শিরোনাম:
পাইকগাছা, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩

SW News24
সোমবার ● ২৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » বজ্রপাতে ঝুঁকিতে মাঠের কৃষক
প্রথম পাতা » মুক্তমত » বজ্রপাতে ঝুঁকিতে মাঠের কৃষক
৭ বার পঠিত
সোমবার ● ২৭ এপ্রিল ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

বজ্রপাতে ঝুঁকিতে মাঠের কৃষক

বজ্রপাত এখন বাংলাদেশে অন্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। খোলা মাঠে কাজ করার সময় কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারাচ্ছেন। বোরো ধান কাটার মৌসুমে কৃষকরা দীর্ঘ সময় খোলা মাঠে কাটান, যা তাদের বজ্রপাতের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। হাওর বা বড় মাঠগুলোতে উঁচু গাছ বা নিরাপদ কোনো স্থাপনা না থাকায় বজ্রপাতের সময় কৃষকরা দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে পারেন না।

বৈশাখী ঝড়-বৃষ্টির সময় খোলা মাঠে কাজ করার কারণে কৃষকরা বজ্রপাতের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকেন। মার্চ মাস থেকে প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস শুরু হয় জনজীবনে। স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে বৃষ্টি। তবে এখন সেই বৃষ্টি যেন উল্টো আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। তাপদাহের পর ঝড়-বৃষ্টির শুরুর সঙ্গে দেশজুড়ে বাড়ছে বজ্রপাতের তীব্রতা। হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে নিয়মিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

বাংলাদেশে সাধারণত মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বজ্রপাত হয়। তবে এপ্রিল ও মে মাসকে বজ্রপাতের প্রধান মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বছরের মোট বজ্রপাতের একটি বিশাল অংশ এই দুই মাসেই ঘটে, যার মধ্যে মে মাসে সবচেয়ে বেশি (২৯.৬২%) বজ্রপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দেশে বছরে গড়ে ৮০-১২০ দিন বজ্রপাত হয়। এপ্রিল ও মে মাস হলো বজ্রপাতের প্রধান মৌসুম বা প্রাক-বর্ষাকালীন সময়। এই দুই মাসে দেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে, বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে গড়ে ৯ থেকে ১৩ দিন পর্যন্ত বজ্রঝড় হতে পারে। বজ্রপাতের ভয়াবহতার দিক বিবেচনায় এবং আশঙ্কাজনকহারে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় সরকার ২০১৬ সালের ১৭ মে বাংলাদেশের জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় বজ্রপাতকে অন্তর্ভুক্ত করে।

প্রাক-বর্ষার এই সময়ে উত্তরে হিমালয় থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা গরম ও আর্দ্র বাতাসের সংমিশ্রণে বজ্র-মেঘের সৃষ্টি হয়, যা থেকে প্রবল বজ্রপাত ঘটে। বজ্রপাতের সময় প্রায় ২৭ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৩০ কোটি ভোল্ট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বজ্রপাতের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। হাওর অঞ্চল এবং খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক ও জেলেরা এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ আমাদের ভৌগলিক অবস্থান। বাংলাদেশের একদিকে বঙ্গোপসাগর, এরপরই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে গরম আর আর্দ্র বাতাস আসছে। আবার উত্তরে রয়েছে পাহাড়ি এলাকা, কিছু দূরেই হিমালয় রয়েছে, যেখান থেকে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। এই দুই বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। শীত পরবর্তী সময়ে একদিকে যেমন বঙ্গোপসাগর থেকে উষ্ণ বাতাস আসতে শুরু করে, অন্যদিকে হিমালয় থেকে আসে ঠাণ্ডা বাতাস। দক্ষিণের গরম আর উত্তরের ঠাণ্ডা বাতাসে অস্থিতিশীল বাতাস বজ্র মেঘের সৃষ্টি করে। এরকম একটি মেঘের সঙ্গে আরেকটি মেঘের ঘর্ষণে বজ্রের তৈরি হয়।

সাধারণত গ্রীষ্মের দিনগুলোয় এপ্রিল-মে মাসে বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে। তবে সাম্প্রতিককালে জুন-জুলাইয়েও বেড়েছে বজ্রপাতের হার। আবহাওয়াবিদগণ বলছেন, বাংলাদেশে উত্তরাঞ্চল এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বজ্রপাত-প্রবণ এলাকাগুলোর অন্যতম। গ্রীষ্মকালে এ অঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি থাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত এই দুর্যোগ বেশি ঘটছে।

এক জরিপ বলছে, সাধারণত সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যার আগপর্যন্ত অর্থাৎ দিনের বেলায় বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে বেশি। আরেক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রায় ৪৩ শতাংশ বজ্রপাতই হয় দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে। সকালে সূর্যের প্রচন্ড তাপমাত্রা জলীয়বাষ্প সৃষ্টি করে, যেটি বজ্রপাতের প্রধান শক্তি। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে তখন জলীয় বাষ্প বা এ ধরনের শক্তিও তত বেড়ে গিয়ে বজ্রপাত ঘটায়।

একসময় দেশের বেশিরভাগ গ্রাম এলাকায় বড় গাছ, যেমন- তাল, নারিকেল, বটসহ নানা ধরনের উঁচু গাছ দেখা যেত। এসব গাছ বজ্রপাতের আঘাত নিজের শরীরে নিয়ে নিত। ফলে মানুষের আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা কমত।

বজ্রপাত-বিষয়ক গবেষকরা বলছেন, দেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছে এখন মুঠোফোন আছে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় মুঠোফোনের বৈদ্যুতিক টাওয়ার রয়েছে। দেশের কৃষিতেও যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। আকাশে সৃষ্টি হওয়া বজ্র মাটিতে কোনো ধাতব বস্তু পেলে তার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। এটি কৃষিকাজে নিয়োজিত মানুষদের বজ্রপাতে মৃত্যুর বড় কারণ। গাছবিহীন খোলামাঠের গ্রামে বজ্রপাতে মৃত্যু হচ্ছে বেশি। শহরে গাছ না থাকলেও উঁচু উঁচু ভবন আছে। ফলে শহরের মানুষ এই মৃত্যু থেকে রেহাই পাচ্ছে।

বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর লক্ষ্যে দেশবাসীকে আগাম সতর্কবার্তা দিতে দেশের ৮টি স্থানে পরীক্ষামূলক ভাবে বজ্রপাত চিহ্নিতকরণ যন্ত্র বা লাইটনিং ডিটেকটিভ সেন্সর বসিয়েছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। ঢাকায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় ছাড়াও ময়মনসিংহ, সিলেট, পঞ্চগড়, নওগাঁ, খুলনা, পটুয়াখালী এবং চট্টগ্রামে এই সেন্সর বসানো হয়েছে। যদিও এসব সেন্সরের কার্যক্রম এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

প্রান্তিক জনগণকে বাঁচাতে সরকারিভাবে তাল গাছ লাগানোর উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাল গাছ ৩০-৪৫ সে.মি. ব্যাসের গোলাকার গুঁড়িবিশিষ্ট প্রায় ৮০-৯০ ফুট উচ্চতার শাখাবিহীন একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। সরকারিভাবে ২০১৮ সালেই ৩১ লাখ তালের আঁটি লাগানো হয়েছে দেশের ৬১ জেলায়। তবে বজ্রপাতের ঝুঁকিহ্রাসের উপযোগী হতে এই গাছের কমপক্ষে ১৪-১৬ বছর বা তারও বেশি সময় প্রয়োজন।

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে করণীয়; পাকা বাড়িতে আশ্রয়: বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা এড়িয়ে দালানের নিচে অবস্থান করতে হবে। উঁচু গাছ ও খুঁটি থেকে দূরে: বড় গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা টাওয়ারের নিচে দাঁড়ানো যাবে না। ঘরের জানালা বন্ধ রাখা: ঘরের ভেতর থাকলেও জানালার কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। ধাতব বস্তু বর্জন: ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি স্পর্শ করা যাবে না। বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন: টিভি, ফ্রিজ বা কম্পিউটারের প্লাগ খুলে রাখতে হবে। পানির উৎস থেকে দূরে: বজ্রপাতের সময় পুকুর বা জলাশয়ে থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। রবার বা প্লাস্টিকের জুতা: বাইরে থাকলে রবারের জুতা ব্যবহার করা কিছুটা নিরাপত্তা দিতে পারে। যানবাহনে সুরক্ষা: গাড়ির ভেতর থাকলে ধাতব বডি স্পর্শ না করে ভেতরে স্থির থাকতে হবে। খোলা মাঠে থাকলে: কোথাও আশ্রয় না পেলে নিচু হয়ে বসে পড়তে হবে, তবে মাটিতে শুয়ে পড়া যাবে না। এসব নির্দেশনা মেনে চললে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা কমে আসবে আশা করা যায়।





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)