শিরোনাম:
পাইকগাছা, শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৩ আশ্বিন ১৪২৮
SW News24
বুধবার ● ১ আগস্ট ২০১৮
প্রথম পাতা » উপ-সম্পাদকীয় » সাহিত্যে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর অবদান
প্রথম পাতা » উপ-সম্পাদকীয় » সাহিত্যে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর অবদান
১২৯৪ বার পঠিত
বুধবার ● ১ আগস্ট ২০১৮
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

সাহিত্যে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর অবদান

---
প্রকাশ ঘোষ বিধান।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বাঙ্গালী জাতির ভাগ্যাকাশের এক উজ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন একধারে একজন আদর্শ শিক্ষক, ভারতবর্ষে বিজ্ঞানী  গড়ার জনক, শিল্পস্র্রষ্ঠা, সমাজসেবক, সমবায় আন্দোলনের পুরধা, রাজনৈতিক, সু-সাহিত্যিক এবং বহুগুণের অধিকারী একজন মহান দেশপ্রেমিক। প্রাচীন ভারতে যে রসায়ন চর্চা হতো এবং এ্যালকেলী শাস্ত্রের প্রচলন ছিল তা “হিন্দু রসায়ন শাস্ত্রের ইতিহাস” রচনা করে ভারতের অতিত  ঐতিহ্য বিশ্বের বিজ্ঞানীদের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হন। তার মার্কিউরাস নাইট্রইট আবিষ্কার বিশ্বে এক যুগন্তকারী ঘটনা।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ১৮৬১ সালের ২ আগষ্ট খুলনা জেলার পাইকগাছার রাড়–লী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৮৭০ সাল পর্যন্ত তিনি গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। ১৮৭০ সালের আগষ্ট মাসে পিতা মাতার সাথে কলকাতায় যান আধুনিক শিক্ষা লাভের জন্য। ১৮৭১ সালে তিনি হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু আমাশয় রোগে আক্রন্ত হয়ে ১৮৭২-৭৩ সালে তিনি গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করেন। এ সময় তিনি তার পিতার পাঠাগারে নিজের উদ্যোগে নিরলস অধ্যায়ন করেন। তার পিতা হরিশ্চন্দ্র রায় ছিলেন পণ্ডিত, বহু ভাষাবিদ ও বিদ্যোৎসহী। তার বাড়িতে ছিল একটি বিসাল পাঠাগার মাত্র ১২ বছর বয়সে ইংরেজি-ফার্সি সহ ৫টি ভাষা আয়ত্ব করতে সক্ষম হন। ১৮৭৪ সালে তাকে কেশবচন্দ্র সেন প্রতিষ্ঠিত কলকাতার এলবার্ট স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। এই স্কুল থেকে ১৮৭৮ সালে এন্ট্রাস পাশ করেন। ১৮৭৯ সালে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত মেট্রপলিটন কলেজ ইনষ্টিটিউশনে ভর্তি হন এবং ১৮৮১ সালে এই কলেজ থেকে এফ,এ পাশ করেন। এফ,এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএ’তে ভর্তি হন। ইংরেজী সাহিত্য ও ইতিহাসের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল। রসায়ন শাস্ত্রের প্রতি বিশেষ অনুরাগ থাকায় বিএ শ্রেণীতে রসায়ন ও পদার্থ বিজ্ঞানে (ডাবল) অনার্স কোর্সে পড়াশুনা করেন। ১৮৮২ সালে আন্তর্জাতিক গিল ক্রাইস্ট স্কালারশিপ পেয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে ইংল্যান্ডের এডিনবার্গ বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়তে যান। ১৮৮৪ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৮৫ সালে ওহফরধ ইবভড়ৎব ধহফ ধভঃবৎ ঃযব সঁঃরহু (সিপাহী বিদ্রোহের পূর্বে এবং পরে ভারতের অবস্থা) শীর্ষক প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি এই প্রবন্ধে ব্রিটিশ সরকারের সমালচনা করার কারনে পুরস্কার লাভে বঞ্চিত হলেও গুণীজন কর্তৃক প্রশংসিত হন। ১৮৮৬ সালে তার ঊংংধুং ড়ভ ওহফরধ প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে বিদগ্ধ মহলে প্রশাংসিত হন। ঙহ চবৎরড়ফরপ পষধংংরভরপধঃরড়হ ড়ভ বষবসবহঃং এই থিসিস রচনার জন্য ১৮৮৭ সালে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় হতে ডিএসসি ডিগ্রী লাভ করেন। এই বছর তিনি হোপ প্রাইজ সহ দুইটি বৃত্তি লাভ করেন। ১৮৮৯ সালে কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে সহকারী অধ্যাপক পদে যোগদান করেন।
প্রফুল্লচন্দ্র রায় শুধু বিজ্ঞানী ছিলেন না। তিনি উচুমানের দার্শনিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, লেখক ও সু-সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি রসায়ন পদার্থ ও জীববিজ্ঞান ছাড়াও প্রকৃতি বিজ্ঞানের উপর অসংখ্যাক প্রবন্ধ ও গ্রন্থ লিখেছেন। বাঙালিকে আত্মসচেতন করে গড়ে তোলার জন্য তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধ ও গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে সঙ্কট উত্তরনের পথ দেখিয়েছেন। তিনি কঠিন বাস্তবতার সাথে সাহিত্যিক আবেগের সমন্বয় করেছেন। ১৮৯৫ সালে মার্কিউরিয়াস নাইট্রেড আবিষ্কারের পর হাইপোনাইট্রেইড অব মার্কারি এবং অন দি ইণ্টার এ্যাকশন অব মার্কিউরিয়াস নাইট্রেইড এন্ড ইথাইল আয়োডাইড আবিষ্কার করেন। এ সংক্রান্ত গবেষনা কার্য প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি বিশ্ববিখ্যাত রসায়নবিদের মর্যাদা লাভ করেন। ইউরোপিয় বিজ্ঞানীরা তাকে “মাস্টার অব নাইট্রাইস” এই দূলর্ভ আখ্যায় ভূষিত করেন।
প্রায় দুইশো বছর আগে অবিভক্ত বাংলায় বাংলা ভাষার বিজ্ঞান চর্চা শুরু হয়। ১৮০০ সালে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর শ্রীরামপুরে ইংরেজ মিশনারীদের মাধ্যমে বাংলায় গদ্য সাহিত্যের সুচনা হয়। গত শতাব্দির শেষের দিকে বেশ কিছু বিজ্ঞান পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা বঙ্গদর্পন, আর্যদর্শন, ভারতী প্রভৃতি প্রত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এসব পত্রিকায় যারা লিখতেন তাদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য অক্ষয় কুমার দত্ত, রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী, জগদীশ চন্দ্র বসু,  প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মেঘ নাথ শাহা,  সত্যেন বসু প্রমুখ। বঙ্কিম চন্দ্র কিছু বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ বঙ্গদর্শন পত্রিকায় লেখেন। রবিন্দ্রনাথও বিশ্বপরিচয় শীর্ষক বিজ্ঞান প্রবন্ধ লেখেন।
প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছাত্র জীবন থেকেই লেখা শরু করেন। সাহিত্য দিয়েই তার জ্ঞান চর্চা শুরু হয়েছিল। ১৮৮৫ সালে তিনি এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র যখন সিপাহী বিদ্রোহের আগে ও পরে ভারতবর্ষে অবস্থা শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এ প্রবন্ধটি পরে “স্কটম্যান” পত্রিকায় প্রশংসিত হয়। কুসংস্কার বর্জন করে নবীন যুবকদের মৌলিক চিন্তা ও যুক্তিবাদে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তিনি বাঙালির মস্তিষ্ক ও তাহার অপব্যবহার নামক পুস্তিকা রচনা করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার সময় তিনি লক্ষ করেন যে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষার কোন বই নেই। এ অভাববোধ থেকে তিনি বিজ্ঞান বিষয়ক বই রচনা করেন। ১৮৯২ সালে “প্রাণী বিজ্ঞান” নামে বই প্রকাশ করেন। রসায়নে ভারতীয় দক্ষতা তুলে ধরার জন্য উদ্যোগ নেন। ঐরংঃড়ৎু ড়ভ যরহফঁ পযবসরংঃৎু রচনা করেন। গ্রন্থটি দুই খন্ডে বিভক্ত। প্রথম খন্ড ১৯০২ সালে এবং দ্বিতীয় খন্ড ১৯০৯ সালে প্রকাশিত হয়। তার বিজ্ঞান ও সাহিত্য অসাধারণ পাণ্ডিত্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রন বাস্তবতার সাথে সাহিত্যিক আবেগের স্বমন্ময় সাধন করেছেন। ১৯১৮ সালে তার ঊংংধুং ধহফ ফরংপড়ঁৎংবং বইটি প্রকাশিত হয়। ইংল্যান্ড ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বইটি খুব সমাদৃত হয়। ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে ‘নেচার’ পত্রিকায় প্রফুল্লচন্দ্র রায় সম্বন্ধে রাসায়নবিদ স্যার এডওয়ার্ড থার্প মন্তব্য করেন- স্যার পি,সি রায় শীর্ঘ্রই সাধারণের সম্পতি বলিয়া গণ্য হইবেন এবং জাতীয় কল্যানের পথ নির্দেশ করিবেন। থর্পের এ কথা বাস্তবতা পায়। সাহিত্য ক্ষেত্রে তার বড় অবদান খরভব ধহফ ঊীঢ়বৎরবহপবং ড়ভ ধ ইধহমধষর পযবসরংঃৎু  বইটি। এই বইয়ে যে শুধু রসায়নের কথা নেই, দুনিয়ার অনেক কথা ও ঘটনা এতে স্থান পেয়েছে। একে বিশ্বকোষ বলা যায়। ১৯৩৭ সালে এই বই খানিকে “আতœচরিত” নাম দিয়ে বাংলায় প্রকাশ করেছিলেন। বইটি সম্পর্কে মোহন মিশ্র বলেন- বইটি চরিত সাহিত্যের ইতিহাসে একখানি স্বরনীয় গ্রন্থ।
প্রফুল্লচন্দ্র রায় কর্ম বহুল জীবনে বিজ্ঞান গবেষনার সাথে সাথে সাহিত্যকে তার জীবন সঙ্গী করে নিয়েছিলেন। তিনি আজন্ম প্রতিভাবান ছিলেন। তিনি নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করতেন। বাঙালি জাতিকে আতœ সচেতন করে গড়ে তোলার জন্য তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধ ও গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে সংকট উত্তরনের পথ দেখিয়েছেন। বিজ্ঞান চর্চায় বিজ্ঞান সাহিত্যে তার অবদান অনিসিকার্য। তার রচনা বলির পরিমান প্রচুর না হলেও তিনি যা রচনা করেছেন তা অভিনবত্ব, প্রেরনায় উজ্জিবিত ও বৈশিষ্ট মন্ডিত। তিনি ১৬০টি মূল্যবান গবেষনা পত্র, শতাধিক প্রবন্ধ, ৩৪ টি বই রচনা করেছেন । এর মধ্যে ২২টি বাংলায় এবং ১২টি বই ইংরেজিতে। বাঙালিকে আতœসচেতন করে গড়ে তোলার জন্য যে সব গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রচনা- অধ্যায়ন ও সাধনা,  দেশি রঙ, নব্য রসায়ন বিদ্যা ও তার উতপ্তি, খাদ্য বিজ্ঞান, হিন্দু রসায়নবিজ্ঞান, ব্যবসা বানিজ্য ও বিদ্যা শিক্ষা, জীবন সংগ্রামে বাঙালী, মাতৃভাষার অনাদর, ডিগ্রীর মোহ ও অভিশাপ, যুগ সমস্যা ও ছাত্র গণের কর্তব্য, মিথ্যা সহিত আপোষ ও শান্তি ক্রয়, সভ্যাতার মাপকাঠি ইত্যাদি। তিনি প্রখ্যাত রসায়ন বিদ মিঃ বার্থেলোর উৎসাহে ভারতের হিন্দু রসায়ন শাস্ত্র রচনায় ব্রতি হন। তিনি বৈদিক যুগ হতে মধ্য যুগ পর্যন্ত ভারতবর্ষের রসায়ন শাস্ত্রের উন্নতির ইতিহাস কে ৪টি স্তর এ ভাগ করে দেখিয়েছেন। (এক) আয়োর্বেদীয় প্রথায় আয়োর্বেদের যুগ ছিল বৈদিক যুগ থেকে ৮০০ গ্রেগরিয়ান সাল পর্যন্ত, (খ) উন্নয়নশীল পর্যয়ে ৮০০ গ্রেগরিয়ান সাল হতে ১১০০ সাল পর্যন্ত (গ) তান্ত্রিক পর্যায় ১১০০ গ্রেগরিয়ান সাল হতে ১৩০০ সাল পর্যন্ত, (ঘ) রসায়ন পরবর্তী যুগ ১৩০০ গ্রেগরিয়ান হতে ১৫৫০ সাল পর্যন্ত। তিনি ভারতীয় রসায়নের উপর দীর্ঘ গবেষনার পর ১৯০২ সালে রচনা করেন  “হিন্দু রসায়নী বিদ্যা”। সমাজসেবা ও শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে “নাইট” উপাধিতে ভুষিত করেন ।
প্রফুল্লচন্দ্র রায় সারাটি জীবন গবেষনাকার্য ও সমাজসেবায় নিয়োজিত ছিলেন। শিক্ষা বিস্তারের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন অসংখ্য স্কুল ও কলেজ। তিনি উঁচুমানের সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯১০ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে রাজশাহী অধিবেশনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৩১ সাল হতে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত পরপর তিনবার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯১৪ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেন। চট্টগ্রাম, যশোর, লাহোর সহ বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। তিনি কখনো অন্যায় ও মিথ্যার সাথে আপোস করেন নি। সত্যানুসন্ধনী জ্ঞানতাপস অকৃতদার এই মহামানব ১৯৪৪ সালের ১৬ই জুন মৃত্যু বরন করেন।

লেখক ঃ সাংবাদিক



পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)