শিরোনাম:
পাইকগাছা, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

SW News24
সোমবার ● ১২ অক্টোবর ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্র মেনে তৈরি দুর্গা প্রতিমা পবিত্র শিল্পকর্ম
প্রথম পাতা » মুক্তমত » সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্র মেনে তৈরি দুর্গা প্রতিমা পবিত্র শিল্পকর্ম
৪ বার পঠিত
সোমবার ● ১২ অক্টোবর ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্র মেনে তৈরি দুর্গা প্রতিমা পবিত্র শিল্পকর্ম

সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্র এবং ঐতিহ্য মেনে দুর্গা প্রতিমা তৈরি একটি অত্যন্ত পবিত্র এবং নিয়মতান্ত্রিক শিল্পকর্ম। প্রতিমা তৈরির প্রতিটি পদক্ষেপে সুনির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক নিয়ম জড়িয়ে রয়েছে, যা মূলত শুল্বসূত্র এবং মৎস্যপুরাণ-এর মতো প্রাচীন গ্রন্থে বর্ণিত শিল্পশাস্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্র ও পুরাণ অনুসারে দুর্গা প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম, ধ্যানমন্ত্র এবং গঠনগত বিধান অনুসরণ করা হয়। ইচ্ছেমতো বা বিকৃত রূপ দিয়ে প্রতিমা তৈরি শাস্ত্রসম্মত নয়।

ধর্মীয় নীতি ও শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে দুর্গা প্রতিমা তৈরি একটি অত্যন্ত পবিত্র এবং সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস এবং মৎস্যপুরাণ ও দেবীমাহাত্ম্য; শ্রীশ্রীচণ্ডী অনুযায়ী, দুর্গা প্রতিমা তৈরির প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট আচার ও নিয়ম মেনে চলতে হয়।সনাতন ধর্মে প্রতিমা নির্মাণ কেবল একটি শিল্প নয়, এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক সাধনা ও লোকাচারের অংশ।

প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয় কাঠামো পূজার মাধ্যমে। সাধারণত রথযাত্রার দিন বা জন্মাষ্টমীর মতো শুভ তিথিতে প্রতিমা তৈরির কাঠের ভিত্তি বা কাঠামোটি পূজা করা হয়। কাঠ এবং বাঁশ দিয়ে দেবীর অবয়ব বা কঙ্কাল তৈরি করা হয়, যা প্রতিমার পুরো ওজন ধরে রাখে।

শাস্ত্রীয় ও ঐতিহ্যগত নিয়ম অনুসারে, প্রতিমা তৈরির মাটি সাধারণ কোনো মাটি নয়। এতে কয়েকটি বিশেষ উপাদান মেশানো বাধ্যতামূলক।শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, দুর্গা প্রতিমা তৈরিতে বিশেষ কিছু স্থানের মাটির প্রয়োজন হয়, যাকে পঞ্চমৃত্তিকা বা পাঁচ ধরনের মাটি বলা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বেশ্যালয়ের বা পতিতালয়ের দরজার মাটি প্রতিমা তৈরির জন্য আবশ্যক। মনে করা হয়, একজন ব্যক্তি যখন সেখানে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তার সমস্ত পুণ্য ও পবিত্রতা দরজায় রেখে ভেতরে যান। তাই ওই মাটি অত্যন্ত পবিত্র হয়ে ওঠে। এ ছাড়া নদীর তীরের মাটি, গোয়ালঘরের মাটি, চৌমাথার (চার রাস্তার মোড়) মাটি এবং রাজপ্রাসাদের বা রাজদ্বারের মাটি সংগ্রহ করতে হয়। এছাড়া সমাজ থেকে অবহেলিত এই নারীদের সম্মান জানানো এবং দেবীর সর্বজনীন রূপ ফুটিয়ে তুলতেও এই প্রথা পালন করা হয়। এই মাটি পুরোহিত নিজে গিয়ে চেয়ে নিয়ে আসেন, এটি জোর করে বা টাকা দিয়ে কেনার নিয়ম নেই।

বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণ বা অন্যান্য শাক্ত ও পৌরাণিক শাস্ত্রের নির্দেশিত ধ্যানমন্ত্র অনুসারে দেবীর রূপ কল্পনা করতে হয়। নিজের ইচ্ছামতো বা দৃষ্টিকটু আধুনিক থিমের নামে শাস্ত্রবিরোধী রূপ দেওয়া অনুচিত। দেবী দুর্গা সাধারণত দশটি হাতে বিভিন্ন অস্ত্রধারী এবং সিংহবাহিনী রূপে মহিষাসুরমর্দিনী হিসেবে প্রতিমা তৈরি হন। তার পদমূলে মহিষাসুর অবস্থান করে।

সাধারণত প্রতিমার ভেতরের কাঠামো তৈরি করা হয় বাঁশ ও খড় দিয়ে। কোনো কৃত্রিম বা প্লাস্টিকের জিনিস এখানে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। শাস্ত্রে প্রতিমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুনির্দিষ্ট পরিমাপ দেওয়া আছে। দেবী দুর্গার মূর্তি সাধারণত দশতাল ( মাথার পরিমাপের দশ গুণ) নিয়মে তৈরি হয়। দেবী দুর্গার দশটি হাত মহাবিশ্বের দশটি দিক  রক্ষা করার প্রতীক।

ঐতিহ্যগতভাবে প্রতিমায় রাসায়নিক রঙের বদলে খড়িমাটি, ভূষো কালি, শিউলি ফুলের বোঁটার রস, এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে রং করার নিয়ম। শাস্ত্রে দেবীর গায়ের রং তপ্তকাঞ্চনবর্ণ (গলানো সোনার মতো উজ্জ্বল হলুদ বা সোনালী) বা অতসী পুষ্পবর্ণ (উজ্জ্বল হলুদ) হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

মা দুর্গা দশভূজা এবং তিনি মহিষাসুরমর্দিনী রূপে সিংহের পিঠে চড়ে অসুর বধ করছেন। দেবীর পায়ের নিচে মহিষাসুর এবং সিংহের অবস্থানও শাস্ত্রীয় পরিমাপ অনুযায়ী নিখুঁত হতে হয়। দেবীর ডানে থাকেন দেবী লক্ষ্মী ও গণেশ এবং বামে থাকেন দেবী সরস্বতী ও কার্তিক। প্রতিমার চালচিত্রে বা দেবীর মাথার ওপরে ভগবান শিবের ছবি বা ছোট মূর্তি থাকা বাধ্যতামূলক, কারণ শিব ছাড়া দুর্গা পূজা অসম্পূর্ণ।

দেবী দুর্গার চোখ বা চক্ষুদান এটি প্রতিমা তৈরির সবচেয়ে পবিত্র অংশ। মহালয়ার দিন বা শুক্লা দ্বিতীয়া-তৃতীয়া তিথিতে শিল্পী সম্পূর্ণ উপবাস থেকে অত্যন্ত ভক্তি সহকারে দেবীর চোখ আঁকেন, যাকে চক্ষুদান বলা হয়। চক্ষুদান সম্পন্ন হওয়ার পরই প্রতিমার নির্মাণ কাজ ধর্মীয়ভাবে সমাপ্ত বলে গণ্য হয় এবং প্রতিমাটি পূজার মণ্ডপে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। পরবর্তীতে ষষ্ঠীর দিন বোধন ও প্রাণপ্রতিষ্ঠা আচারের মাধ্যমে এই মৃন্ময়ী (মাটির) প্রতিমায় দেবীর চিন্ময়ী রূপ বা প্রাণের আবাহন জানানো হয়।





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)