মঙ্গলবার ● ৬ জানুয়ারী ২০২৬
প্রথম পাতা » সুন্দরবন » সুন্দরবনে বনদস্যুরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে
সুন্দরবনে বনদস্যুরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে
বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে দীর্ঘদিন পর আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যুরা। অহরহ ঘটছে জেলে-বাওয়ালিদের জিম্মি ও অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে সবকিছু। ভয় আর আতঙ্কে অনেকেই এখন বনেই যেতে চায় না। বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় জেলে ও তাদের পরিবারের সদস্যদের।
গত এক সপ্তাহে সাতক্ষীরা রেঞ্জের বাটলুর খাল থেকে মিজান ও আলমগীরসহ ৯ জেলেকে অপহরণ করে দস্যুরা। পরে মাথাপিছু ২ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দিয়ে তারা ফিরে এসেছেন। সুন্দরবনের গোলকানন রিসোর্ট থেকে ২ জানুয়ারি শুক্রবার বিকেলে কানুরখোলা খালে কাঠের বোটে ভ্রমণে বের হন পর্যটক ও রিসোর্ট মালিকসহ সাতজন। আকস্মিক তারা অপহরণের শিকার হন। দস্যু মাসুম মৃধার নেতৃত্বে একটি বাহিনী তাদের অপহরণ করে বনের ভেতর নিয়ে যায়। পরে তিন পর্যটক ও মাঝিকে মুক্তি দিয়ে দুই পর্যটক ও রিসোর্ট মালিককে বনের অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। অপহরণের দুই দিন পর ৫ জানুয়ারি রবিবার কোস্ট গার্ড ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করে। এ ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছেন বনজীবী, পর্যটক ও রিসোর্ট মালিকরা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবনে এক সময়ে ত্রাস সৃষ্টি করে জলদস্যুরা। অপহরণ, দস্যুতাসহ নানা অপরাধের অভয়ারণ্য ছিল এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। জেলে, বাওয়ালি থেকে শুরু করে পর্যটকরাও সবসময় থাকতেন ভয়ে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩২টি বাহিনীর প্রধানসহ ৩২৮ দস্যু ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪টি গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে। বনদস্যুদের আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে ২০১৮ সালের নভেম্বরে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে বনদস্যুদের তৎপরতা অনেকটাই কমে আসে। তবে গত বছরের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জেলপলাতক অনেক দাগী আসামি সুন্দরবনে আশ্রয় নেয়। এ ছাড়াও দস্যুতায় ফিরে আসে আত্মসমর্পণকারীদের অনেকে। তারা সংগঠিত হয়ে বাহিনী গড়ে তুলে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্নসুত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি সাতক্ষীরা রেঞ্জে মজনু বাহিনী, আলিফ মোল্লা বাহিনী, মেহেদী হাসান মিলন বাহিনী, রবিউল ইসলাম বাহিনী, জিয়া বাহিনী, ফজলু বাহিনী, মাসুম বাহিনী, আব্দুল্লাহ বাহিনী, রবিউল বাহিনী, জাকির বাহিনী, রেজাউল বাহিনী এবং খুলনা রেঞ্জে রবিউল (মাস্টার বাহিনী), খানজেয়া বাহিনী, বিল্লাল বাহিনী, আমিনুর বাহিনী, জিল্লুর বাহিনী, রশিদ বাহিনী, আসাবুর বাহিনী, দয়াল বাহিনী ও আলিম-মিলন পাটোয়ারী-রবিউল বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। এসব দস্যু বাহিনী শ্যামনগর এলাকা, বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা, ঢাংমারি ও রামপাল এলাকা, খুলনার দাকোপ ও কয়রা এলাকার কয়েকটি পয়েন্টে উল্লেখ্যযোগ্য দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। তাদের সদস্যরা বাটলু নদী, চরামেঘনা খাল, ফিরিঙ্গী নদী, হাতিভাঙ্গা খাল, কেওড়াতলী খাল, চালতামারী খাল, লম্বাখালী খাল, তক্তাখালী খাল, সুপদি-গুবদি খাল, বাগদী খাল, মানিকচোরা খাল, খেজুনাদানা খাল, ইলসেমারী খাল, মাজুর নদী খাল, জলঘাটা খাল, তালতলি খাল, মাইট্টার কিনারা, খলসিবুনিয়া খাল, কলাগাছিয়া নদী, আঠারবেকী খাল, দাড়গাঙ খাল, সাচানাংলা, জয়মনি খাল এলাকা, খলসিবুনিয়া খালের মুখ, বেলমারী, হংসরাজ নদীর মুখ, নিশানাখালী, কালির খাল,মামার খাল, শরবতখালী খালের সংলগ্ন কাচিকাটা খাল, দুধমুখ খাল, মান্দার খাল, সংকদ্বীপ, অলকির চর, পাটাকাটা, কুকুমারী, কালাবগীর খাল, কুদিখালী খাল, বানতলা খাল, হাড্ডেরা খাল, ঝনঝনিয়া খাল, লাউবুড়–নিয়া খাল, বড় হলদি, ছোট হলদি, মানিকের খাল, ভদ্রা বিভিন্ন খাল, বিদ্যার নদী, হেলা, ঝালিয়া খাল, আন্ধারমানিক, আড়পাঙ্গাশে, ঝাঁলে, পাটকোস্টা, ভ্রমরখালী, আড়োশিবসা, মান্ধারবাড়ি, জাবা ও হংসরাজ নামক খাল ও নদীতে প্রতিনিয়ত দস্যুতা সংঘটন করছে।
সুন্দরবনের জেলেরা জানান, প্রায় জেলে অপহরণ ও জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে দস্যুরা। জেলেদের কাছ থেকে মাছ, টাকা, মোবাইল ফোনসহ সবকিছু কেড়ে নিচ্ছে তারা। টাকা দিতে না পারলে আটকে রেখে নির্যাতনও করা হচ্ছে।
এদিকে, সুন্দরবনের আশপাশে অবৈধভাবে কমপক্ষে ৪০টি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ এবং বানিশান্তা ইউনিয়নে এগুলোর অবস্থান। এসব রিসোর্টে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা আসছেন, যারা বনভূমির কাছাকাছি এলাকার কোনো একটি রিসোর্টে থেকে বনের ভেতরে প্রবেশ করছেন। মোটা অংকের টাকার জন্য বনদস্যুদের নতুন টার্গেট পর্যটক ও রিসোর্ট মালিকদের। এতে পর্যটক ও রিসোর্ট মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আগে জেলে ও বাওয়ালি অপহরণ হলেও পর্যটক অপহরণের ঘটনা এবারই প্রথম। এমধ্যে সুন্দরবনে পর্যটনবাহী প্রায় ৪০০ জালিবোটসহ লঞ্চ ও ট্রলার চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় মালিকরা। এতে দূর-দূরান্ত থেকে সুন্দরবনে ঘুরতে আসা আসা দেশী-বিদেশী পর্যটক ফিরে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে, ৩ জানুয়ারি শনিবার দুপুরে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার বৈদ্যমারী ও জয়মনি বাজারের মাঝামাঝি শরকির খালের কাছেই হরিণ শিকারের ফাঁদে একটি বাঘ আটকে পড়ে। পরে ট্রানকুইলাইজার গান দিয়ে ইনজেকশন পুশ করে অচেতন করে বাঘটিকে ফাঁদ থেকে উদ্ধার করা হয়। শুধু এ ঘটনা না, ইদানীং সুন্দরবনে হরিণ শিকারিদের তৎপরতা বেড়েছে। নিয়মিত অভিযানে প্রায় হরিণের মাংস ও ফাঁদসহ সরঞ্জাম উদ্ধার হচ্ছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত বছর সুন্দরবন থেকে ১ হাজার ৬৩০ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ২১৮ কেজি, ফেব্রুয়ারিতে ৬২ কেজি, মার্চে ৩৩৭ কেজি, এপ্রিলে ২৭৪ কেজি, মে মাসে ১১১ কেজি ৬০ গ্রাম, জুনে ২০ কেজি ৫০০ গ্রাম, জুলাইয়ে ১০ কেজি, আগস্টে ৩২ কেজি, সেপ্টেম্বরে ১৬৫ কেজি, অক্টোবরে ৯৩ কেজি, নভেম্বরে ১৬৫ কেজি এবং ডিসেম্বরে ১৪২ কেজি মাংস উদ্ধার করা হয়।
বাগেরহাটের মোংলার কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আবরার হাসান বলেন, আমরা গত এক বছরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, দেশীয় অস্ত্রসহ অন্তত ৪২ ডাকাত দলের সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। বনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুন্দরবনের ডাকাতদের বিরুদ্ধে কোস্ট গার্ড জিরো টলারেন্সে রয়েছে।
জোনাল কমান্ডার কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনে অপরাধ নির্মূলে ডাকাত ও জলদস্যুবিরোধী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গত বছর অভিযান পরিচালনা করে ৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২টি হাতবোমা, ৭৪টি দেশীয় অস্ত্র, অস্ত্র তৈরির বিপুল সরঞ্জামাদি, ৪৪৮ রাউন্ড কার্তুজ এবং দুস্যুদের কাছে জিম্মি থাকা ৫২ জন নারী ও পুরুষ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৯ ডাকাত আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
খুলনা অঞ্চলের বনসংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, বনদস্যু দমনে কাজ করে কোস্ট গার্ড, র্যাব ও নৌপুলিশ। বনদস্যু নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বন বিভাগের নেই। তবে বন বিভাগ বন ও বনের প্রাণী রক্ষায় কাজ করছে। হরিণ শিকার রোধে আগে নৌকায় টহল দেওয়া হত। তবে এখন বনের ভেতর হেঁটে টহল দেওয়া হচ্ছে। টহলে অসংখ্য ফাঁদ উদ্ধার হচ্ছে।
শীতকাল মাছ ধরার মৌসুম। জেলেরা এই সময় বেশি সুন্দরবনে যায়, সে কারণে দস্যুতাও বাড়ে। এ ছাড়া নজরদারির অভাবে দস্যুদের উৎপাত বেড়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে দস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সুন্দরবনে জেলেদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে হবে। তা না হলে বনজীবীদের জীবিকা, পর্যটন ও রাজস্ব আদায় হুমকির মুখে পড়বে।






শ্যামনগরে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সুন্দরবন দিবসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবীতে মানববন্ধন
পাইকগাছায় সুন্দরবন দিবস পালিত
জেলা সিভিল সার্জন আকর্শিক পরিদর্শন করলেন পাইকগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
সুন্দরবন পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী বনবিবি পূজা অনুষ্ঠিত হলো
পলিথিন ও প্লাস্টিক সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি
সুন্দরবনে হরিণ শিকারের ফাঁদে আটকা পড়া বাঘ উদ্ধার
প্রজনন মৌসুম সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরায় দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শুরু
লোনাপানির সুন্দরবন ও উপকূলীয় বালুচরে নিচে লুকিয়ে আছে মিঠাপানির ভান্ডার
সুন্দরবনে নিখোঁজের দুইদিন পর প্রবাসী নারী পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার 