শিরোনাম:
পাইকগাছা, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

SW News24
রবিবার ● ৭ জুন ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » শিকারি সাংবাদিকতা
প্রথম পাতা » মুক্তমত » শিকারি সাংবাদিকতা
৬৮ বার পঠিত
রবিবার ● ৭ জুন ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

শিকারি সাংবাদিকতা

---  প্রকাশ ঘোষ বিধান

শিকারি সাংবাদিকতা হলো সেই অনৈতিক চর্চা, যেখানে সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতা ও আদর্শ বিসর্জন দিয়ে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানকে হেনস্থা, ব্ল্যাকমেইল বা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ পরিবেশন করা হয়। যাচাই-বাছাই ছাড়াই ভুয়া বা অসম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে মুহূর্তের মধ্যে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়। হলুদ সাংবাদিকতার একটি আধুনিক ও উগ্র রূপ হলো এই শিকারি সাংবাদিকতা।

শিকারি সাংবাদিকতা এমন এক বিশেষ ধারার সাংবাদিকতা, যা বস্তুনিষ্ঠতা ও নৈতিকতা বাদ দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহার করা হয়। ভুয়া বা অসম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে মুহূর্তের মধ্যে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা। চটকদার শিরোনাম  দর্শক বা পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য চটকদার ও ভিত্তিহীন শিরোনাম ব্যবহার করা। ব্যক্তিগত আক্রোশ বা বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যক্তির সম্মানহানি করা। মূলত ব্যক্তিগত লাভ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা সামাজিক মাধ্যমে ভিউ ও ক্লিক বাড়ানোর জন্য এই ধরনের চর্চা করা হয়ে থাকে।

শিকারি সাংবাদিকতার ফাঁদ ফেলে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের ফলে এই ক্ষতিকর প্রবণতা ও এর নেতিবাচক প্রভাব আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

শিকারি সাংবাদিকতার প্রভাব বাংলাদেশে ক্রমশ বাড়ছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো বিশেষ রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলের জন্য কাউকে মুহূর্তের মধ্যে অপরাধী হিসেবে চিত্রিত করা। গণমাধ্যম, গোয়েন্দা সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় শক্তির একাংশের যোগসাজশে এই ধরনের চর্চা অতীতে বিরোধীমত দমন ও ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে ব্যবহৃত হয়েছে।সাংবাদিকদের মধ্যে চাকরি হারানো, স্বাধীনতাবিরোধী বা ফ্যাসিবাদী তকমা পাওয়ার ভয় কাজ করায় অনেকেই মালিকপক্ষের অনৈতিক এজেন্ডা মেনে নিতে বাধ্য হন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা অনুযায়ী সংবাদ প্রকাশ করে মুহূর্তের মধ্যে কাউকে জনসমক্ষে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া হয় এবং সামাজিক ও আইনি শাস্তির মুখোমুখি করা হয়। একজনকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে বাকিদের বার্তা দেওয়া হয় যেন কেউ নির্দিষ্ট ক্ষমতার সীমানার বাইরে যাওয়ার সাহস না করে। এমন ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয় যা, এর পরোক্ষ শিকার হয় পুরো সমাজ।

শিকারি সাংবাদিকতার অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে বা মানসিকভাবে ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা। মিথ্যা তথ্য বা গোপন ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা। এটি সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি ও নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন।

শিকারি সাংবাদিকতার প্রধান বৈশিষ্ট্য উদ্দেশ্য প্রণোদিত চরিত্র হনন করা। সংবাদমাধ্যম বা অনলাইন পোর্টালে চটকদার ও বিভ্রান্তিকর শিরোনাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় অনেক পোর্টাল অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশ করে হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের মতো অপরাধে জড়াচ্ছে।  তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের আগেই কাউকে সমাজে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে হেনস্থা করা, যা দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির একটি অংশ।

সাংবাদিকরা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেন। সাংবাদিকরা সমাজের রক্ষী বা ওয়াচডগ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু  রক্ষী বা ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করা সাংবাদিকতার মধ্যে পড়ে না। সংবাদ প্রতিবেদন এর নামে যখন শিকারি এজেন্ডা সাধারণ মানুষকে খাওয়ানো হয়, তখন দেশের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ধ্বংস হয়ে যায়।

ভুয়া খবরের কারণে সমাজে ভুল বার্তা ছড়ায় এবং মানুষের মানহানি ঘটে, যা অনেক সময় অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়। এই ধরনের চর্চার ফলে মূলধারার সাংবাদিকতার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস কমে যায়।

প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, ফেসবুক পেজ এবং বিপুল সংখ্যক নিয়ন্ত্রণহীন অনলাইন নিউজ পোর্টালের উত্থানের ফলে এই ধরনের সাংবাদিকতা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এই অপসাংবাদিকতা রোধে গণমাধ্যমকর্মীদের নৈতিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ