মঙ্গলবার ● ৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানির তীব্র সংকট
শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানির তীব্র সংকট
প্রকাশ ঘোষ বিধান
শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় অঞ্চলে মানুষের খাবার পানির খুব কষ্ট। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানির সংকট বর্তমানে এক চরম আকার ধারণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুপেয় পানির সংকট এখন এক নীরব যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের কারণে ভূগর্ভস্থ ও ভূউপরিস্থ পানিতে লবণাক্ততা ও আর্সেনিক বেড়ে যাওয়ায় এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কৃষি জমিতে লবণ পানি আটকে রেখে চিংড়ি চাষ করায় আশপাশের মিষ্টি পানির উৎসগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে এই সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনিয়ন্ত্রিত চিংড়ি চাষ, চিংড়িঘেরে উঁচু বাঁধ না দেওয়া, নদীপ্রবাহ আটকে দেওয়া, খাল বেদখল, পুকুর ভরাট করার কারণে প্রান্তিক অঞ্চলের সাধারণ মানুষের নিরাপদ পানির সংকটের মধ্যে দিয়ে দিন পার করতে হয়। প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে উপকূলীয়ঞ্চলের মিঠাপানির উৎসগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় খাবার পানি ফুরিয়ে যাচ্ছে। এমতবস্থায় নারীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পাশের গ্রাম বা দূরবর্তী উৎস থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের প্রায় চার কোটি মানুষ তীব্র সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে। ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে পানির স্তর অনেক নিচে চলে গেছে। পানি না উঠায় নলকূপগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ছে। বৃষ্টির পানির অভাব ও প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের কারণে মিঠাপানির উৎসগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। কিছু এলাকায় নিরাপদ পানির উৎসে উচ্চমাত্রায় আর্সেনিকের উপস্থিতি সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আর শুষ্ক মৌসুমে উপকূলের প্রায় ২৫-৩০ লাখ মানুষ নিরাপদ পানির অভাবে ভুগছে। পানির জন্য নারীদের দূর-দূরান্তে হেঁটে পুকুরের লোনা পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের ফলে লোনাপানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় পুকুর, খাল ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি পান করছে। এতে মানুষ উচ্চ রক্তচাপ, পানিবাহিত রোগ এবং ত্বকের সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। কেউ কেউ বেসরকারি কোম্পানি বা ফিল্টার প্ল্যান্ট থেকে চড়া দামে পানি কিনে জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। লবণাক্ততার প্রভাবে নলকূপের পানি মুখে দেওয়া যায় না। ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মাটির নিচের পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে, ফলে সাধারণ টিউবওয়েলে আর পানি উঠছে না। অনেক স্থানে পানির স্তর স্বাভাবিকের তুলনায় দুই-আড়াই ফুট নিচে নেমে গেছে। আর প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখন মানুষের ভরসা পুকুরের পানি।
উপকূলীয়ঞ্চলের মানুষ বারো মাসই সুপেয় পানির সংকটে থাকে। অধিকাংশ এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে নলকূপ ও গভীর নলকূপ অকার্যকর হয়ে গেছে। নদী-খালের মতো নলকূপের পানিতে লবণাক্ততা। এ কারণে লোকজন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে রাখেন খাবার জন্য। সেই পানি ফুরিয়ে গেছে। সুপেয় পানির হাহাকার চলছে, বৃষ্টির পানির জন্য অপেক্ষা।
উপকূলের অসংখ্য মানুষ প্রতিদিনই সুপেয় পানির জন্য যেন যুদ্ধ করছে। সংসারের সব কাজ শেষ করে নারীকে ছুটতে হচ্ছে পানি সংগ্রহে। শুকনা মৌসুমে এক কলস পানির জন্য ছুটতে হচ্ছে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ। বেশির ভাগ পরিবারে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব থাকে নারীর কাঁধে। সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছেন নারীরা। এই গরমের মধ্যে তাঁরা কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েও চাহিদামতো পানি সংগ্রহ করতে পারছেন না। তাদের কেউ পুকুর ও বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট থেকে সংগ্রহ করা পানি পান করছে। যারা এসব উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের লবণাক্ত পানি পান করতে হচ্ছে। প্রতিদিন ঘরের কাজের জন্য মা-বোনদের মাইলের পর মাইল হেঁটে কলসি ভরে পানি আনতে হয়। এর ফলে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যা ও জরায়ুর রোগ বাড়ছে। তাছাড়া নোনা পানি ব্যবহারের ফলে চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, এবং নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য ও গর্ভাবস্থায় জটিলতা, কিডনি ও লিভারের রোগ বাড়ছে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট বর্তমানে একটি ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। যাকে অনেকেই পানির জন্য যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই এলাকার লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন খাবার পানির জন্য সংগ্রাম করছেন।
লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট






পথশিশুদের ঈদ আনন্দ আর বেঁচে থাকার লড়াই
জাদুঘর অদ্ভুত বস্তুসমূহের সংগ্রহশালা
প্রকৃতির ভারসাম্য এবং উদ্ভিদকুল টিকিয়ে রাখতে মৌমাছির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
দুর্যোগের মৌসুম উপকূলের মানুষের বেঁচে থাকার অবিরাম লড়াই
সবচেয়ে প্রিয় শব্দ মা
বিশ্ব গাধা দিবস
পরিযায়ী পাখির ভূমিকা ও গুরুত্ব 