শিরোনাম:
পাইকগাছা, সোমবার, ৯ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩

SW News24
সোমবার ● ৯ নভেম্বর ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » চটকদার সাংবাদিকতা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে
প্রথম পাতা » মুক্তমত » চটকদার সাংবাদিকতা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে
৫ বার পঠিত
সোমবার ● ৯ নভেম্বর ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

চটকদার সাংবাদিকতা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে

---চটকদার সাংবাদিকতা সমাজ, রাষ্ট্র এবং সাংবাদিকতা পেশার ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে বাণিজ্যিক স্বার্থে ভিউ ও ক্লিকের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে গণমাধ্যমের একাংশ অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকছে।

চটকদার সাংবাদিকতা বা সেনসেশনালিজম বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সাধারণ মানুষের কাছে এর ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করছে। সত্য তথ্য তুলে ধরার বদলে চটকদার শিরোনাম, এআই দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর ভিডিও বা বিকৃত তথ্য উপস্থাপন করা হয়, যা সমাজে তীব্র বিভ্রান্তি ছড়ায়। কারও ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি, পারিবারিক সংকট বা অপ্রয়োজনীয় কেলেঙ্কারি নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত প্রচার চালানো হয়, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মান ক্ষুণ্ন করে। আদালত প্রাঙ্গণ বা সংবেদনশীল স্থানে সাংবাদিকদের ভিড়, লাইভ সম্প্রচার এবং অশালীন আচরণ সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অনাস্থা জন্ম দেয়।

বর্তমানে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মৌলিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ সংকটের চেয়ে কোনো আলোচিত ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, বিতর্ক বা আদালতের খুঁটিনাটি নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি বা ক্লিকবাইট শিরোনাম করার প্রবণতা তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। চটকদার বিনোদন, তারকাদের ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি কিংবা অনাবশ্যক বিতর্ক নিয়ে অতিমাত্রায় মেতে থাকার কারণে দেশের মূল সমস্যাগুলো ঢাকা পড়ে যায়। অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, দুর্নীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো গুরুতর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যাগুলো প্রতিনিয়ত প্রচারের অন্তরালে চলে যায়। চটজলদি খবর প্রকাশ এবং আকর্ষণীয় শিরোনাম দেওয়ার প্রতিযোগিতায় সংবাদের সত্যতা যাচাইয়ের বালাই থাকে না। ফলে বস্তুনিষ্ঠতার অভাব দেখা দেয় এবং সমাজে বিভ্রান্তিকর বা বিকৃত তথ্য ছড়িয়ে পড়ে।

অতিমাত্রায় অতিরঞ্জিত ও ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচারের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে গণমাধ্যমের সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। যাচাই না করে বা সেনসেশন তৈরির উদ্দেশ্যে সংবাদ প্রচারের ফলে সমাজে বিভ্রান্তি ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাণিজ্যিক মুনাফার লোভে অনেক সময় স্পর্শকাতর বা বিচারাধীন বিষয়ে একতরফা প্রচার চালানো হয়, যাকে মিডিয়া ট্রায়াল বলা হয়। এর ফলে বহু নিরপরাধ ব্যক্তির সামাজিক ও পারিবারিক মর্যাদা মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায়, যা অনেক সময় ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকেও ঠেলে দেয়।

লোভী বা স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে যখন সাংবাদিকতাকে ভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়, তখন পেশাদার সাংবাদিকদের সম্মান ক্ষুণ্ন হয় এবং সমাজে গণমাধ্যমের ওপর থেকে মানুষের আস্থা উঠে যায়। অশালীনতা, ঔদ্ধত্য ও ভিত্তিহীন বিতর্ককে যখন জনপ্রিয়তার মাপকাঠি বানানো হয়, তখন তরুণ প্রজন্ম ভুল সংস্কৃতি ও নেতিবাচক মূল্যবোধের দিকে ধাবিত হয়।

সাংবাদিকতা যখন সত্য প্রকাশের পরিবর্তে মুনাফাখোর বাণিজ্যে রূপ নেয়, তখন ক্ষমতার দাপট ও কায়েমি স্বার্থান্বেষীদের তোষণের উদ্দেশ্যে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সুপরিকল্পিতভাবে লুকিয়ে রাখা হয়। ফলে প্রকৃত অপরাধীরা পর্দার অন্তরালে থেকে যায় এবং সমাজ বা রাষ্ট্রে অনিয়ম ও দুর্নীতি আরও প্রশ্রয় পায়।

যখন চটকদার খবর দিয়ে সাময়িকভাবে ভিউ পাওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে গণমাধ্যম সম্পর্কে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়। ফলস্বরূপ, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকতার ওপর থেকে জনগণের আস্থা চরমভাবে হ্রাস পায়। ভিউ ও কাটতি বাড়ানোর জন্য অনেক সময় সমাজে কৃত্রিম উত্তেজনা, রেষারেষি বা সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানো হয়, যা সামাজিক সংঘাত ও দাঙ্গার জন্ম দিতে পারে। এছাড়া অশালীনতাকে বিনোদন এবং ঔদ্ধত্যকে ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করার ফলে তরুণ প্রজন্মের সুস্থ সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

তরুণ প্রজন্মের সামনে বিতর্কিত আচরণ ও অশালীন ভাষাকেই জনপ্রিয়তার মাপকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা মেধা, পরিশ্রম ও আদর্শের গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে। চটকদার ও বিভ্রান্তিকর শিরোনামের কারণে সমাজে ভুল তথ্যের বিস্তার ঘটছে, যা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ, অসন্তোষ এবং সামাজিক বিভাজন তৈরি করছে।

বস্তুনিষ্ঠতার অভাব এবং ব্যক্তিগত কুৎসা বা বিনোদনকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার ফলে মূলধারার সাংবাদিকতার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা ও আস্থা কমে যাচ্ছে। অপরাধমূলক ঘটনা বা তারকাদের অনাবশ্যক ব্যক্তিগত বিতর্ককে যেভাবে বড় করে দেখানো হয়, তা সমাজে এক ধরনের অসুস্থ ও কুরুচিপূর্ণ সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

চটকদার সাংবাদিকতা সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানুষের মানসিকতায় সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। চটকদার সাংবাদিকতা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভাবমূর্তি মারাত্মভাবে ক্ষুণ্ন করছে। সুস্থ ও দায়িত্বশীল সমাজ বিনির্মাণের জন্য গণমাধ্যমগুলোর চটকদার খবরের মোহ ত্যাগ করে জনস্বার্থমূলক ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় ফিরে আসা অপরিহার্য।





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)