শিরোনাম:
পাইকগাছা, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

SW News24
শুক্রবার ● ৬ নভেম্বর ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » জাতীয় উপকূল দিবস পালনে আর কত দেরি করতে হবে
প্রথম পাতা » মুক্তমত » জাতীয় উপকূল দিবস পালনে আর কত দেরি করতে হবে
৫ বার পঠিত
শুক্রবার ● ৬ নভেম্বর ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

জাতীয় উপকূল দিবস পালনে আর কত দেরি করতে হবে

--- প্রকাশ ঘোষ বিধান

১২ নভেম্বরকে বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে উপকূল দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৭০ সালের এই দিনে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ভোলা সাইক্লোন উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছিল। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এই দুর্যোগকে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করেছে। সেই ভয়াবহ স্মৃতিকে স্মরণ করা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে প্রতি বছর এ দিনটি পালিত হয়ে আসছে।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর এই ভূখণ্ডে আঘাত হানা শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রায় ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। বহু এলাকা সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ঘূর্ণিঝড়ের এই নির্মম ধ্বংসলীলা ঘুরে দেখে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তাঁর বিখ্যাত ২৮ ফুট লম্বা চিত্রকর্মে তা ফুটিয়ে তোলেন, যা মনপুরা ৭০ নামে পরিচিত।

১২ নভেম্বর ১৯৭০ সালের এই দিনে এই ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছিল শক্তিশালী একটি ঘূর্ণিঝড়। যার নাম ছিল ভোলা সাইক্লোন। সেই আঘাতে হাজারো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়-প্রাণহানি ঘটে। অসংখ্য গৃহপালিত ও বন্য পশু মারা যায়। নষ্ট হয় হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি। দুমড়ে-মুচড়ে যায় ঘরবাড়ি, জীবন ও জনপদ। সেদিন মানুষের মৃত্যুর মিছিলে কেঁদেছিল সারা বিশ্ব।

সমগ্র উপকূলে আজও এই দিনটিকে মনে করে। সেই ঘূর্ণিঝড়ে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর আজও কেউ কেউ আছে। যারা তখন শিশু বা তরুণ ছিলেন, তারা এখন বৃদ্ধ। মনের মধ্যে দগদগে ক্ষত নিয়ে এই দিনটিকে এখনো বয়ে বেড়ান উপকূলে মানুষ।

উপকূল দিবস হলো বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৫ কোটি মানুষের জীবনযাত্রা, সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি স্মরণে পালিত একটি প্রস্তাবিত ও অনানুষ্ঠানিক দিবস। ২০১৫ সালে উপকূল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার পর প্রথম এই দিনটিকে উপকূল দিবস হিসেবে ঘোষণা করার জোরালো দাবি ওঠে। পরবর্তী সময়ে সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম মন্টুর নির্দেশনায় এবং বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে এই দিবস পালন করা শুরু হয়।

দিবস পালনের প্রধান উদ্যোক্তা হিসাবে রয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উপকূল বাংলাদেশ, কোস্টাল জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ, আলোকযাত্রা দল। ২০১৫ সাল থেকেই উপকূলবর্তী ১৫ জেলার প্রায় ৫০টি স্থানে দিবসটি পালিত হচ্ছে বেসরকারি উদ্যোগে। ঢাকা সহ উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরের সদর, রায়পুর; ভোলা জেলার সদর, চরফ্যাশন, তজুমদ্দিন, মনপুরা; পটুয়াখালীর সদর, গলাচিপা, বাউফল, কলাপাড়া, কুয়াকাটা, রাঙ্গাবালী, নীলগঞ্জ (কলাপাড়া); চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ; ফেনীর সোনাগাজী, ছাগলনাইয়া; সাতক্ষীরার সদর, তালা, শ্যামনগর, বুড়িগোয়ালিনী (শ্যামনগর); খুলনার পাইকগাছা; বরিশাল সদর; চাঁদপুর সদর; পিরোজপুরের কাউখালী; নোয়াখালীর সুবর্ণচর, হাতিয়া; বরগুনা সদর; বাগেরহাটের সদর, শরণখোলা; কক্সবাজারের টেকনাফ, সেন্টমার্টিন; এবং ঝালকাঠির সদর ও কাঁঠালিয়ায় দিবসটি পালন এখন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে উপকূল দিবস দাবি খুবই প্রাসঙ্গিক। ১২ নভেম্বরকে উপকূল দিবস দাবি প্রতিষ্ঠিত হলে উপকূলের গুরুত্ব আরো বাড়বে। উপকূলের সংকট, সমস্যা, সম্ভাবনা এবং উপকূলের মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার দাবি আদায়ে উপকূলের জন্য একটি বিশেষ দিন অপরিহার্য।

জাতীয়ভাবে উপকূল দিবস পালিত হলে, উপকূলের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, উপকূলকে প্রাকৃতিক বিপদ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবমুক্ত রাখা, উপকূলের দিকে নীতিনির্ধারণী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ, উপকূলের মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও উপকূলের সব সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক বিকাশের ধারা সুগম হবে। উপকূলের ইস্যুগুলো জাতির সামনে সহজে তুলে ধরতে দেশি-বিদেশি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নজর বাড়াবে।

বাংলাদেশের দীর্ঘ ৭১৬ কিলোমিটার উপকূলীয় অঞ্চলে ১৯টি জেলার প্রায় ৫ কোটি মানুষ বসবাস করে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৬ শতাংশ। দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ বাস করে উপকূলীয় অঞ্চলে। তাঁদের জীবন-জীবিকা প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে কৃষি, মাছ, বন, স্থানীয় পরিবহন, লবণ ইত্যাদির ওপর। এ দেশের উপকূলের জনগোষ্ঠী প্রতিবছর নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা ইত্যাদির মুখোমুখি হয়।

জাতীয় অর্থনীতিতে উপকূল জিডিপি প্রায় ২৫ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সমুদ্রের মৎস্য সেক্টর পুরোপুরি উপকূলকেন্দ্রিক। বাংলাদেশের কলকারখানার পাশাপাশি উপকূলের মৎস্য সেক্টর এবং উপকূলের জনশক্তি দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে। কিন্তু দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় গণমাধ্যমে, উপকূলের শ্রমশক্তি, মৎস্য খাত সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না।

প্রতি বছর উপকূল দিবসে উপকূলীয় অঞ্চলের ১৯টি জেলা ও ১৪৭টি উপজেলার প্রায় ৫ কোটি মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা এবং ন্যায্যতার দাবি তুলে ধরা। সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষের কথা রাষ্ট্রীয় ও বিশ্বদরবারে তুলে ধরা হয়। দুর্যোগের কারণে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও মানবিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় প্রান্তিক মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার দাবি তুলে ধরা হয়।

বর্তমানে প্রতি বছর বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগে উপকূলীয় অঞ্চলে দিবসটি পালিত হলেও এটি এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করেনি। স্থানীয় জনগণ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ১২ নভেম্বরকে জাতীয় উপকূল দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ