শুক্রবার ● ১৭ জুলাই ২০২৬
প্রথম পাতা » উপকূল » জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় নারীদের রোগবালাই বাড়ছে
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় নারীদের রোগবালাই বাড়ছে
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় নারীরা উচ্চ রক্তচাপ, জরায়ু সংক্রমণ, ও অকাল গর্ভপাতের মতো ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছেন। লবণাক্ত পানি পান ও ব্যবহার, সুপেয় পানির তীব্র সংকট এবং দুর্যোগকালীন সময়ে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া এই অঞ্চলের নারীদের স্বাস্থ্যকে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে ফেলেছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নারীদের লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘদিন কাজ করা এবং দৈনন্দিন কাজে এর ব্যবহারের ফলে উপকূলীয় নারীদের মধ্যে জরায়ু সংক্রমণ, অনিয়মিত ঋতুস্রাব ও সাদা স্রাবের মতো সমস্যা মহামারি আকার ধারণ করেছে। অতিরিক্ত লবণ (সোডিয়াম) গ্রহণের ফলে গর্ভবতী নারীদের উচ্চ রক্তচাপ, খিঁচুনি এবং প্রি-এক্লাম্পসিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়। ফলে অপরিণত শিশুর জন্ম ও মাতৃমৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাবার পানির তীব্র সংকটের কারণে নারীরা দৈনিক প্রয়োজনের চেয়ে বহুগুণ বেশি লবণ গ্রহণ করছেন। এর প্রভাবে শুধু গর্ভবতীরা নন, সাধারণ নারীরাও কিডনি রোগ এবং চরম অপুষ্টিতে ভুগছেন।
গত কয়েক দশকে উপকূলীয় এলাকায় পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে পরিবেশের বিপন্নতার প্রভাব প্রথম এসে পড়ে নারীর ওপর। পানির স্তর নিচে নেমে যায়, নদীর পানি লবণাক্ত হয়ে যায়,জলাশয় শুকিয়ে যায়, দুই-একটি নলকূপে, যেখানে মিষ্টি পানি ওঠে সেখানেও পানির জন্য হাহাকার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা না হলে কলসি নিয়ে পানির খোঁজে দীর্ঘপথ হাঁটা। জ্বালানির জন্য কাঠ সংগ্রহ করতে নারীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনের ভেতরে যেতে হয়। শুধু খাওয়ার পানিই নয়, সংসারে সবকিছুর জন্য যে পানি সেই পানি সংগ্রহ করার দায়িত্বও নারীর। তাই সেই বিপর্যয় মোকাবিলায় নারীকে সামনে দাঁড়াতে হয়।
উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে ফসল হয় না। কাজের খোঁজে পুরুষকে ঘর ছাড়তে হয়। মেয়েরা রয়ে যায় সন্তান, বয়স্কদের দেখে রাখার দায়িত্বে। সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার দায়িত্ব তার। পুরুষ না থাকায় নিরাপত্তাহীনতা ও অরক্ষিত জীবন।
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটের উপজেলাগুলীতে লবণাক্ততার প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। পাইকগাছা উপজেলার গড়ইখালীর ফাতেমা বেগম বলেন, লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে চুল ও ত্বকের ক্ষতি হয়। রং কালো হয়ে যায় ও দ্রুত বার্ধক্য চলে আসে। এছাড়া গর্ভপাত ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। সেখানকার নারী ও শিশুরা চিংড়িপোনা ধরার জন্য ভাটার সময় ভোরে ও দিনের বেলায় ফলে প্রায় ৭-৮ ঘণ্টা তাদের লবণাক্ত পানিতে থাকতে হয়। এর ফলে প্রজনন স্বাস্থ্যসহ নারী অন্যান্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩ শিরোনামের প্রতিবেদন বলছে, বাইরে থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহে খুলনা বিভাগের ১৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ পরিবারের ৩০ মিনিটের বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। উন্নত উৎস থেকে পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে লবণাক্ততা একটি সমস্যা হতে পারে। দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে খুলনা বিভাগে নবজাতক মৃত্যুর হার (প্রতি হাজারে ২১.৭৯ জন) সব থেকে বেশি। বাল্যবিবাহের হার বেশি এমন পরিসংখ্যানে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে খুলনা।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে অন্যতম জরায়ুর সমস্যা। লবণাক্ত পানির কারণে নারীরা এখন জরায়ু ক্যান্সারের মতো জটিল রোগে ভুগছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে প্রতিবছর যে কয়েক লাখ নারী জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ উপকূলীয় অঞ্চলের নারী। নারীদের জরায়ুসংক্রান্ত অসুখের তীব্রতা লবণাক্ততাপ্রবণ গ্রামগুলোতে বেশি। সে জন্য অল্প বয়সেই এ এলাকার নারীরা জরায়ু কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে। কয়রা উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে জরায়ুসংক্রান্ত রোগে ভুগছেন এমন নারীর সন্ধান পাওয়া যাবে। সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবে লবণাক্ততা প্রভাব শীর্ষক একটি গবেষণায় বলা হয়, উপকূলীয় অঞ্চলে নারী ও কিশোরীরা মাসিকের সময় ব্যবহৃত কাপড় ধুয়ে আবারো সেটি ব্যবহার করে এবং লবণাক্ত পানিতে গোসলসহ দৈনন্দিন কাজের কারণে তাদের জরায়ুসংক্রান্ত রোগের উপস্থিতি অনেক বেশি। উপকূলের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই জরায়ুসংক্রান্ত রোগে নারীরা আক্রান্ত, ডাক্তাররা রোগীদের জরায়ু কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছেন। নারীদের পুরো জরায়ু কেটে ফেলার পর অনেকের স্বামী তাদের ফেলে অন্যত্র বিয়ে করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে নারীদের গর্ভপাতের হার বেড়েছে। দাকোপ উপজেলার গর্ভবতী নারীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্তি লবণাক্ত পানি গ্রহণের ফলে নারীদের জরায়ু রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন খিঁচুনি, গর্ভপাত, এমনকি অপরিণত শিশু জন্ম দেয়ার হার বেড়েছে। এছাড়া নারীরা দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজ, গোসল, কৃষি কাজ, গবাদিপশু পালন, চিংড়ির পোনা ধরাসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে নারীরা লিউকোরিয়াসহ সাধারণ পানিবাহিত রোগ এবং চর্মরোগের সংক্রমণে বেশি আক্রান্ত হয়।
বিশ্বব্যাংকের অ্যান আনসাসটেইনেবল লাইফ: দ্য ইমপ্যাক্ট অব হিট অন হেলথ অ্যান্ড দ্য ইকোনমি অব বাংলাদেশ শিরোনামে প্রকাশিত গবেষণায় ১৯৭৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জরিপে দুই ধাপে ১৬ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য নেওয়া হয়েছে। এতে অন্য একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, উপকূলের যে নারীরা ২৮ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার মধ্যে থাকেন, তাঁদের গর্ভপাতের ঝুঁকি ২৫ শতাংশ বেশি হয়। এ ধরনের তথ্য-উপাত্ত এবং গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি সম্পৃক্ত।
খুলনার সিভিল সার্জন ডাঃ মোছাঃ মাহফুজা খাতুন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত খুলনা ও সাতক্ষীরা উপকূলের মানুষ। সুপেয় পানির অভাব ও লবণাক্ত পানিতে কাজ করার ফলে উপকূলের নারীরা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। অনেক নারীর জরায়ু সমস্যা নিয়ে স্থানীয় ক্লিনিকগুলোতে গেলে তারা সেগুলো অপারেশন করে দিচ্ছে অনেকে অভিযোগ করেছেন। জরায়ু কাটার বিষয়টি জন-গুরুত্বপূর্ণ ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়। এই বিষয়ে নজরদারি রাখতে হবে।
সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক সমস্যার কথা বিবেচনা করে সুপেয় পানি এবং টেকসই জীবন-জীবিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নারীকে পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় যত বেশি সংযুক্ত করা যাবে, আমরা তত বেশি লাভবান হবো। কারণ নারীরা ব্যক্তিগত ঝুঁকি ও নাজুকতার মধ্যেও দুর্যোগকালীন তার দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করে যান। তাই টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে উপকূলের নারীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচী নিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন একটি কঠিন বাস্তবতা। এর প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের উপকূলীয় নারীদের জীবনে। বারবার ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে বাস্তুচ্যুতি এবং সুপেয় পানির জন্য দীর্ঘ পথ হাঁটা নারীদের মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া লবণাক্ততার কারণে চর্মরোগও ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এই সংকট নিরসনে উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির আধার তৈরি, প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্প ও নারীদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।






জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষের জীবন জীবিকা বদলে যাচ্ছে
খুলনার তিন উপজেলার খাবার পানির এক মাত্র উৎস উপকূলের আলমশাহী পুকুর
আইলার ক্ষত নিয়ে ১৭ বছরে উপকূলবাসী
পাইকগাছায় সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের জন্য লাইফ জ্যাকেট বিতরণ
পাইকগাছায় উপকূল দিবস পালিত
দুবলারচরে রাস উৎসবে যেতে উপকূলবাসীর মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি; তৎপর শিকারীরাও
জীবনের ঝুঁকি ও সুদের বোঝা মাথায় নিয়ে জীবিকার লক্ষে জেলেদের সমুদ্রযাত্রা 