বুধবার ● ১৩ মে ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় মৌমাছির গুরুত্ব
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় মৌমাছির গুরুত্ব
মৌমাছি চমৎকার একটি পতঙ্গ এবং পৃথিবী রক্ষায় অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। মৌমাছি ফুলের পরাগায়ন ঘটায়ে বৃক্ষ ও অন্যান্য উদ্ভিদের জীবনধারণ এবং অন্যন্য প্রাণীদের খাদ্যশস্যে আহরণে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় মৌমাছির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মৌমাছির মতো পতঙ্গ উদ্ভিদের পরাগায়ন বা প্রজননে ভূমিকা রাখে। মৌমাছি ফুল থেকে তাদের পরাগগুলো অন্য ফুলে ছড়িয়ে দেয়। মৌমাছি যখন এক ফুল থেকে আরেক ফুলে মধু আহরণ করে তখন মৌমাছির গায়ে লেগে যাওয়া প্রথম ফুলের পুরুষ পীঠের পরাগ রেণু অন্য ফুলের স্ত্রী গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরিত হয়। তখনই ফুলের পরাগায়ন ঘটে এবং প্রায় সব ধরণের ফসল বংশবিস্তার করতে পারে।
বৈশ্বিক কৃষির পরাগায়নের পেছনে ভূমিকা রাখছে মৌমাছি। এরা ৯০ শতাংশ বন্য উদ্ভিদ এবং ৭০ শতাংশ কৃষি ফসলের পরাগায়নে প্রধান ভূমিকা রাখে, যা ফলন ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে। পরিবেশের সবচেয়ে পরিশ্রমী এই পতঙ্গটির অনুপস্থিতিতে পুরো মানবজাতি ও প্রাণীকুল এক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। মৌমাছির অবদানে টিকে থাকা সবুজ উদ্ভিদ পৃথিবীর কার্বন শোষণ করে আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ সচল রাখে। কখনও যদি মৌমাছি বিলুপ্ত হয়ে পড়ে তাহলে মানুষসহ পুরো প্রাণীকুল নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।
বিশ্বে মৌমাছির প্রায় আড়াইশ প্রজাতি রয়েছে। কিন্তু এরমধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ প্রজাতির মৌমাছি মধু সংগ্রহ আর পরাগায়নের কাজ করে। সাত ধরণের প্রজাতি মহা বিপন্নের তালিকায় রয়েছে। গত এক দশকে মৌমাছির সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ কমে গিয়েছে। যার মূল কারণ, জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ন, ফুল কমে যাওয়া এবং মৌচাক গড়ার মতো ঝোপঝাড় বা গাছ কমে যাওয়া। অনেক মৌচাক ভাইরাসসহ নানা রোগে দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে আবার ফসলকে পোকামাকড় থেকে রক্ষায় যে কীটনাশক ব্যবহার করা হয় এতেও মৌমাছি প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গিয়েছে।
মৌমাছি একটি সামাজিক পতঙ্গ। এরা দলবদ্ধভাবে চাক বানিয়ে বাস করে। মৌমাছিদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাধর হল রানি মৌমাছি। মৌচাকের ডিম পাড়ার দায়িত্ব পালন করে রানি মৌমাছি। এর বাইরে আর কোন কাজ করে না। রানি মৌমাছি আকারে সবার থেকে বড় এবং তার সম্পূর্ণরূপে বিকশিত ডিম্বাশয় থাকে। একটি রানি মৌমাছি দিনে দুই হাজারের বেশি ডিম পাড়তে পারে। এজন্য প্রতিদিন একাধিকবার পুরুষ মৌমাছিদের সাথে মিলিত হয়। অনেক সময় পুরুষ মৌমাছি মিলিত হওয়ার পর পর মারা যায়।
রানি মৌমাছির ডিম থেকে স্ত্রী মৌমাছি জন্মায় যারা ভবিষ্যতের দায়িত্ব বণ্টনে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে কর্মী বা স্ত্রী মৌমাছিরা কিছু বিরল ক্ষেত্রে ডিম পাড়লেও সেটা অনুর্বর হয় যা থেকে পুরুষ মৌমাছি বা ড্রোন জন্মায়। যারা মৌচাক টিকিয়ে রাখতে তেমন কাজে লাগে না। রানি মৌমাছির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি ফেরোমোন বা রাসায়নিক গন্ধ ছড়ায় যা মৌচাকে তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সাহায্য করে। এমনিতে রানি মৌমাছির মগজ কর্মী মৌমাছিদের চাইতে ছোট।
মৌমাছির মস্তিষ্কের আকার তিলের সমান হলেও তারা মানুষের মতো একে অপরের মুখ দেখেই চিনতে পারে, মনে রাখতে পারে। এই পতঙ্গ সেকেন্ডে দুইশ বার পাখা ঝাপটায় এবং ২০ মাইল গতিতে ছুটে অসংখ্য ফুলের নেকটার সংগ্রহ করে। মৌমাছি কোন ভাল নেকটার পেলে নেচে নেচে অন্য মৌমাছিদের সংকেত দেয়। মৌমাছির মোট পাঁচটি চোখ রয়েছে। দুই পাশে দুটি এবং মাখায় তিনটি। কিন্তু তারা লাল রং দেখতে পারে না। তীব্র ঘ্রাণশক্তির কারণে মৌমাছি পুদিনা পাতা সহ্য করতে পারে না।
তার সামনের শুঁড় দিয়ে গন্ধ শোকে আর অন্য মৌমাছিদের সাথে যোগাযোগ করে। মৌমাছির দুটো পাকস্থলী রয়েছে। একটি খাবার হজমের জন্য এবং আরেকটি ফুলের রস সংরক্ষণের জন্য যা তারা মৌচাকে বয়ে আনে।
মৌমাছি ফল, সবজি ও তৈলবীজ ফসলের পরাগায়ন করে, যা মানুষের খাদ্য সরবরাহের জন্য অত্যাবশ্যক। বনের গাছপালা ও বন্যফুলের বংশবৃদ্ধিতে মৌমাছি সহায়তা করে, যা প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল সচল রাখে। মধু, মোম, এবং রয়্যাল জেলি উৎপাদনের মাধ্যমে মৌমাছি পালন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। প্রাকৃতিক কৃষি পদ্ধতিতে মৌমাছির উপস্থিতি মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং ক্ষতিকারক কীটনাশক কম ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করে।
মৌমাছি প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অসময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফুল ফোটার সময় ও মৌমাছির জীবনচক্রে অমিল দেখা দিচ্ছে। কৃষিজমিতে অনিয়ন্ত্রিত ও মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক প্রয়োগের ফলে মৌমাছি মারা যাচ্ছে। কৃষিকাজে ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে সম্পূর্ণ বিষমুক্ত ও প্রাকৃতিক কৃষি পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বনভূমি ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃষিজমিতে মাত্রাতিরিক্ত বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মৌমাছির প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়ায় বাস্তুতন্ত্রের জন্য এটি চরম হুমকি। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মৌমাছি সংরক্ষণ অপরিহার্য।






দুর্যোগের মৌসুম উপকূলের মানুষের বেঁচে থাকার অবিরাম লড়াই
সবচেয়ে প্রিয় শব্দ মা
বিশ্ব গাধা দিবস
পরিযায়ী পাখির ভূমিকা ও গুরুত্ব
সাংবাদিকরাও শ্রমিক
মুক্ত সাংবাদিকতায় বর্তমানে যুক্ত হচ্ছে বহুমুখী চ্যালেজ্ঞ
বজ্রপাত ঝুঁকিতে মাঠের কৃষক
নাচ জীবনের প্রতিবিম্ব 