শনিবার ● ২৫ জুলাই ২০২৬
প্রথম পাতা » উপকূল » জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলের জনগোষ্ঠীর ন্যার্যতা ও সমতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে
জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলের জনগোষ্ঠীর ন্যার্যতা ও সমতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে
প্রকাশ ঘোষ বিধান
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় জনগোষ্ঠী মৌলিক ন্যায্যতা ও সমতা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে ভূমিকা না রেখেও জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় শিকারা। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে ন্যূনতম ভূমিকা মাত্র ০.৪% রাখা সত্ত্বেও, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে মারাত্মক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ ন্যায্যতা ও সমতা থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন। এই বিপুল জনগোষ্ঠী বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে প্রায় কোনো ভূমিকা না রেখেও ভৌগোলিক কারণে জলবায়ু সংকটের প্রথম সারির ভুক্তভোগী। উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দূষণের খেসারত দিতে গিয়ে তারা প্রতিনিয়ত মৌলিক অধিকার, অর্থনৈতিক সাম্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা হারাচ্ছেন।
প্রধান প্রধান বঞ্চনা ও সমতাহীনতার ক্ষেত্রসমূহ গুলো হলো, পানির অধিকার ও স্বাস্থ্য সংকট: সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ কমছে। মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। নারীদের খাবার পানি সংগ্রহের জন্য প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হাঁটতে হচ্ছে। লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য চরম ঝুঁকিতে পড়ছে।
অর্থনৈতিক ও পেশাগত বৈষম্য: সাগরে ঘন ঘন জলোচ্ছ্বাস এবং কৃষিজমিতে লবণাক্ততার কারণে সনাতন কৃষি ও মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। উত্তরণ ও অন্যান্য গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, লবণাক্ততার কারণে আগামীতে উপকূলের কৃষি আয় ২১% পর্যন্ত কমতে পারে।
জেন্ডার বা লিঙ্গভিত্তিক অসমতানারীদের ওপর বাড়তি চাপ: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পুরুষরা কাজের খোঁজে অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে উপকূলের নারীদের ওপর সংসার চালানো, দিনমজুরি করা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার দ্বিগুণ চাপ তৈরি হচ্ছে। পরিবারের বৃদ্ধ ও শিশুদের দেখাশোনা এবং মাইলের পর মাইল হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহের মূল বোঝা নারীদের ওপরই পড়ে।
জলবায়ু শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুতি: নদীভাঙন এবং স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে প্রতি বছর ২ থেকে ৩ লাখ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে গৃহহীন হচ্ছে। তারা কোনো বৈশ্বিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বস্তিবাসী হতে বাধ্য হচ্ছে। জীবিকা হারিয়ে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে শহরের বস্তিতে জলবায়ু উদ্বাস্তু হিসেবে চরম অমানবিক জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত: দুর্যোগে স্কুল ভেঙে যাওয়া এবং পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে হাজার হাজার উপকূলীয় শিশু প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ছে ও শিশুশ্রমে যুক্ত হচ্ছে।
দারিদ্র্যের ফাঁদ: ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় আইলা, আম্পান, রেমাল উপকূলের মানুষের সম্পদ ও কর্মসংস্থান কেড়ে নিয়ে তাদের স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য সীমার নিচে ঠেলে দিচ্ছে। পেশা হারানো: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মাটির লবণাক্ততা ২৬% বেড়ে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও মিঠা পানির মৎস্য চাষ সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে।
স্বাস্থ্য ও মৌলিক অধিকারের বঞ্চনাসুপেয় পানির সংকট: উপকূলীয় এলাকার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ তীব্র সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে, যেখানে প্রায় ৭২% পরিবার লবণাক্ত পানি পানে বাধ্য হচ্ছে।
প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকি: অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জরায়ুঘটিত রোগ ও গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। দুর্যোগে উচ্চ মৃত্যুঝুঁকি: সামাজিক অবকাঠামো ও আশ্রয়কেন্দ্রের লিঙ্গ-অসংবেদনশীল পরিবেশের কারণে যেকোনো বড় দুর্যোগে পুরুষের তুলনায় নারী ও শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিকাঠামোর অভাব: ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমীক্ষা অনুযায়ী, উপকূলের ৫৭% পরিবার পর্যাপ্ত বেড়িবাঁধ এবং সাইক্লোন শেল্টারের অভাবে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
নারীকেন্দ্রিক অভিযোজন: ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। অধিকারভিত্তিক পুনর্বাসন: বাস্তুচ্যুত জলবায়ু শরণার্থীদের জন্য পরিকল্পিত আবাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। বাজেট বরাদ্দ: জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম ৩% জলবায়ু অর্থায়নে বরাদ্দ দেওয়া এবং তা সরাসরি উপকূলের কল্যাণে ব্যয় করা।
ন্যায্যতা ও সমতা প্রতিষ্ঠায় করণীয়, জলবায়ু সমতা নিশ্চিত করতে ক্ষতিপূরণ আদায়: আন্তর্জাতিকভাবে লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল থেকে সরাসরি উপকূলের ক্ষতিগ্রস্তদের অনুদান নিশ্চিত করা। টেকসই অবকাঠামো: লবণাক্ততা-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণ করা। উপকূল রক্ষা করতে উচুঁ ও শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা।
ক্ষতিপূরণের অভাব: উন্নত দেশগুলো কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী হলেও জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আন্তর্জাতিক ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি তহবিল থেকে পর্যাপ্ত অর্থায়ন এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। স্থানীয়দের অংশগ্রহণের অভাব: অভিযোজন প্রকল্প বা টেকসই বাঁধ নির্মাণে স্থানীয় ভুক্তভোগী জনগণের মতামত ও প্রথাগত জ্ঞানকে উপেক্ষা করা হয়, যা সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতিকে বাড়িয়ে তোলে।
জলবায়ু অন্যায্যতা দূর করতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আদায় এবং দেশীয় নীতিতে পরিবেশবান্ধব টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও উপকূলীয় নারীদের কেন্দ্র করে সমন্বিত জলবায়ু ন্যায্যতা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট






জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর ন্যার্যতা ও সমতা কার্যকর করা প্রযোজন
সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলের বনজীবীদের কষ্ট,পরিশ্রম আর অভাব নিত্য সঙ্গী
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় নারীদের রোগবালাই বাড়ছে
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষের জীবন জীবিকা বদলে যাচ্ছে
খুলনার তিন উপজেলার খাবার পানির এক মাত্র উৎস উপকূলের আলমশাহী পুকুর
আইলার ক্ষত নিয়ে ১৭ বছরে উপকূলবাসী
পাইকগাছায় সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের জন্য লাইফ জ্যাকেট বিতরণ 