বুধবার ● ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভা নির্বাচনে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন নজরুল
ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভা নির্বাচনে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন নজরুল
কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন নিপীড়িত মানবতার কবি। সারা জীবন তিনি সমাজের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে কলম ধরেছেন। তিনি নির্ভীকচিত্তে কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে ক্ষুরধার রচনা অব্যাহত রেখেছেন।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি, বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন বড়ই বৈচিত্র্যময় এবং বর্ণিল। তিনি রুটির দোকানে কাজ করেছেন, লেটো গানের দলের সদস্য ছিলেন, হাবিলদার হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তার জীবন কেবল সাহিত্যচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী, চিন্তক ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।
নানা কিছু করার মাঝে তার একটি ভূমিকা হয়তো অনেকের অজানা। তিনি জনপ্রতিনিধি হতে চেয়েছিলেন। ভোটের লড়াইয়ে নেমেছিলেন। ব্রিটিশ আমল থেকেই আমাদের দেশের কবি-লেখকরা যুক্ত ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। তবে ভোটের রাজনীতিতে খুব কম লেখকই অংশ নিয়েছেন। মোহাম্মদ আকরম খাঁ, সৈয়দ আবুল মনসুর আহমদ, অধ্যাপক শাহেদ আলীসহ অল্প কয়জন লেখক বিভিন্ন সময় নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু বিফলের তালিকাটা লম্বা। আর এ তালিকায় ওপরের দিকে আছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম। আছেন হাল আমলের কবি নির্মলেন্দু গুণও।
কবি-সাহিত্যিকদের নির্বাচনে দাঁড়ানোর ফলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়- কবিতার জীবন আর নির্বাচনী সংস্কৃতি এক না; যোজন যোজন তফাৎ এতে। বাংলাদেশের জাতীয় কবি ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম একবার নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। ভোট চাইতে ঘুরে বেরিয়েছিন দ্বারে দ্বারে।
১৯২৬ সালের কথা। ওই বছরের শেষ দিকে ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কাজী নজরুল ইসলাম তখন সারা বাংলায় অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি। ঢাকা বিভাগ থেকে আইনসভায় দুজন মুসলিম প্রতিনিধির কোটা ছিল। সেই নির্বাচনে কংগ্রেস সমর্থিত স্বরাজ দলের প্রার্থী হন কাজী নজরুল ইসলাম।
বর্তমান ঢাকা, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ নিয়ে গঠিত একটি আসন থেকে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।
কবির ধারণা ছিল, বাংলার মানুষ যেভাবে তাকে ও তার কবিতাকে যেভাবে ভালোবাসে, তাতে নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হবেন।
ফরিদপুরের এক জনসভায় কবি জসীমউদ্দীনকে তিনি বলেছিলেন, জসীম, তুমি ভেবো না। নিশ্চয়ই সবাই আমাকে ভোট দেবে। ঢাকায় আমি শতকরা ৯৯টি ভোট পাব। তোমাদের ফরিদপুরের ভোট যদি কিছু পাই, তাহলেই কেল্লাফতে।
কিন্তু ভোটের মাঠে নেমেই বদলে যেতে থাকে কবির অভিজ্ঞতা। কারণ, রাজনীতি আর ভোটের হিসাব তো ভিন্ন। কাজ করতে গিয়ে প্রথমেই খরচ নিয়ে বিপাকে পড়েন বিদ্রোহী কবি। নির্বাচন করতে কেমন টাকা লাগে, সে ব্যাপারে তার কোনো ধারণা ছিল না। পার্টির পক্ষ থেকে তাকে ৩০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। এর বাইরে তেমন কোনো বাজেট ছিল না তার। তাই নির্বাচনে তার পক্ষে প্রচারণায় লোক কম দেখা যায়।
প্রচারণার জন্য ঢাকার বেচারাম দেউড়ির ৫২ নম্বর বাড়িতে পীর সৈয়দ শাহ মোহাম্মদ ইউসুফ কাদেরীর আস্তানায় বেশ কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন নজরুল। ফরিদপুরেও মাঠপর্যায়ে কাজ করেছিলেন কয়েক দিন। কিন্তু বাজেট–স্বল্পতায় নির্বাচনি এলাকার সবখানে যেতে পারেননি।
নির্বাচনে ভোটদাতাদের সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ১১৬ জন।প্রত্যেক ভোটদাতা দুটি করে ভোট দিতে পারতেন। প্রার্থী দাঁড়িয়েছিলেন পাঁচজন। তার অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুসলিম লীগের প্রার্থী, বরিশালের বামনার জমিদার মুহম্মদ ইসমাইল চৌধুরী (তিনি ছিলেন রাজবাড়ীর পদমদীর জমিদার নবাব মীর মোহাম্মদ আলীর ভ্রাতুষ্পুত্রী আসমাতুন্নেছার স্বামী), টাঙ্গাইলের জমিদার আব্দুল হামিদ গজনভী, ঢাকার নবাববাড়ির আব্দুল করিম ও মফিজ উদ্দিন আহমেদ।
ফরিদপুরের এক পীরের কাছ থেকে একটা ফতোয়া লিখেও নিয়ে এসেছিলেন কবি, যাতে লেখা ছিল, সবাই যেন তাকে ভোট দেয়। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ভোটের মাঠে ভরাডুবি ঘটে বিদ্রোহী কবির।
সে সময়ে শুধু সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটার হওয়ার নিয়ম থাকায় বিরাট এলাকা নিয়ে গঠিত আসনে মোট ভোটার ছিল ১৮,১১৬ জন। ফলাফলে দেখা যায়, মাত্র ১ হাজার ৬২টি ভোট পেয়ে পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে চতুর্থ হন তিনি। সে সময় তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।
ফলাফল ঘোষণায় ইসমাইল হোসেন- ছয় হাজার ৬১, আব্দুল হালিম গজনভি- পাঁচ হাজার ৭৬৯, খাজা আবদুল করিম- দুই হাজার ৪৩, কাজী নজরুল ইসলাম- এক হাজার ৬২ ও মফিজউদ্দিন- ৫২০টি ভোট পান। পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে সাম্যবাদের কবি থাকেন চতুর্থ স্থানে। তার জামানতও জব্দ হয়।
সেদিন কবি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন- কাব্য আর রাজনীতি ভিন্ন ঘরানার বিষয়। ভোটের মাঠে কবিখ্যাতি খুব একটা কাজে আসে না। যেন তাই লাইন তার জীবনে উপযুক্ত হয়ে আসে- আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায়। এরপর বাকি জীবন কবি অন্যের ভোটের প্রচারে থাওলেও নিজে কোনো দিন ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হননি।
সূত্র: গোলাম মুরশিদের লেখা নজরুল–জীবনী বিদ্রোহী রণক্লান্ত ও জসীমউদ্দীনের লেখা জীবনকথা।






সুযোগসন্ধানী না হয়ে সাংবাদিকের দায়বদ্ধতা জরুরি
বৃষ্টির পর সন্ধ্যায় মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা ডানাওয়ালা পোকা
মানবতার সেবায় মাদার তেরেসা
বিল ডাকাতিয়ার স্থায়ী জলাবদ্ধতা; কৃষকের কান্না
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপ্রিয় সাংবাদিক-কলামিস্ট প্রকাশ ঘোষ বিধান
প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী শকুন আজ মহাবিপন্ন
তেলাপিয়া মাছ জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি
বর্ষাকাল কৃষিকাজের মূল চালিকা শক্তি 