শিরোনাম:
পাইকগাছা, শনিবার, ২ মে ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

SW News24
শনিবার ● ২ মে ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » জলবায়ু সংকট এবং সামাজিক বৈষম্যের লড়াই ওতপ্রোতভাবে জড়িত
প্রথম পাতা » মুক্তমত » জলবায়ু সংকট এবং সামাজিক বৈষম্যের লড়াই ওতপ্রোতভাবে জড়িত
৮ বার পঠিত
শনিবার ● ২ মে ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

জলবায়ু সংকট এবং সামাজিক বৈষম্যের লড়াই ওতপ্রোতভাবে জড়িত

জলবায়ু সংকট এবং সামাজিক বৈষম্য একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবগুলো সব মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। এটি বিদ্যমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তোলে। যা বিশেষ করে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক জটিল মানবিক ও পরিবেশগত সংকট তৈরি করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে থাকায় বন্যা, সাইক্লোন এবং নদী ভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা বেড়েছে, ফলে দেশটি বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছরই বন্যা, নদী ভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ে মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় এবং তাদের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা খরা যখন আঘাত হানে, তখন সম্পদশালীরা মানিয়ে নিতে পারলেও দরিদ্র মানুষ ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে আরও নিঃস্ব হয়ে পড়ে। ব্যাপক হারে মানুষ নিজ বাসভূমি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে, যা সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য বাড়াচ্ছে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং বাসস্থানের বৈষম্য আরও বেড়ে যায়।

দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই নারী, যারা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু বিপর্যয়ে নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পুরুষদের তুলনায় নারী ও মেয়েদের ওপর বেশি প্রভাব পড়ে। দুর্যোগের সময় খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং নারীর নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় নারীদের অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং নারীবান্ধব সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করা। জিডিপির প্রবৃদ্ধির চেয়ে সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। তাই এই লড়াইয়ে নারী নেতৃত্ব এবং তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সামাজিক বৈষম্য কমানোর একটি বড় ধাপ।

পানি সংকট এবং লবণাক্ততা নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সামাজিক বঞ্চনা বাড়াচ্ছে। বন্যা, নদী ভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের ফলে হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, যা তাদের জীবন-জীবিকা ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও লবণাক্ততার কারণে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অনাহারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে খরা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করছে। উন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে সৃষ্ট সমস্যার দায় বহন করতে হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে, যা বিশ্বজুড়ে এক বড় ধরনের অসমতা সৃষ্টি করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদী ভাঙন, বন্যা ও খরার মতো দুর্যোগ বেড়ে চলেছে, যা কৃষি ও মৎস্যজীবীদের পেশা কেড়ে নিচ্ছে। উন্নত দেশগুলো বা ধনী শ্রেণির ভোগবিলাস পরিবেশের বেশি ক্ষতি করে, কিন্তু এর মাশুল দেয় সাধারণ মানুষ। জলবায়ু লড়াইয়ের অংশ হিসেবে সম্পদের সুষম বণ্টন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যারা সবচেয়ে কম দায়ী  দরিদ্র দেশ বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। তাই লড়াইটা শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানোর নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার রক্ষারও। শিল্পোন্নত দেশগুলোর উচ্চ কার্বন নিঃসরণের মাশুল দিচ্ছে গরিব দেশগুলো। তাই আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে জলবায়ু তহবিলের সঠিক বন্টন এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করা এই লড়াইয়ের প্রধান অংশ।

টেকসই এমন উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে যা পরিবেশ রক্ষা করবে এবং একই সাথে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার সুযোগ তৈরি করবে। জলবায়ু সংকট এবং সামাজিক বৈষম্য, এই দ্বিমুখী লড়াইয়ে জয়ী হতে সমন্বিত রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং টেকসই উন্নয়ন কৌশল প্রয়োজন।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করতে হলে আমাদের কেবল গাছ লাগানো বা প্রযুক্তি বদলালেই হবে না, বরং সমাজের পরিকাঠামোতে থাকা বৈষম্যগুলোও দূর করতে হবে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করা মানে কেবল পরিবেশ রক্ষা করা নয় বরং সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠার লড়াই করা।





আর্কাইভ