শিরোনাম:
পাইকগাছা, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

SW News24
বৃহস্পতিবার ● ৩০ এপ্রিল ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » মুক্ত সাংবাদিকতায় বর্তমানে যুক্ত হচ্ছে বহুমুখী চ্যালেজ্ঞ
প্রথম পাতা » মুক্তমত » মুক্ত সাংবাদিকতায় বর্তমানে যুক্ত হচ্ছে বহুমুখী চ্যালেজ্ঞ
১৬৩ বার পঠিত
বৃহস্পতিবার ● ৩০ এপ্রিল ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

মুক্ত সাংবাদিকতায় বর্তমানে যুক্ত হচ্ছে বহুমুখী চ্যালেজ্ঞ

---প্রকাশ ঘোষ বিধান

মুক্ত সাংবাদিকতা বা স্বাধীন সাংবাদিকতা বর্তমানে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা এবং পেশাগত নিরাপত্তা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।বিশেষ করে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এখন গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।

মুক্ত সাংবাদিকতা যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হলেও, বর্তমানে এটি বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো আইনি, আর্থিক, সামাজিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে বিস্তৃত। মুক্ত সাংবাদিকতা বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে রাজনৈতিক চাপ থেকে শুরু করে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন সবই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতি বছর ৩ মে বিশ্বব্যাপী বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হয়। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় অনুমোদনের পর থেকে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা, গণমাধ্যমের ওপর হামলা প্রতিরোধ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিহত সাংবাদিকদের স্মরণ করে এই দিবসটি উদযাপন করা হয়। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয় বরং মুক্ত ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পক্ষে এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, সেন্সরশিপ এবং হয়রানি বন্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি, গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরা হয়।

ক্ষমতার প্রভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মেরুকরণের ফলে সাংবাদিকরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছেন না। দাঙ্গা, বিক্ষোভ বা রাজনৈতিক সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা নিয়মিত পুলিশ, রাজনৈতিক কর্মী বা বিবাদমান পক্ষের হাতে শারীরিক হামলা, গুম, অপহরণ এমনকি হত্যার শিকার হচ্ছেন।

স্বাধীন সাংবাদিকতার বড় একটি অন্তরায় হলো দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক আইন। সংবিধান মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিলেও, বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়। স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো ভয়ের সংস্কৃতি, যেখানে তথ্য প্রকাশ করলে নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা, গ্রেপ্তার, গুম বা অপহরণের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনের অপব্যবহার সাংবাদিকদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

অনেক ক্ষেত্রে সরকারি বা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করলে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে চাপের সৃষ্টি করা হয়। সমালোচনামূলক সংবাদ প্রচার করলে অনেক সময় সংবাদমাধ্যমকে দেশবিরোধী তকমা দেওয়া হয় অথবা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করা হয়।

সংবাদপত্রের মালিকরা অনেক সময় কর্পোরেট বা রাজনৈতিক স্বার্থে সংবাদ নিয়ন্ত্রণ করেন, যা মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য বড় বাধা।  অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন হওয়ায় তাদের ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতারা তাদের স্বার্থে সংবাদ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। এছাড়া বিজ্ঞাপনের বাজারের ওপর নির্ভরতার কারণে অনেক সময় বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ রাজনৈতিক বা ব্যবসায়ী সংগঠনের সাথে যুক্ত, যা সাংবাদিকদের নিরপেক্ষভাবে সংবাদ প্রকাশে বাধা দেয়।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা দুর্নীতিবিরোধী সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা শারীরিক হামলা, অপহরণ বা এমনকি খুনের শিকার হচ্ছেন। এই নিরাপত্তাহীনতা অনেক ক্ষেত্রে সেলফ-সেন্সরশিপ বা স্ব-আরোপিত নিয়ন্ত্রণের জন্ম দিচ্ছে। হয়রানি বা ভয়ের কারণে অনেক সাংবাদিক নিজে সংবাদের অংশবিশেষ বাদ দিয়ে বা এড়িয়ে গিয়ে কাজ করেন, যাকে সেলফ-সেন্সরশিপ বা আত্মনিয়ন্ত্রণ বলা হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অনলাইন সংবাদপত্রের যুগে সঠিক ও ভুল সংবাদের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত খবর প্রকাশের প্রতিযোগিতায় অনেক সময় তথ্যের সত্যতা যাচাই উপেক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তথ্য দিতে গড়িমসি করে, যা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় বড় বাধা। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মেরুকরণের ফলে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

অদক্ষ বা দলবাজ সাংবাদিকদের কারণে পেশার মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এসব অদক্ষ, দলবাজ ও অযোগ্যদের পেশায় প্রবেশের ফলে মানসম্মত সাংবাদিকতার অভাব সৃস্টি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচার এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই ছাড়াই দ্রুত সংবাদ প্রচারের প্রবণতা মূলধারার সাংবাদিকতাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

দৃশ্যমান আইনের পাশাপাশি অনেক সময় অদৃশ্য শক্তির ভয়ে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না, যা সাংবাদিকতার জন্য একটি গভীর সংকট। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য একটি বড় সমস্যা। নৈতিকতা ভুলে সংবেদনশীল বা ভুয়া সংবাদ পরিবেশনের প্রবণতা পেশার ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। অনেক সাংবাদিকই সঠিক ও নিয়মিত বেতন পান না, যা তাদের পেশাগত সততা বজায় রাখাকে কঠিন করে তোলে।

সত্য প্রকাশ, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য। তবে বর্তমানে অপতথ্য রোধ, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদমাধ্যমে রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব নিরপেক্ষতা বজায় রাখাকে কঠিন করে তুলছে। বহুমুখী চ্যালেঞ্জের ফলে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে নানাবিধ বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে এই সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই সাংবাদিকতা এগিয়ে চলছে। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশে মুক্ত সাংবাদিকতা টিকে থাকার জন্য তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা, আইনি সুরক্ষা এবং নৈতিক সাংবাদিকতা চর্চা অপরিহার্য। সে জন্য মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ রক্ষায় একটি কার্যকর আইনি সুরক্ষা কাঠামো এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)