শিরোনাম:
পাইকগাছা, মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ১২ শ্রাবণ ১৪২৮
SW News24
শনিবার ● ১ মে ২০২১
প্রথম পাতা » উপ-সম্পাদকীয় » মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস
প্রথম পাতা » উপ-সম্পাদকীয় » মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস
১৮৮ বার পঠিত
শনিবার ● ১ মে ২০২১
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস

প্রকাশ ঘোষ বিধান:---


মে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে বা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। ১৯৯১ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনের সুপারিশ মোতাবেক ১৯৯৩ সালে জাতীসংঘের সাধারণ সভায় মে তারিখটিকে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে অর্থাৎ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ, বিশ্বব্যাপি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করার শপথ গ্রহণ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন কালে ক্ষতিগ্রস্থ জীবনদানকারী সাংবাদিকদের স্মরণ তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয় এই দিবসটিতে। 

প্রতি বছর সারা বিশ্বে দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশেরও বিভিন্ন মিডিয়া সংস্থা সাংবাদিক সংগঠন উপলক্ষ্যে আলোচনা সভার আয়োজন করে। সংবাদপত্র বিশেষ প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করে। এসবের মধ্য দিয়ে দিবসটি পেরিয়ে যায়। বছর ঘুরে দিবসটি আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা, তথ্য পাওয়ার অবাধ অধিকার সাংবাদিকদের নিরাপত্তাসহ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের অবস্থান পরিবর্তন ঘটে না বরং ক্রমাগত অবনতি ঘটে। তবে এই দিবসটির ইতিবাচক দিক হলো, ইউনেক্সো দিবসটি উপলক্ষ্যে নানা কর্মসূচী আগে থেকেই জানান দেয়। প্রতি বছর একটি করে প্রতিপাদ্য বিষয়ও নির্ধারণ করে। উপলক্ষ্যে প্রতিপাদ্য বিষয়ের উপর আলোচনা কর্মসভা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের সংবাদকর্মী সংবাদমাধ্যমের অবস্থা ভাবনা-চিন্তা, বিচার-বিশ্লেষন মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা গণমাধ্যমের মুক্ত ভূমিকা পালনে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি দাবী তোলা হয় সাংবাদিক সংগঠনের পক্ষ থেকে। বাক স্বাধীনতার সার্বজনীন অধিকার এবং গণতন্ত্রকে রক্ষা নাগরিকদের ওয়াকেবহাল আর সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ভূমিকা অত্যাবশ্যকীয়। 

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে এবারও বাংলাদেশের কোনো অগ্রগতি হয়নি। গত বছরের চেয়ে আরও একধাপ পেছাল বাংলাদেশ। গতবছর অবস্থান ছিল ১৫১তম, আর এবার অবস্থান ১৫২তম। ২০ এপ্রিল মঙ্গলবার রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) ১৮০টি দেশের সূচক প্রকাশ করে। ২০২১ সালের এই সূচকে সবার শীর্ষে রয়েছে নরওয়ে আর সবার শেষে রয়েছে এরিত্রিয়া। 

সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম। ২০২০ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫১তম। আর ২০১৯ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫০তম। অর্থাৎ, গতবারের সূচকেও বাংলাদেশের এক ধাপ অবনতি হয়েছিল

এই সূচকের শীর্ষ ১০ দেশ হলো- নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, কোস্টারিকা, নেদারল্যান্ডস, জ্যামাইকা, নিউজিল্যান্ড, পর্তুগাল এবং সুইজারল্যান্ড

এই সূচকে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ।সূচকে প্রতিবেশী দেশ ভুটানের অবস্থান ৬৫তম, আফগানিস্তান ১২২তম, নেপাল ১০৬তম এবং শ্রীলঙ্কার অবস্থান ১২৭তম। এছাড়া মিয়ানমার ১৪০তম, ভারত ১৪২তম এবং পাকিস্তান ১৪৫তম

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েই এই সূচক। অর্থাৎ গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে তার ওপর ভিত্তি করে প্রতিবছর এই সূচক প্রকাশ করে থাকে আরএসএফ। ২০০২ সাল থেকেই এই সূচক প্রকাশ করা হচ্ছে। সূচকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আরএসএফের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ২০২০ সালে করোনাভাইরাস সংকট এবং লকডাউন চলাকালে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশ বেসামরিক সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মহামারি সমাজে তার প্রভাব নিয়ে প্রতিবেদনের জন্য অনেক সাংবাদিক, ব্লগার, কার্টুনিস্ট গ্রেফতার বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন

আর বিশেষ উদ্দেশ্য অর্জনে সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করতে সরকারের কাছে এখন একটি বিচারিক অস্ত্র আছে। তা হলো ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই আইনেনেতিবাচক প্রচারণা দায়ে সর্বোচ্চ সাজা ১৪ বছরের কারাদন্ড। ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণ (সেলফ-সেন্সর) অভূত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সম্পাদকেরা সংগত কারণেই জেল বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঝুঁকি এড়াতে চান

সর্বশেষ ২০১৯ সালে পুননির্বাচিত হওয়ার পর সরকার গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে লক্ষণীয় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দলীয় নেতা-কর্মীদের হাতে সহিংসতার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকেরা। তাদের নির্বিচারে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওয়েবসাইট ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারছে, তার ভিত্তিতে ২০০২ সাল থেকে আরএসএফ সূচক প্রকাশ করে আসছে। ২০১৩ সাল থেকে এই সূচকে বাংলাদেশ আছে। 

যেসব সাংবাদিক দুর্নীতি বা স্থানীয় অপরাধী চক্র নিয়ে অনুসন্ধান করেন, তারা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন। এই নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। সাংবাদিকদের স্বার্থ নিরাপত্তা বিষয়ে প্যারিস ভিত্তিক রিপোটার্স ইউদাউট বার্ডার্স তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের সময় দলীয় কর্মী সমার্থকের দ্বারা সাংবাদিকদের উপর হামলা, মামলা নির্যাতন বেশি হয়। বস্তুনিষ্ঠু সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিককে নিগৃহত করা হয় এবং প্রাণ নাশের হুমকির ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়। আরএসএফ তাদের প্রতিবেদনে আর বলেছে, দেশটিতে রাজনীতি করা যত কঠিন হয়ে উঠেছে, সংবাদ মাধ্যমের লঙ্ঘনও তত বেড়েছে। ২০০৯ সাল থেকে  সরকার কঠোর পদ্ধত্তি গ্রহণ করেছেন। তার স্বীকার সাংবাদিকরা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আছে সাংবাদিকদের হাত বেঁধে রাখা মুখ বন্ধ রাখার জন্য। নেতিবাচক প্রচারণার দায়ে এই আইনে ১৪ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। জেলে-জরিমানা এড়াতে সংবাদমাধ্যমের বন্ধ হয়ে যাওয়া এড়াতে সম্পাদকরা নিজে থেকেই নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। এতে মুক্ত সংবাদিকতা বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। কারণ ছাড়াই সাংদাবিক ছাটাই করা হচ্ছে। দিন দিন এই প্রবনতা তীব্র হচ্ছে। 

দেশে গণমাধ্যমের ভূমিকায় সাংবাদিকের ঘাম-শ্রম ওঝুঁকি জড়িত। সমাজের অনেক সাংবাদিক সৎ, ত্যাগি নির্লোভী। তারা মানব সমাজ কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সমাজে সব সাংবাদিকের মূল্যায়ন কম। আবার তাদের জীবনের ঝুঁকি বেশি। তারা নিগৃহিত হামলা-মামলা হত্যার শিকার হন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বাংলাদেশে ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে ৩৫ জনেরমত সংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছে। আরও অন্তত ১০ জন সাংবাদিক খুন হয়েছে বাকী আড়াই বছরে। দেশেই কারণে-অকারণে সাংবাদিকদের উপর হামলা হচ্ছে। একজন সাংবাদিককে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কাউকে ছাড় না দিয়ে ঘুষ- দূর্নীতি, অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে হয়। আর তাতেই সংশ্লিষ্টতা ক্ষেপে যান। সুযোগ পেলেই সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সাংবাদিককে মারপিট করে ঝাল মিটান। বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা নতুন কিছু না। তবে এর প্রবণতা বাড়ছে। যা স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায়। 

সাংবাদিকদের মধ্যে আছে যেমন অনৈক্য তেমন আছে বিভাজন। জেলা উপজেলা পর্যায়ে রয়েছে একাধিক সাংবাদিক সংগঠন। এতো সব বিভাজনের কারণে ক্ষুদ্র স্বার্থ টানাটানি করে বৃহৎ স্বার্থ জলাঞ্জলী দেওয়া হচ্ছে। দেশ জুড়ে প্রেসক্লাব দখল, কুক্ষিগত দলীয় করণ করার ঘটনা ঘটছে। এই বিভাজনের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে রাজনৈতিক নেতা জনপ্রতিনিধিরা। তাদের ইচ্ছা মাফিক নিউজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে সাংবাদিককে। আমার কথা না শুনলে নানা ভাবে হয়রানী ভয়ভীতি দেখানো হয়। ফলে সাংবাদিকতা পেশা ক্রমাগত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। 

গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণতন্ত্র যেখানে দূর্বল, সেখানে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম থাকতে পারে না। স্বাধীন সাংবাদিকতা না থাকলে সংবাদমাধ্যম টেকেনা। বিচারহীনতা সাংবাদিকদের উপর হামলা হত্যার ঘটনাগুলো বাংলাদেশে গণমাধ্যমে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। থেকে উত্তরণের পথ খুজতে হবে। সরকারকে অনুধাবন করতে হবে গণ্যমাধ্যম সরকারের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরিপুরোক সহায়ক। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সাথে সাংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা অতপ্রুত ভাবে জড়িত। 

স্বাধীন সাংবাদিকতা বিকাশে এবং সাংবাদিক হামলা নির্যাতন বন্ধ করতে মতানৈক্য ভুলে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ ভুমিকা পালন করতে হবে। রাষ্ট্রের অভ্যান্তরে গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে হলে সাংবাদিকতের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। আর সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। 

 

 

লেখকঃ সাংবাদিক

 



পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)