শুক্রবার ● ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » এনজিও কর্তৃক সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ কতটা যুক্তিযুক্ত
এনজিও কর্তৃক সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ কতটা যুক্তিযুক্ত
এনজিও কর্তৃক সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি সমকালীন সাংবাদিকতায় একটি বহুল আলোচিত এবং দ্বিমুখী বিতর্কযুক্ত বিষয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পেশাদারিত্ব এবং এনজিওর নিজস্ব এজেন্ডার ওপর ভিত্তি করে এর পক্ষে ও বিপক্ষে শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে।
প্রশিক্ষণের পক্ষে যুক্তি বিশেষায়িত বিষয়ে দক্ষতার উন্নয়ন: সাধারণ সাংবাদিকতায় অনেক সময় জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, জেন্ডার সমতা, টেকসই উন্নয়ন বা জনস্বাস্থ্যের মতো জটিল বিষয়গুলো গভীরভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয় না।জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, জেন্ডার সমতা, শিশু অধিকার এবং টেকসই উন্নয়নের মতো জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে এনজিওদের গভীর প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান থাকে। এনজিওগুলো এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সাংবাদিকদের নিবিড় প্রশিক্ষণ দেয়, যা রিপোর্টিংয়ের গুণগত মান বাড়ায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব অর্থায়নে সাংবাদিকদের নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার বাজেট থাকে না। বিশেষ করে মফস্বল বা স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের জন্য এনজিওর এই উদ্যোগগুলো পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির বড় সুযোগ তৈরি করে। এনজিওগুলো মাঠপর্যায়ে প্রচুর গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাংবাদিকরা এই নির্ভরযোগ্য ডেটা সোর্স বা উপাত্তগুলো ব্যবহারের কৌশল শিখতে পারেন, যা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সাহায্য করে। আধুনিক যুগে ডেটা জার্নালিজম, ফ্যাক্ট-চেকিং বা ডিজিটাল নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে এনজিও বা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো উন্নতমানের প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকে, যা সাংবাদিকদের যুগের সাথে তাল মেলাতে সাহায্য করে।
প্রশিক্ষণের বিপক্ষে যুক্তি স্বার্থের সংঘাত: এনজিওগুলোর নিজস্ব লক্ষ্য, দাতা সংস্থার এজেন্ডা এবং নির্দিষ্ট প্রজেক্ট থাকে। অনেক সময় প্রশিক্ষণের আড়ালে তারা সাংবাদিকদের চিন্তাচেতনাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, যা সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি নিরপেক্ষতার পরিপন্থী। কোনো এনজিওর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা বা প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর, ওই নির্দিষ্ট এনজিওর কোনো অনিয়ম, দুর্নীতির বা ব্যর্থতার খবর সাংবাদিকরা সাধারণত প্রকাশ করতে চান না। এতে ওই সংস্থার প্রতি এক ধরনের সফট কর্নার বা পক্ষপাত তৈরি হয়।
এনজিওগুলো অনেক সময় দেশের মৌলিক বা সামষ্টিক সমস্যার চেয়ে তাদের প্রজেক্ট-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে মিডিয়াতে বেশি ফোকাস করাতে চায়। ফলে জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক মৌলিক ইস্যু আড়ালে চলে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রশিক্ষণটি প্রকৃত অর্থে সাংবাদিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নয়, বরং এনজিওর নিজস্ব প্রচার বা পিআর কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান বা গ্রহণযোগ্যতার শর্তএনজিও কর্তৃক সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ তখনই পুরোপুরি যুক্তিযুক্ত এবং ফলপ্রসূ হতে পারে, যখন কয়েকটি বিষয় কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ বা যাতায়াত ভাতার বাইরে সাংবাদিকদের কোনো ধরনের অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা বা উপহার দেওয়া উচিত নয়। প্রশিক্ষণ সাংবাদিক নিলেও, ওই বিষয়ে নিউজ করার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী হতে হবে। এনজিওর দেওয়া তথ্য বা উপাত্ত অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে, সাংবাদিকসুলভ সন্দেহবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে তা ক্রস-চেক বা যাচাই করে নিতে হবে।
এনজিও বা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের বিষয়টি বেশ ইতিবাচক ও যুক্তিযুক্ত, তবে এর পেছনে কিছু বিতর্ক এবং সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। উন্নয়নমূলক সাংবাদিকতা ও দক্ষতার বিকাশে এটি যেমন বড় ভূমিকা রাখে, তেমনি সাংবাদিকদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কিছু প্রশ্নও তোলে।
প্রেস কাউন্সিল, তথ্য অধিদপ্তর বা সাংবাদিকদের নিজস্ব ইউনিয়নগুলোর উচিত এনজিওর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে পেশাদারী প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়ানো। এনজিওর প্রশিক্ষণ সাংবাদিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য যুক্তিযুক্ত এবং ইতিবাচক, যদি সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বিসর্জন না দিয়ে কেবল জ্ঞান ও দক্ষতা টুকুই গ্রহণ করেন।
এনজিও কর্তৃক সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ততক্ষণই যুক্তিযুক্ত, যতক্ষণ তা সাংবাদিকদের পেশাদারিত্ব ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে। সাংবাদিকরা যদি এনজিওর দেওয়া কারিগরি জ্ঞান ও তথ্য গ্রহণ করার পরও নিজের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতে পারেন, তবে এই ধরণের প্রশিক্ষণ সামগ্রিক সাংবাদিকতার জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর।






পাটকাঠি জ্বালানি থেকে বাণিজ্য
পরিবেশ সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমাতে হবে
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষায় ওজোন স্তরের ভূমিকা অনস্বীকার্য
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়
বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে 