শিরোনাম:
পাইকগাছা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

SW News24
শুক্রবার ● ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » জমিদার বাড়ির দালান আর বনেদি পরিবারের আঙিনা থেকে বেরিয়ে দুর্গাপূজা আজ সর্বজনীন রূপ নিয়েছে
প্রথম পাতা » মুক্তমত » জমিদার বাড়ির দালান আর বনেদি পরিবারের আঙিনা থেকে বেরিয়ে দুর্গাপূজা আজ সর্বজনীন রূপ নিয়েছে
৫ বার পঠিত
শুক্রবার ● ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

জমিদার বাড়ির দালান আর বনেদি পরিবারের আঙিনা থেকে বেরিয়ে দুর্গাপূজা আজ সর্বজনীন রূপ নিয়েছে

---বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার রূপান্তর এক দীর্ঘ এবং চিত্তাকর্ষক ইতিহাস। জমিদার বাড়ির দালান আর বনেদি পরিবারের আঙিনা থেকে বেরিয়ে দুর্গাপূজা আজ রূপ নিয়েছে সর্বজনীন উৎসবে, যা বাঙালি সংস্কৃতির এক মহত্তম বিবর্তন।

প্রাচীনকালে দুর্গাপূজা ছিল মূলত ধনী, বিত্তশালী এবং জমিদারদের পারিবারিক উৎসব। ১৬১০ সালে কলকাতার বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজো এবং পরবর্তীতে শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেবের পুজো এর বড় উদাহরণ। এসব পুজোয় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত, মূলত বাবু সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রতিপত্তি প্রদর্শনের মাধ্যম ছিল এই উৎসব।

জমিদারদের এই একাধিপত্য ভাঙতেই জন্ম নেয় বারোয়ারি পুজো। বারোয়ারি শব্দটির উৎপত্তি বারো ইয়ার বা ১২ জন বন্ধু থেকে।  ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারো জন বন্ধু মিলে চাঁদা তুলে যে বারো-ইয়ারি বা বারোয়ারি পূজার সূচনা করেছিলেন, সময়ের নিয়মে তা-ই আজ বিশ্বমঞ্চে ইউনেসকোর হেরিটেজ স্বীকৃতি পাওয়া সর্বজনীন শারদোৎসবে পরিণত হয়েছে।

শুরুতে দুর্গাপূজা ছিল মূলত রাজা, মহারাজা এবং প্রভাবশালী জমিদারদের আভিজাত্য প্রকাশের মাধ্যম। সাধারণ মানুষের সেখানে প্রবেশাধিকার থাকলেও, পূজা আয়োজনে তাদের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল না। এটি ছিল মূলত ব্যক্তিগত বা পারিবারিক স্তরের উৎসব।

জমিদারদের একক আধিপত্য ভেঙে ১৭৯০ সালে গুপ্তিপাড়ায় বারো জন বন্ধু মিলে প্রথম সমবেতভাবে চাঁদা তুলে পূজা শুরু করেন। এই বারো-ইয়ারি শব্দ থেকেই বারোয়ারি শব্দের উৎপত্তি। এর ফলে দুর্গাপূজা প্রথম সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায় এবং সর্বসাধারণের অংশগ্রহণের পথ উন্মুক্ত হয়।

জমিদার বাড়ির পুজোয় অংশ নিতে না পেরে তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলে এই বিকল্প আয়োজন করেন।বারোয়ারি পূজা সমষ্টিগত হলেও শুরুর দিকে সমাজের সব স্তরের মানুষের সমান অধিকার বা অবারিত প্রবেশ সব জায়গায় ছিল না। এটি পারিবারিক গণ্ডি থেকে পুজোকে বাইরে এনেছিল বটে, কিন্তু তখনও সমাজের সব স্তরের মানুষের সমান অধিকার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা এখানে ছিল না।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে,১৯১০ সালে কলকাতার ভবানীপুরের বলরাম বসু ঘাট রোডে ধর্মোৎসাহিনী সভা প্রথম আনুষ্ঠানিক সর্বজনীন দুর্গাপূজার আয়োজন করে। বিশেষ করে ১৯১৯ সালে কলকাতার বাগবাজারের (তৎকালীন নেবুবাগান) পূজায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য মণ্ডপ উন্মুক্ত করা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের আবহে এই পূজাই সর্বজনীন দুর্গোৎসব নামে পরিচিতি পায়, যা ছিল আক্ষরিক অর্থেই সবার উৎসব। বিংশ শতকের শুরুতে বারোয়ারি রূপটি আরও গণতান্ত্রিক হয়ে সর্বজনীন রূপ ধারণ করে, যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণি নির্বিশেষে সমাজের প্রতিটি মানুষের স্থান নিশ্চিত হয়।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বারোয়ারি এবং সর্বজনীন শব্দ দুটিকে অনেকে এক করে ফেললেও, ইতিহাসের পাতায় বারোয়ারি পুজো ছিল সর্বজনীনতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম শক্তিশালী ধাপ। বিংশ শতকের শুরুতে বারোয়ারি রূপটি আরও গণতান্ত্রিক হয়ে সর্বজনীন রূপ ধারণ করে, যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণি নির্বিশেষে সমাজের প্রতিটি মানুষের স্থান নিশ্চিত হয়।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বাংলায় অভিজাত ও বিত্তশালী জমিদারদের প্রভাব কমতে শুরু করলে বারোয়ারি পুজো পূর্ণাঙ্গভাবে সর্বজনীন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বারোয়ারি পুজোয় মূলত উদ্যোক্তা ও চাঁদাদাতাদের প্রাধান্য থাকত, কিন্তু সর্বজনীন শব্দটির অর্থ হলো—যা সবার জন্য উন্মুক্ত। এখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদ থাকে না।

আজকের সর্বজনীন পূজা আর কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বিশ্ব বাঙালিকে এক সুতোয় বাঁধার এক বিশাল সামাজিক উৎসব এবং এক অপরূপ প্রকাশ্য আর্ট গ্যালারি।





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)