রবিবার ● ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রথম পাতা » উপকূল » দেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বিপর্যয়ের শঙ্কা বাড়াচ্ছে
দেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বিপর্যয়ের শঙ্কা বাড়াচ্ছে
দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধগুলো ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ও প্লাবনের শঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রচণ্ড ঢেউ, ঘূর্ণি স্রোত, পানির তীব্র তোড়ে প্রতিদিন পাড় ভাঙছে। প্রকৃতির নিষ্ঠুর খেয়ালের কারণে রাক্ষুসে শিবসা, ঢাকী নদী ও কপোতাক্ষ নদের বাঁধ ভেঙে অসংখ্য মানুষ ঘরহারা হচ্ছেন।
ষাটের দশকে নির্মিত অনেক বেড়িবাঁধ দীর্ঘ দিনেও সঠিকভাবে সংস্কার না হওয়ায় অত্যন্ত জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। খুলনা, পাইকগাছা, কয়রা, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও পটুয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় বহু কিলোমিটার বেড়িবাঁধ মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে।খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা এই তিন জেলায় মোট বেড়িবাঁধ ২০২২.৫৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ রয়েছে ১০৭.৩৫ কিলোমিটার।
অন্যদিকে, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা আর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন খুলনার পাইকগাছা, কয়রা, বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনির মানুষ। বেড়িবাঁধের বেশিরভাগ অংশ ঝুঁকিতে থাকায় দুশ্চিন্তায় তারা।
উপকূলীয় এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বিপর্যয়ের শঙ্কা বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, খুলনা) নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার সেন জানান, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় মোট বেড়িবাঁধ ২০২২.৫৭ কিলোমিটার। ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ১০৭.৩৫ কিলোমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তবায়িত/বাস্তবায়নাধীন বাঁধের দৈর্ঘ্য ৩৫.২২৯ কিলোমিটার। অবশিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ৭২.১২১ কিলোমিটার। এর মধ্যে খুলনা জেলায় বেড়িবাঁধের মোট দৈর্ঘ্য ১০১৩.৪০০ কিলোমিটার। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ৪১.৭৭৮ কিলোমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তবায়িত/বাস্তবায়নাধীন বাঁধের দৈর্ঘ্য ১৯.৬০৯ কিলোমিটার, অবশিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ২২.১৬৯ কিলোমিটার। বাগেরহাট জেলার বেড়িবাঁধের মোট দৈর্ঘ্য ৩৩৮ কিলোমিটার। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ১১.৮৪৭ কিলোমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তবায়িত/বাস্তবায়নাধীন বাঁধের দৈর্ঘ্য ০.৯০০ কিলোমিটার। অবশিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ১০.৯৪৭ কিলোমিটার। সাতক্ষীরা জেলার বেড়িবাঁধের মোট দৈর্ঘ্য ৬৭১.১৭০ কিলোমিটার। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ৫৩.৭২৫ কিলোমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তবায়িত/বাস্তবায়নাধীন বাঁধের দৈর্ঘ্য ১৪.৭২০ কিলোমিটার। অবশিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ৩৯.০০৫ কিলোমিটার।
খুলনার পাইকগাছার দুর্গম উপকূলীয় দ্বীপ ইউনিয়ন দেলুটি, পাটকেলপোতা ও কুমখালীর মানুষ বাঁধ ভাঙার আতঙ্কে রাত হলে ঘুমাতে পারেন না। পাইকগাছার কুমখালী বেড়িবাঁধের করুণ দশা তুলে ধরে শান্তা এলাকার বাসিন্দা সাফায়েত হোসেন বলেন, শিবসা নদীর প্রবল স্রোতে তীরে ভাঙন অব্যাহত আছে, এতে মাটিতে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে সেগুলো ধসে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি। পূর্ণিমার সময় যখন নদীতে জোয়ারের পানি বাড়ে তখন বুকের মধ্যে ধকধক করে। কারণ এর আগে বহুবার বাঁধ উপচে লবণাক্ত পানি ঢুকে এলাকার ফসলি জমি-ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কপোতাক্ষ নদের পাড় ঘেঁষা কয়রার কাশির হাটখোলা এলাকার গৃহিণী অর্চনা বলেন, নদীর তীব্র ভাঙনে অসংখ্য পরিবারের বসতভিটা, বাগান, ফসলি জমি ও জায়গা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেলে কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করে। গত কয়েক বছরে আমাদের ৭-৮ বিঘা জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আমরা কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি। কিছু সংস্থা থেকে ত্রাণ পেয়েছি মাত্র। এছাড়া কয়রার দশহালিয়া, পবনা, শেওড়া, হরিণখোলার ওয়াবদার বেড়িবাঁধেরও নাজুক অবস্থা।
প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় জেলাগুলোতে বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। তখন লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে, ফসল বিনষ্ট হয়। জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় মাছ।
বেড়িবাঁধ ভাঙার কারণ অনুসন্ধানে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, একশ্রেণির প্রভাবশালী মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়িবাঁধ কেটে পাইপ স্থাপনের মাধ্যমে নদীর নোনাপানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ করেন। তাছাড়া বেড়িবাঁধের নিচ দিয়ে পাইপ ঢুকিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলনের পর সৃষ্ট ছিদ্র ভরাট করেন না। ফলে কিছুদিন যেতে না যেতেই বেড়িবাঁধের অবস্থা ভঙ্গুর ও নাজুক হতে থাকে। নদীতে জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলেই এসব স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়।
কিছু কিছু এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইচ গেট দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় আর পানির সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে বৃষ্টির পানি আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং অনেক সময় বাঁধ ভেঙে পানি বের হয়ে আসে। ষাটের দশকে নির্মাণ করা উপকূলের এই বাঁধ বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করা হয়েছে, কিন্তু পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। জিও ব্যাগ ও বালুর বস্তার রিং দিয়ে বাঁধ কোনো রকমে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। নদীতে পলি পড়ে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রায়ই এসব নড়বড়ে বাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ষাটের দশকে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় ২ হাজার ২৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৮২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ মাটি দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। আর কংক্রিট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল মাত্র ৪৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। মাটির তৈরি বাঁধগুলো ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে পারছে না। তবে এক্ষেত্রে ব্লকের বেড়িবাঁধ ঢাল স্বরূপ কাজ করে। জলোচ্ছ্বাস ও দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়।
স্বাধীনতার প্রায় ৫৫ বছরে উপকূল সুরক্ষায় নতুন কোনো পোল্ডারও তৈরি করা হয়নি। পাকিস্তান আমলে তৈরি বেড়িবাঁধ সংস্কার আর পুনর্নির্মাণেই কেটে গেছে এত বছর। দীর্ঘসময় ধরে কেবল জোড়া তালি দিয়েই চলছে। মাটির তৈরি এসব নড়বড়ে বাঁধ এখন আর সামাল দিতে পারছে না ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া নিষ্ক্রিয় স্লুইচ গেটগুলোর কারণে বর্ষায় ও জলোচ্ছ্বাসে জলাবদ্ধতা এবং ভাঙন ঝুঁকি তীব্র আকার ধারণ করে।
সামান্য ঘূর্ণিঝড় বা পূর্ণিমার প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হলেই এসব দুর্বল বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি বহু বছরের। পরিকল্পিত ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় প্রতি বছর ভাঙন দেখা দেয়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস অথবা অবিরাম বৃষ্টি হলেই কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। তখন নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়। এতে জনপ্রতিনিধি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের পকেট ভরে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে খুলনা, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের অতি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে জরুরি সংস্কারকাজ চললেও, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের স্থায়ী সমাধান হিসেবে টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন ভুক্তভোগী উপকূলবাসী।






বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও বৃষ্টিতে পাইকগাছায় বেড়েছে জনদুর্ভোগ
জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর ন্যার্যতা ও সমতা কার্যকর করা প্রযোজন
জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলের জনগোষ্ঠীর ন্যার্যতা ও সমতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে
সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলের বনজীবীদের কষ্ট,পরিশ্রম আর অভাব নিত্য সঙ্গী
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় নারীদের রোগবালাই বাড়ছে
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষের জীবন জীবিকা বদলে যাচ্ছে
খুলনার তিন উপজেলার খাবার পানির এক মাত্র উৎস উপকূলের আলমশাহী পুকুর 