শিরোনাম:
পাইকগাছা, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

SW News24
বুধবার ● ৪ নভেম্বর ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » সুন্দরবনকে ভালো রাখতে হলে মানুষের লোভ কমাতে হবে
প্রথম পাতা » মুক্তমত » সুন্দরবনকে ভালো রাখতে হলে মানুষের লোভ কমাতে হবে
৫ বার পঠিত
বুধবার ● ৪ নভেম্বর ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

সুন্দরবনকে ভালো রাখতে হলে মানুষের লোভ কমাতে হবে

সুন্দরবনকে ভালো রাখতে এবং এই অমূল্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত লোভ ও বাণিজ্যিক মানসিকতা কমানো অত্যন্ত জরুরি।

বিশ্বের বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বনটি শুধু কোটি কোটি মানুষের জীবিকার উৎস নয়, এটি বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য একটি প্রাকৃতিক ঢাল। সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের ফুসফুস নয়, এটি ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে উপকূলবর্তী লক্ষ লক্ষ মানুষকে রক্ষা করার একটি প্রাকৃতিক দেয়াল। কিন্তু ক্রমাগত মানুষের লোভের কারণে আজ এই বনের অস্তিত্ব সংকটে।

সুন্দরবন রক্ষায় মানুষের লোভ কমানো প্রয়োজন। বনের ভেতরের বিষ দিয়ে মাছ ধরা, হরিণ শিকার এবং নির্বিচারে কাঠ পাচার বন্ধ করতে হবে। অধিক মুনাফার আশায় বিষ দিয়ে মাছ ধরা, হরিণ ও বাঘ শিকার এবং অবৈধভাবে কাঠ ও গোলপাতা কাটা সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করছে। এই লোভ বন্ধ না হলে বনের জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাবে।

বনের ঠিক সীমানার কাছাকাছি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা বিভিন্ন ভারী শিল্পকারখানা গড়ে তোলার পেছনে থাকে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক অতি-লোভ। এর ফলে নির্গত বর্জ্য ও দূষণ সুন্দরবনের বাতাস ও পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে।

সুন্দরবনের ভেতরের নদীগুলো দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের ফলে সৃষ্ট শব্দদূষণ ও তেল বিপর্যয় বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিঘ্নিত করছে।

পর্যটন ব্যবসার অতি-মুনাফার লোভে বনের গভীরে অতিরিক্ত লঞ্চ-জাহাজ চালানো এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। পর্যটকদের কোলাহল বনের বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। পর্যটনের নামে বনের ক্ষতি না করে পরিবেশবান্ধব এবং নিয়ন্ত্রিত পর্যটন ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

সুন্দরবনের সংলগ্ন বা বাফার জোনে ক্ষতিকর কলকারখানা স্থাপন এবং পরিবেশ দূষণকারী বাণিজ্যিক কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।চিংড়ি চাষের ঘের তৈরি এবং পর্যটনের নামে বনের জমি ও নদী তীরবর্তী এলাকা দখল করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। প্লাস্টিক বর্জন এবং অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ কমিয়ে বনের বন্যপ্রাণীদের জন্য একটি শান্ত ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনিকার জন্য বননির্ভরতা কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে বিকল্প আয়ের উৎস সৃষ্টি করতে হবে। বনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় মানুষ বাওয়ালি, মৌয়ালের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা, যাতে বনের ওপর চাপ কমে।

সুন্দরবনের নদীগুলোতে নির্বিচারে বাঁধ দেওয়া বা উজান থেকে পানি সরিয়ে নেওয়ার ফলে বনে লবণাক্ততা বাড়ছে। এতে সুন্দরী গাছসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ মারা যাচ্ছে, যা বনের মৌলিক কাঠামো বদলে দিচ্ছে। উজান থেকে আসা মিঠা পানির প্রবাহ সচল রাখা, যাতে বনের ইকোসিস্টেম এবং সুন্দরী গাছের কোনো ক্ষতি না হয়।

প্রকৃতিকে তার নিজের মতো করে বাঁচতে দিলে সে নিজেই নিজেকে গুছিয়ে নেয়। সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও মানুষের বাণিজ্যিক লোভের চেয়ে বনের স্থায়িত্বকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম ও পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সুন্দরবন ভালো থাকলে উপকূলীয় অঞ্চল ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পাবে এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা নিরাপদ থাকবে।

সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে আমাদের উন্নয়ন এবং প্রকৃতি রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকার ব্যবস্থা করা, কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা এবং সুন্দরবনকে কোনো বাণিজ্যিক লাভের উৎস না ভেবে একটি সংবেদনশীল ও জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করাই এখন সময়ের দাবি।

সুন্দরবন বাঁচলে যে উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ বাঁচবে; এই বোধ সবার মাঝে, বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও নীতি-নির্ধারকদের মনে জাগ্রত করা জরুরি। প্রকৃতির প্রতি মানুষের এই ভোগবাদী মানসিকতা ও লোভের লাগাম টানতে না পারলে জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে সুন্দরবনকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)