শিরোনাম:
পাইকগাছা, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩

SW News24
রবিবার ● ১৫ মার্চ ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষের জীবিকা হারাচ্ছে
প্রথম পাতা » মুক্তমত » জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষের জীবিকা হারাচ্ছে
৫৬ বার পঠিত
রবিবার ● ১৫ মার্চ ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষের জীবিকা হারাচ্ছে

---প্রকাশ ঘোষ বিধান

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা এক চরম সংকটের মুখে পড়েছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছে উপকূলবাসী। কাজের সন্ধানে তারা শহরে পাড়ি জমাচ্ছে, যা জলবায়ু উদ্বাস্তু ও দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মানুষের জীবন ও জীবিকা ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলি জমিতে লোনা পানি ঢোকা এবং নদীভাঙনে হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি ও পেশা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘনঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং নদীভাঙনের ফলে জনজীবন ও জীবিকা চরম সংকটে পড়েছে। কৃষিজমি ও মাছের ঘের লবণাক্ত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ এবং অনেকে কাজের সন্ধানে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। নারীদের জীবন বিপন্ন এবং খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট তীব্রতর হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলোর মধ্যে প্রধানতম হলো মানবসৃষ্ট কারণ। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাধার ভরাট, বন ধ্বংস, অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ ইত্যাদি কর্মকাণ্ড দেশের প্রকৃতি, পরিবেশ নষ্ট করেছে। দেশে বনভূমি ও জলাভূমির পরিমাণ ক্রমেই কমেছে। একটি দেশে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকার কথা বলা হলেও বাংলাদেশে দেশে তা নেই। এ ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাড়ছে, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে। শীত-গরমের তীব্রতা বাড়ছে। অসময়ে বন্যা-খরা হচ্ছে। পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে খাবার পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। নদীভাঙন ও লবণাক্ততা বাড়ছে, যা প্রাণ ও প্রকৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে কৃষিজমিতে লোনা পানি প্রবেশ করছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে এবং কৃষকরা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। উপকূলীয় অঞ্চলে এর অভিঘাত অধিকতর দৃশ্যমান। পুরুষ-নারী-শিশু সবাই এর প্রত্যক্ষ শিকার। বিশেষ করে নারীরা অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নারী-পুরুষ-শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ বহুমাত্রিক সামাজিক-পারিবারিক সংকট বাড়ছে। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার জীবন-জীবিকা ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছে।

উপকূলীয় মানুষের জীবনের লড়াই ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। নদীভাঙন ও লবণাক্ততা বাড়ছে, যা প্রাণ ও প্রকৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এলাকার মানুষ কাজ হারিয়ে শহরে যাচ্ছেন কাজের খোঁজে। কেউ একা আবার কেউ এলাকার মানুষ কাজ হারিয়ে শহরে যাচ্ছেন কাজের খোঁজে। কেউ একা আবার কেউ যাচ্ছেন স্বপরিবারে। শুধু গরিব নন, ধনীরাও এর শিকার হচ্ছেন। ফলে জলবায়ু উদ্বাস্তুু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

উপকূলীয় মানুষের জীবিকা হারানোর প্রধান কারণসমূহ হলো; লবণাক্ততা বৃদ্ধি: সমুদ্রের পানি বেড়ে উপকূলীয় এলাকায় লোনা পানি ঢুকে পড়ছে, ফলে কৃষিজমি চাষাবাদের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে এবং মিষ্টি পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস: ঘন ঘন সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং মৎস্য ঘের ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নদীভাঙন: উপকূলীয় নদীগুলোর ভাঙনে প্রতিবছর অনেক পরিবার তাদের বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। মৎস্যসম্পদ হ্রাস: সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ও অম্লতা পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় মৎস্য আহরণ ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা জেলেদের জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে।

জীবিকা হারিয়ে অনেকেই কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে, যার ফলে চট্টগ্রাম ও খুলনার মতো উপকূলীয় নগরগুলোতে বস্তি ও প্রান্তিক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আয় কমে যাওয়ায় উপকূলীয় এলাকায় দরিদ্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং লোনা পানি ব্যবহারের কারণে চর্মরোগ ও পেটের পীড়া বাড়ছে। বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন ভেঙে পড়ছে এবং শিশুদের শৈশব বিপন্ন হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাসস্থান হারাতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলে কোটি কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। জীবিকার সংকটে উপকূলীয় নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকে পরিবারের প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ শ্রমে নিযুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষিনির্ভর এলাকার মানুষ কাজ হারিয়ে শহরমুখী হওয়ায় জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা বাড়ছে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল চাষ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)