শিরোনাম:
পাইকগাছা, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

SW News24
রবিবার ● ৭ জুন ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমের অন্ধ প্রতিযোগিতায় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সংকটে
প্রথম পাতা » মুক্তমত » ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমের অন্ধ প্রতিযোগিতায় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সংকটে
২ বার পঠিত
রবিবার ● ৭ জুন ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমের অন্ধ প্রতিযোগিতায় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সংকটে

ভিউ বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য একটি মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমের যুগে তথ্যের সত্যতা, গভীরতা এবং জনগুরুত্বের চেয়ে ক্লিক, লাইক, শেয়ার ও ভিউ বাড়ানোই গণমাধ্যমগুলোর প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। এর ফলে সাংবাদিকতার মূল নৈতিক আদর্শ ও বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মক সংকটের মুখে পড়ছে।

প্রিন্ট মিডিয়ার চেয়ে অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া মাধ্যমগুলোর আয় সরাসরি ভিউ ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো ভিউয়ের দাসে পরিণত হচ্ছে। অনলাইন মাল্টিমিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমের যুগে ভিউ বা ক্লিক পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতায় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে। খবরের সত্যতা ও গভীরতার চেয়ে চটকদার শিরোনাম ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কনটেন্ট এখন বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে, যা সামগ্রিক গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ভিউ বাণিজ্যের এই দৌরাত্ম্য বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে ধ্বংস করছে। খবরের মূলভাব বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ইন্টারনেটে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত শিরোনাম ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিকৃত ছবি বা ভিডিও বানিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়।

শিকারি সাংবাদিকতার প্রভাব বাড়ছে। সংবাদকে জনস্বার্থে ব্যবহার না করে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোনো গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আক্রমণাত্মক সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানো বা ব্ল্যাকমেইল করাই এসব খবরের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। হলুদ সাংবাদিকতা ও চাঁদাবাজি করতে মফস্বল থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত যত্রতত্র অনুমোদনহীন অনলাইন পোর্টাল ও আইপিটিভি গজিয়ে উঠেছে। পেশাদারিত্বের অভাব থাকা এসব মাধ্যমের সঙ্গে জড়িত অনেকেই সাংবাদিকতার কার্ড ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও অনৈতিক সুবিধা আদায়ে লিপ্ত।

সংবাদের ভেতরের তথ্যের চেয়ে ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতে বিভ্রান্তিকর ও চটকদার শিরোনাম ব্যবহার করা হচ্ছে। ভিউ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর মতো হলুদ ও  শিকারি সাংবাদিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ।  যে কোনো খবর সবার আগে প্রকাশ করে ভাইরাল করার অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে নূন্যতম সোর্স বা তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে না।

ভুঁইফোড় ও কার্ডধারী কথিত সাংবাদিকদের অপতৎপরতায় প্রকৃত ও সৎ সাংবাদিকদের কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষ প্রায়ই বিভ্রান্ত হয়ে প্রকৃত সাংবাদিকদেরও একই চোখে দেখে। সংবাদমাধ্যমের আয় এখন সরাসরি ভিউ এবং সামাজিক মাধ্যমের ট্রাফিকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে বস্তুনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ খবরের চেয়ে বিনোদনমূলক, গসিপ বা সস্তা সংবাদের প্রাধান্য বাড়ছে।

অনুমোদনহীন আইপিটিভি, নামসর্বস্ব নিউজ পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেল খুলে একশ্রেণীর কথিত সাংবাদিক বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিবেশ নষ্ট করছে। চটকদার ও আংশিক সত্য সংবাদের কারণে সাধারণ মানুষ প্রকৃত তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং সমাজে গুজব ছড়াচ্ছে। মূলধারার গণমাধ্যমের ভাবমূর্তি সংকট পড়ছে। ভিউ লোভী কিছু মাধ্যমের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে পেশাদার ও সৎ সাংবাদিকরাও জনগণের আস্থা ও শ্রদ্ধা হারাচ্ছেন। জনস্বার্থ রক্ষা, দুর্নীতি অনুসন্ধান বা নীতিগত আলোচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যাচ্ছে এবং বিনোদন বা সস্তা কৌতূহল উদ্দীপক খবর সামনে আসছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণে সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ এবং পেশাদারিত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এই বিষয়ে নানা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে থাকে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা, যেমন বিটিআরসি কর্তৃক আবেদনকৃত পোর্টাল যাচাই বাচাই করে অনুমোদন দেওয়া এবং অনুমোদনহীন ভুঁইফোড় পোর্টাল ও আইপিটিভির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।  পাঠকের মাঝে মিডিয়া লিটারেসি বা সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি, যা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ভিউ বা রিচ বাড়ানোর চেয়ে সংবাদের গুণগত মান ও নীতি-নৈতিকতা বজায় রাখতে সম্পাদক ও বার্তাকক্ষের নীতিনির্ধারকদের কঠোর হতে হবে। সাংবাদিকদের নিয়মিত নৈতিকতা, আইন এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষাবিষয়ক আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা জরুরি।

সামাজিক মাধ্যমে যেকোনো খবর দেখেই প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে, তথ্যের সত্যতা যাচাই করার বিষয়ে ব্যবহারকারীদের সচেতন হতে হবে। কেবল ভিউ-ভিত্তিক বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর না করে সাবস্ক্রিপশন বা পাঠক-অর্থায়িত মডেলের মাধ্যমে গণমাধ্যমের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)