শিরোনাম:
পাইকগাছা, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬, ৯ চৈত্র ১৪৩২

SW News24
সোমবার ● ২৩ মার্চ ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » ২৫ মার্চ কালো রাতের ভাবনা ও অনুভূতি
প্রথম পাতা » মুক্তমত » ২৫ মার্চ কালো রাতের ভাবনা ও অনুভূতি
৭ বার পঠিত
সোমবার ● ২৩ মার্চ ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

২৫ মার্চ কালো রাতের ভাবনা ও অনুভূতি

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাতটি ছিল ভয়াবহতম একটি রাত। মানব ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যায় সেই কালো রাতে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী মেতেছিল পশুর মতো হিংস্র উল্লাসে। ঢাকা শহর হয়েছিল ধ্বংসস্তূপ। অপারেশন সার্চলাইট নামে কুখ্যাত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত পরিকল্পিত গণহত্যার মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চে বাঙালির জাতীয়তাবাদী, স্বাধিকার আন্দোলনকে সশস্ত্র হামলার দ্বারা দমন করতে চেয়েছিল নরপশুরা।

২৫শে মার্চের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিক পর্যায়গুলো। বছরের পর বছর তীব্র গণআন্দোলন শেষে  ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বাঙালিরা স্বাভাবিকভাবেই আশা করেছিল যে ক্ষমতার পালাবদল হবে এবং আওয়ামী লীগ ৬ দফা অনুসারে সরকার গঠন করবে। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ এ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খান পিপিপি’র জুলফিকার আলি ভুট্টোর প্ররোচনা ও চাপে জাতীয় সংসদের কার্যাবলী মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করে দেন। বাঙালিদের ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে চান। এই স্থগিতকরণের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ গণসমাবেশের আয়োজন করে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে সমুজ্জ্বল সেই জনসমাবেশ এতই সফল ছিল যে, পাকিস্তান সরকার সেনাছাউনি ও পূর্বপাকিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠানে সীমিত হয়ে পড়ে আর পুরো দেশ চলে যায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতির অধীনে।

মার্চের ১৭ তারিখ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সিওএস জেনারেল হামিদ টেলিফোন করে জেনারেল রাজাকে অপারেশনের পরিকল্পনা করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ১৮ মার্চ সকালে ঢাকা সেনানিবাসের জিওসি কার্যালয়ে বসে জেনারেল রাজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি অপারেশনের পরিকল্পনা তৈরি করেন। ২৫শে মার্চের পাকিস্তানি সামরিক অপারেশনের আসল উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব বড় বড় শহর দখল করে নেয়া এবং রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধীদের এক মাসের ভেতর নিশ্চিহ্ন করে দেয়া।

কিন্তু অকুতোভয় বাঙালিরা পাল্টা প্রতিরোধ সৃষ্টি করে এবং সূচনা ঘটায় স্বাধীনতা যুদ্ধের। ২৫শে মার্চের গণহত্যা বাঙালিদের ক্রুদ্ধ ও প্রতিবাদমুখর করে তোলে। আপামর বাঙালি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায় এবং বাঙালিরা দখলদারি পাকিস্তানি বাহিনীকে বিতাড়িত করার সংগ্রামে লিপ্ত হয়। পরিণতিতে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিনাশর্তে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চকে আমরা কালরাত হিসেবে চিনি। তা বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত ও ট্র্যাজেডির নাম। এই রাতটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং এটি আত্মত্যাগ, ভয়ংকর বীভতসতা এবং একই সাথে অদম্য প্রতিরোধ গড়ে তোলার সংকল্পের এক প্রতীক।

এই রাতের সবচেয়ে বড় অনুভূতি হলো আতঙ্ক। অপারেশন সার্চলাইটের নামে নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত মানুষের ওপর যে নারকীয় তান্ডব চালানো হয়েছিল, তার কথা ভাবলে আজও মানুষের শিউরে উঠতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এবং পিলখানায় যে বীভতস গণহত্যা চালানো হয়েছিল, তা ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ঘটনা।

এই রাতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় অসংখ্য প্রাণের বিয়োগব্যথা। ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। যাঁরা বিনা অপরাধে প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাঁদের জন্য আমাদের হৃদয়ে গভীর শোক কাজ করে। ২০১৭ সাল থেকে এই দিনটিকে বাংলাদেশে জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

২৫শে মার্চের কালো রাত বাঙালির মনে চরম ক্ষোভ তৈরি করেছিল। পাকিস্তানি জান্তার এই বিশ্বাসঘাতকতা ও নিষ্ঠুরতা বাঙালিদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, আপস নয়, চূড়ান্ত স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই। এই ভয়াবহতার পর পরই ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা জাতির মনে এক নতুন আশা ও লড়াইয়ের স্পৃহা জন্ম দেয়। বাঙালির মনে তৈরি হয় পরাধীনতার গ্লানি ও মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে ২৫শে মার্চ কেবল ইতিহাসের পাতায় থাকা কোনো ঘটনা নয়, এটি একটি দায়বদ্ধতা। যাঁদের রক্তের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক, তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার দিন এটি। এই রাতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কথা। প্রতি বছর এই রাতে দেশজুড়ে পালন করা হয় ব্ল্যাকআউট বা এক মিনিটের প্রতীকী অন্ধকার, যা শহীদদের স্মরণে আমাদের শোক ও সংহতিকে প্রকাশ করে।

২৫শে মার্চের ভাবনা মানেই হলো একদিকে হারানো স্বজনদের জন্য অশ্রু, আর অন্যদিকে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক দৃঢ় শপথ।

২৫শে মার্চে গণহত্যা পৃথিবীর ইতিহাসে নিরস্ত্র মানুষের উপর সামরিক আক্রমণের জন্য কুখ্যাত এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার জ্বলন্ত সাক্ষী। ২৫শে মার্চের ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ডের মধ্যেও ফিনিক্স পাখির মতো বাঙালি জাতির উত্থান ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে হানাদারদের পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জনের ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল ও ঐতিহাসিক গৌরবের।





আর্কাইভ