে সাংবাদিকই এখন সাংবাদিকের বড় শত্রু উক্তিটি বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে একটি বহুল আলোচিত সত্যে পরিণত হয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ, করপোরেট সংস্কৃতির প্রভাব এবং রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি এই পেশার অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
চরম নৈতিক অবক্ষয় এবং পেশাদারিত্বের অভাবে বর্তমানে একজন সাংবাদিক আরেকজন সাংবাদিকের বড় শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। বস্তুনিষ্ঠতা, সততা ও জনস্বার্থকে পাশ কাটিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি, কর্পোরেট স্বার্থ এবং অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা পুরো সাংবাদিকতা পেশাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাংবাদিক নিজের স্বার্থ, দলীয় আনুগত্য এবং অনৈতিক চর্চার কারণে অন্য আরেকজন সাংবাদিকের বড় শত্রু হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পেশাগত আদর্শ ও বস্তুনিষ্ঠতার অভাব এবং অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের প্রবণতা পুরো সাংবাদিকতা পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও পেশাটির অধঃপতনের মূলে হলুদ সাংবাদিকতা ও চাঁদাবাজি। কিছু অসাধু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ে লিপ্ত থাকে। তারা সৎ ও প্রকৃত সাংবাদিকদের কাজকে বাধাগ্রস্ত করে এবং পুরো সমাজের কাছে পেশাটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। মতাদর্শগত বিভাজন ও দলীয় আনুগত্যের কারণে সংবাদকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েন।
রাজনৈতিক বা করপোরেট স্বার্থ রক্ষায় একদল অন্য দলের সাংবাদিকদের আক্রমণ করেন, যা পেশাদারিত্বের চেয়ে বিরোধকেই বড় করে তোলে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বড় অন্তরায় হলো তোষণ নীতি। ক্ষমতাবানদের তোষণ করতে গিয়ে অনেক সময় সাংবাদিকরাই অন্য সহকর্মীদের সত্য প্রকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান।
বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের পদ-পদবি দখল ও নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে সহকর্মীদের প্রতি চরম বিদ্বেষ তৈরি হয়। ক্ষমতার লোভে অনেক সময় নিজেদের সহকর্মীর বিরুদ্ধেই মিথ্যাচার বা ষড়যন্ত্র করা হয়। অনুসন্ধানী ও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কাদা ছোড়াছুড়ি এখন অনেক বেশি দেখা যায়, যা সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাংবাদিকের অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো এখন পেশাগত অধিকার রক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থ রক্ষায় বেশি ব্যস্ত থাকে। ফলে এক দলের সমর্থক সাংবাদিক অন্য দলের সহকর্মীকে প্রকাশ্য শত্রু মনে করেন। নিজের স্বার্থ হাসিল বা অন্য সহকর্মীকে হেনস্তা করতে অনেক সময় ভিত্তিহীন খবর প্রকাশ করা হয়। এতে পুরো সাংবাদিক সমাজের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়।
সংবাদমাধ্যমের কাটতি বাড়ানো বা ভিউ পাওয়ার জন্য সহকর্মীদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। কোনো সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক পেশাগত কারণে বিপদে পড়লে, অন্য অনেক সাংবাদিক তার পাশে দাঁড়ানোর বদলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য না থাকায় বাইরের কোনো পক্ষ যখন সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা মামলা করে, তখন তার বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয় না।
পেশায় একে অপরকে সহযোগিতা করার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, হিংসা এবং কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি সাংবাদিকতার ঐক্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিভিন্ন সাংবাদিক ইউনিয়ন বা ক্লাবের নির্বাচন ও রাজনীতিকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমকর্মীরা নানা উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে নিজেদের মধ্যে চরম শত্রুতা তৈরি হয়।
অনেক সময় সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে সহকর্মী বা প্রতিপক্ষ সাংবাদিকদের ব্ল্যাকমেইল বা মিথ্যা সংবাদ দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়। পেশাদারিত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত আক্রোশ ও অর্থ উপার্জন এখানে মুখ্য হয়ে ওঠে। অর্থের বিনিময়ে বা প্রভাবশালীদের চাপে সত্যকে আড়াল করা, বিকৃত করা বা অন্যের ভালো কাজকে বিতর্কিত করা এখন প্রায়ই দেখা যায়। সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক বা সহকর্মীদের কাজের প্রতি সহযোগিতামূলক মনোভাব কমে গিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ কাদা ছোড়াছুড়ির কারণে সাধারণ মানুষ সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। সৎ ও সাহসী সাংবাদিকরা নিজেদের সহকর্মীদের কাছ থেকেই পর্যাপ্ত সমর্থন না পেয়ে একা হয়ে পড়ছেন এবং একপর্যায়ে আপস করতে বাধ্য হচ্ছেন। এই ক্ষয়িষ্ণু প্রবণতা রোধ করতে পেশার নীতি-নৈতিকতা মেনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বজায় রাখতে হলে এই অভ্যন্তরীণ বিভেদ দূর করা অত্যন্ত জরুরি। পেশাদারিত্ব এবং সাংবাদিকতার মূল আচরণবিধি অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল এই সংকটের সমাধান সম্ভব।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ ও অন্যান্য গণমাধ্যম সংগঠনগুলোর মাধ্যমে নিয়মিত নৈতিকতার চর্চা এবং জেন্ডার সেনসিটিভ ও দায়িত্বশীল রিপোর্টিং বিষয়ে পেশাগত প্রশিক্ষণ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। সাংবাদিকতা একটি জনসেবামূলক দায়িত্ব, তাই পেশার মর্যাদা রক্ষায় সাংবাদিকদের নিজেদেরই নৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট






কার্পেটিং শক্ত হতে প্রকৌশলগত সময়ের প্রয়োজন; কাঁচা কার্পেটিং তুলে ফেলার প্রবণতা রুখতে হবে
জনসংখ্যা একটি দেশের সম্পদ এবং সমস্যা উভয়ই হতে পারে
বুদ্ধির খেলা দাবা
আন্তর্জাতিক চুম্বন দিবস
বর্ষাকাল উপকূলীয় মানুষের জন্য বিপদসংকুল সময়
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি
বিশ্বজুড়ে সংকটে শরণার্থী
সংগীত মানুষের মনে নাড়া দেয় 