শিরোনাম:
পাইকগাছা, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

SW News24
শনিবার ● ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » লোকাচার এবং শাস্ত্রীয় ধর্ম এক নয়
প্রথম পাতা » মুক্তমত » লোকাচার এবং শাস্ত্রীয় ধর্ম এক নয়
২৪ বার পঠিত
শনিবার ● ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

লোকাচার এবং শাস্ত্রীয় ধর্ম এক নয়

---লোকাচার এবং শাস্ত্রীয় ধর্ম এক জিনিস নয়। নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত মৌখিক ঐতিহ্য, গল্প, প্রবাদ, কুসংস্কার এবং অলৌকিক বিশ্বাস-ভিত্তিক আচার-অনুষ্ঠান। লোকাচার হলো সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি, বিশ্বাস ও প্রথা যা সময়ের সাথে বিকশিত হয়। ভৌগোলিক ও সম্প্রদায়ভেদে ভিন্নতা দেখা যায়  আর শাস্ত্রীয় ধর্ম হলো ধর্মগ্রন্থ-ভিত্তিক, সংগঠিত বিশ্বাস ও অনুশাসন যা নির্দিষ্ট ধর্মীয় কাঠামো অনুসরণ করে। তবুও লোকাচার প্রায়শই শাস্ত্রীয় ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ও মিশ্রিত হতে পারে।

লোকাচার হলো সমাজের প্রচলিত লোকবিশ্বাস ও প্রথা, যা শাস্ত্রীয় ধর্মের প্রতিষ্ঠিত নিয়মের বাইরে বা পাশাপাশি থেকে নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, যা প্রায়শই আঞ্চলিক, কাল-ভিত্তিক এবং অলৌকিক বিশ্বাস দ্বারা পরিচালিত হয়। অনেক লোকাচারে জাদুবিদ্যা, অশুভ শক্তি ও অদৃষ্টবাদিতার প্রভাব থাকে। কোনো নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ বা কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের বদলে লোকমুখে বা প্রথার মাধ্যমে টিকে থাকে। অন্যদিকে শাস্ত্রীয় ধর্ম সুনির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ, মতবাদ ও কেন্দ্রীয় ধর্মীয় কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, যদিও উভয় ধারার মধ্যে প্রায়শই পারস্পরিক প্রভাব ও মিশ্রণ দেখা যায়, যেমন ‘আহোই মাতা’র মতো লোকদেবী এবং দুর্গাপূজার মতো শাস্ত্রীয় আচারের লোকজ রূপায়ণ।

লোকাচার এবং শাস্ত্রীয় ধর্ম এক নয়, এদের মধ্যে গভীর মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। লোকাচার আসে জনগণের মৌখিক ঐতিহ্য, স্থানীয় রীতিনীতি ও জীবনধারা থেকে। শাস্ত্রীয় ধর্ম আসে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ  ও ধর্মগুরুদের শিক্ষা থেকে। এটি সাধারণত লিখিত, অপরিবর্তনীয় এবং একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা দর্শন দ্বারা পরিচালিত হয়। শাস্ত্রীয় ধর্ম সার্বজনীন এবং তত্ত্বনির্ভর।

লোকাচার হলো কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রথা, বিশ্বাস বা সংস্কার। এটি শাস্ত্রের ওপর নির্ভর না করে মৌখিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় লোকাচারে ধর্মের মূল বিধানের চেয়ে স্থানীয় সংস্কৃতি, ভয় বা ভক্তির প্রাধান্য বেশি থাকে। লোকাচার অনানুষ্ঠানিক ও পরিবর্তনশীল। অন্যদিকে, শাস্ত্রীয় ধর্ম সুনির্দিষ্ট নিয়ম, আচার-অনুষ্ঠান ও কেন্দ্রীয় কাঠামো দ্বারা গঠিত। লোকাচার হলো বাংলার বিভিন্ন ব্রত বা লোকদেবতার পূজা, যা স্থানীয় বিশ্বাস থেকে আসে। আর শাস্ত্রীয় ধর্মের উদাহরণ হলো নির্দিষ্ট ধর্মীয় উপাসনা পদ্ধতি ও নৈতিক শিক্ষা।

লোকাচার অনেক সময় ধর্মীয় বিশ্বাসকে সরলীকৃত করে বা স্থানীয় সংস্কৃতিতে মিশে গিয়ে ভিন্ন রূপ নেয়, ফলে এটি শাস্ত্রীয় ধর্মের অতিরিক্ত বা বিকল্প রূপে দেখা দিতে পারে, কিন্তু দুটি ভিন্ন সত্তা। লোকাচার হলো সমাজের প্রাণ বা অভ্যাস।  আর শাস্ত্রীয় ধর্ম হলো সমাজের নিয়ম বা বিধান। যা প্রায়শই একে অপরের সঙ্গে মিশে একটি জটিল ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক রূপ তৈরি করে।

ছ্যয়ের পূজা, যা সনাতন বা হিন্দুধর্মীয় কোনো শাস্ত্রীয় আচার নয়। মূলত নারীরা সন্তান কামনার আশায়, বন্ধ্যাত্ব দূর করার বিশ্বাস থেকে পালন করা লোকজ রূপ। ছ্যয়ের পূজা কোনো শাস্ত্রীয় ধর্মাচার নয়।ছ্যয়ের পূজা কোনো শাস্ত্রীয় ধর্মাচার নয়। এটি গ্রামীণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, দেহভাবনা, ভয়, কামনা ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত এক গভীর লোকজ বিশ্বাস।

সনাতন ধর্মীয় গীতা বেদ পূরাণ উপনিষদে কোথাও এর উল্লেখ নাই, ছ্যয়ের পূজা আর্য ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বাইরে থাকা আদিবাসী ও কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির ধারক। এখানে দেবতা মানে দূরের কোনো স্বর্গীয় সত্তা নয় বরং মাটি, দেহ, যৌনতা, জন্ম ও মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত এক জীবন্ত শক্তি। এটি এলাকাভিত্তিক সকল জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে অনুষ্ঠিত হয়।

ছ্যয়ের পূজার উৎপত্তি ধরা হয় আর্য আগমনের আগের বাংলার বিশ্বাসব্যবস্থায়। তখন দেবতা ছিলেন, নির্দিষ্ট আকাশবাসী নন,বরং মাটি, বন, জল, দেহ ও প্রজননের সঙ্গে যুক্ত শক্তি। সন্তান জন্ম, ঋতুচক্র, উর্বর জমি। এসব ছিল জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ছ্যয় সেই উর্বরতার লোকদেবতা। ছ্যয় অর্থ বুঝায় জীবন টিকিয়ে রাখার শক্তির প্রতীক। ছ্যয়ের পূজা আজও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। তবে এটি গ্রামকেন্দ্রিক ও লোকায়ত পরিসরে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশে ছ্যয়ের পূজা প্রধানত দেখা যায়; দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর, খুলনা,সাতক্ষীরা, নড়াইল, মাগুরা, মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশালের কিছু এলাকায়।

শাস্ত্রীয় ধর্ম হলো ধর্মের তাত্ত্বিক ও আদর্শ রূপ, আর লোকাচার হলো মানুষের যাপিত জীবনের ব্যবহারিক ও সাংস্কৃতিক রূপ। অনেক সময় এই দুইটির মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, আবার কখনো লোকাচার ধর্মেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

লোকাচার মূলত বংশপরম্পরায় চলে আসা মৌখিক ঐতিহ্য এবং স্থানীয় বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল। এতে শাস্ত্রীয় মন্ত্রের চেয়ে আঞ্চলিক গান, ব্রতকথা এবং সামাজিক রীতিনীতির প্রাধান্য বেশি থাকে।  যেমন; সন্তান লাভ, ভালো ফসল, রোগমুক্তি বা অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা পাওয়া। অনেক সময় এতে পুরোহিতের প্রয়োজন হয় না, বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরাই এটি পরিচালনা করেন। স্থানভেদে লোকাচার ভিন্ন হয়। বাংলার গায়ে হলুদ বা অন্নপ্রাশন এর নিয়ম আলাদা হতে পারে।

বাস্তব জীবনে এই দুই ধারা আলাদা নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। শাস্ত্রীয় পূজা-পার্বণের ভেতরেও অনেক সময় স্থানীয় লোকাচার ঢুকে পড়ে, যেমন দুর্গা পূজার নবপত্রিকা বা কলাবউ স্নান। লোকাচার ধর্মকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য এবং আনন্দময় করে তোলে।





আর্কাইভ