শিরোনাম:
পাইকগাছা, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩

SW News24
সোমবার ● ১৮ মে ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে করণীয়
প্রথম পাতা » মুক্তমত » বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে করণীয়
৭৭ বার পঠিত
সোমবার ● ১৮ মে ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে করণীয়

---প্রকাশ ঘোষ বিধান

তীব্র গরমে বেওয়ারিশ কুকুরের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং তাদের কামড়ানোর প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়। মানুষের মতো কুকুর শরীর থেকে ঘাম ঝরাতে পারে না, তাই হাঁপানোর মাধ্যমে তারা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু অতিরিক্ত তাপমাত্রায় এই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে তাদের মধ্যে তীব্র অস্বস্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়, যা তাদের আক্রমণাত্মক করে তোলে।

তীব্র গরমের সময় প্রখর রোদ ও হিটস্ট্রোকে হাঁপানির ফলে বেওয়ারিশ কুকুরগুলো চরম উগ্র বা মেজাজি হয়ে ওঠে, যা এদের আক্রমণের মূল কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র গরমের দিনে কুকুরের কামড়ের ঘটনা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। গরমে বেওয়ারিশ কুকুরের হিংস্রতা ও উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়া জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। এই সময়ে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করার সময় অতিরিক্ত সতর্কতা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে কুকুরের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হয় এবং তারা অতি সহজেই উত্তেজিত ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। বেওয়ারিশ কুকুরের মেজাজ খিটখিটে ও হিংস্র হয়ে ওঠার প্রধান কারণ হলো তাদের শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও পানিশূন্যতা। মানুষের মতো কুকুরের সারা শরীরে ঘর্মগ্রন্থি থাকে না, ফলে তারা সহজে শরীর ঠান্ডা করতে পারে না। অতিরিক্ত তাপে তাদের আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন আসে, যা জনমনে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করে।

প্রচণ্ড গরমে বেওয়ারিশ কুকুরদের স্বভাব ও আচরণে পরিবর্তন আসে। প্রচণ্ড গরমে কুকুরের মস্তিষ্কে চাপ বাড়ে এবং তারা খিটখিটে হয়ে ওঠে। গরমে হিটস্ট্রেস বা তৃষ্ণার কারণে তারা অনেক সময় আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, যা থেকে জলাতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে। তীব্র গরমে খাবার ও পানির অভাবে কুকুর মেজাজ হারিয়ে ফেলে। অতিরিক্ত গরমে হাঁপাতে হাঁপাতে তারা অনেক সময় সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং সামান্য উসকানি পেলেই আক্রমণ করে। এ কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুকুরের উপদ্রব ও আক্রমণের হার বাড়ে।

বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব ও জলাতঙ্ক আতঙ্ক বর্তমানে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে। দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়ানো কুকুর পথচারী ও শিশুদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে সবচেয়ে মারাত্মক ঝুঁকি হলো জলাতঙ্ক রোগ। কুকুরে কামড়ানোর পর জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশ পেতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।  লক্ষণ এর মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, পানিভীতি, এবং আলো বা বাতাসের প্রতি সংবেদনশীলতা। লক্ষণ প্রকাশের পর জলাতঙ্ক একটি শতভাগ প্রাণঘাতী রোগ, মৃত্যু অবধারিত।

২০১২ সালে উচ্চ আদালত নির্বিচার কুকুর নিধনকে অমানবিক উল্লেখ করে তা বন্ধের নির্দেশ দেয়। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কুকুরকে বন্ধ্যা করে তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার ঘোষণা দেয় সরকার। ২০১৯ সালের প্রাণিকল্যাণ আইন বলছে, মালিকানাবিহীন বা বেওয়ারিশ হলেও কোনো প্রাণীনিধন বা স্থানান্তর করা দণ্ডনীয় অপরাধ। তাছাড়া ২০১৪ সালে একটি সংগঠনের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুকুরনিধনে আদালতেরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। একদিকে কুকুর নিধনে নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলো যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব বেড়েছে। এতে কেউ কেউ প্রাণও হারাচ্ছেন।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় কুকুরের আক্রমণে স্কুল থেকে ফেরার পথে কিংবা খেলতে গিয়ে শিশুরা আহত হচ্ছে। রাতে রাস্তা বা  গলির ভেতর কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাকে ভয় পাননি এমন মানুষের সংখ্যা কম। এ ছাড়া মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, রিকশা দেখলে কুকুরের দল ছুটে আসে। তাদের তীব্র গতিতে ছুটে আসা দেখে ভয় পেয়ে চিৎকার করতে দেখা যায় নারী ও শিশুদের। রাস্তার অলিগলিতে রাতভর কুকুরের ডাকে ঘুম হারাম হয় নগরবাসীর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবশেষ ২০২৩ সালে সারা দেশে ৬ লাখের বেশি মানুষ কুকুরের কামড় খেয়ে জলাতঙ্ক রোগের টিকা নিয়েছে। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫ লাখের সামান্য কম। এর মধ্যে শিশুদের সংখ্যা বেশি। এই দুই বছরে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৮৬ জন। শুধু তাই নয়, ২০১২-২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে কুকুরের কামড়ে মারা গেছে ৭৭১ জন। তবে ২০১০ সালের আগে দেশে প্রতিবছর জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে আড়াই হাজার মানুষ মারা যেত। জলাতঙ্ক রোগ নির্মূলে সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগের ফলে মৃত্যুর সংখ্যা কমে এসেছে। তবে আক্রান্তের সংখ্যা কমেনি। ২০২০ সালে জলাতঙ্কের টিকা নিয়েছিলেন ১ লাখ ৫২ হাজার ১৪ জন, ২০২১ সালে ২ লাখ ৭৮ হাজার।

বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক নিয়ে সম্প্রতি সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, আবহাওয়ার উচ্চ তাপমাত্রা এবং অতি বেগুনি রশ্মির বেশি বিকিরণে কুকুরের কামড়ের আশঙ্কা বেড়ে যায়। গবেষকরা ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আটটি শহরের কুকুরের কামড়ের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এ সময়ের মধ্যে শহরগুলোতে ৭০ হাজার কুকুরের কামড়ের তথ্য পাওয়া গেছে।

রাস্তায় প্রায়ই অসুস্থ কুকুরকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এসব কুকুর শহরে ঘুরে বেড়ায়। ফলে তাদের থেকে সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ঢাকার রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে অসংখ্য মানুষ রাত কাটায়। এই মানুষগুলো সহজে অসুস্থ কুকুরের সংস্পর্শে গিয়ে অসুখ ছড়াতে পারে। একইভাবে রাস্তার পাশে খোলা দোকানেও এসব কুকুর থেকে সংক্রামক ব্যাধি ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে।

গবেষকরা তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, তীব্র গরমের দিনে কুকুরের কামড়ের ঘটনা ৪ শতাংশ, অতি বেগুনি রশ্মির বিকিরণে ১১ শতাংশ এবং ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ায় ৩ শতাংশ পর্যন্ত কুকুরের কামড় বাড়ার প্রমাণ পেয়েছে। তাপমাত্রায় পরিবর্তন হওয়ায় প্রাণীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ায়। তাপমাত্রা প্রাণীদের প্রতি মানুষের আচরণকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাপমাত্রার কারণে যে বিতৃষ্ণা তৈরি হয়, তা আগ্রাসনে রূপ নিতে পারে। এছাড়া আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ন্ত্রিত হয় সেরোটোনিন ও ডোপামিন দ্বারা। অতি বেগুনি রশ্মির বিকিরণ ডোপামিনের মাত্রা কমিয়ে দিলে উদ্বেগের লক্ষণ তৈরি করতে পারে, যা আগ্রাসনে রূপ নিতে পারে।

পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী এই বেওয়ারিশ কুকুরগুলো। প্রতিদিন হোটেল রেস্টুরেন্টে যে বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয় বা নষ্ট হয়, সেগুলো বেওয়ারিশ কুকুর খেয়ে নেয়, না তাহলে এসব খাবার ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হতো এবং সেখানেই পচে দুর্গন্ধ ছড়াত। সুতরাং, উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে কুকুর যে আমাদের পরিবেশকেও বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করছে।

গরমের কারণে কুকুর এমনিতেই ক্লান্ত ও মেজাজী থাকে। কুকুরের আতঙ্ক থেকে বাঁচতে, রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় কুকুরকে ঢিল মারা গায়ে পানি ছিটানো বা বিরক্ত করা থেকে নিজেকে ও অন্যদের বিরত রাখুন। কুকুর ঘেউ ঘেউ করলে আতঙ্কিত না হয়ে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে পড়ুন। চিৎকার করা বা লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। কুকুর দেখলে আতঙ্কিত হয়ে হঠাৎ দৌড় দেবেন না। এতে কুকুরের শিকার করার প্রবৃত্তি জেগে ওঠে। স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকুন বা ধীরলয়ে হেঁটে পার হয়ে যান। কুকুরের চোখের দিকে সরাসরি তাকাবেন না। কুকুর এটিকে চ্যালেঞ্জ মনে করতে পারে। আত্মরক্ষার জন্য সবসময় ছাতা বা লাঠি সাথে রাখুন। কুকুর তেড়ে এলে তা মাটিতে ঠুকে আওয়াজ করতে পারেন। ঘুমানো বা বিশ্রামরত কুকুরকে কোনোভাবেই উত্যক্ত করবেন না। বিশেষ করে রাস্তার মোড়ে বা ডাস্টবিনের আশেপাশে দলবদ্ধ কুকুর থাকলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলুন।

কুকুর কামড়ালে বা আঁচড় দিলে তাৎক্ষণিক সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে আক্রান্ত স্থান অন্তত ১৫ মিনিট ধরে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। ক্ষত পরিষ্কার করার পর আয়োডিন বা পভিডন জাতীয় অ্যান্টিসেপটিক লাগান। অবহেলা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী জলাতঙ্কের টিকা এবং প্রয়োজনে ইমিউনোগ্লোবুলিন নিন।

তীব্র গরমে বেওয়ারিশ কুকুর আতঙ্ক থেকে বাঁচতে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কুকুরের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ না করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। আইনগত জটিলতা ও প্রাণী কল্যাণ নীতির কারণে সরাসরি কুকুর নিধন বন্ধ থাকায়, এখন একমাত্র উপায় হলো এদের জন্মনিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া।

তীব্র গরমে কুকুরের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে বাড়ির সামনে, গলির মোড়ে বা ছায়াযুক্ত স্থানে মাটির পাত্রে পরিষ্কার পানি রাখুন। তৃষ্ণা মেটাতে পারলে কুকুরের আগ্রাসী ভাব অনেকটাই কমে আসে। কুকুরগুলো যাতে রোদের তীব্রতা থেকে বাঁচতে গাছের নিচে বা দেওয়ালের ছায়ায় আশ্রয় নিতে পারে, সে পরিবেশ তৈরি করে দিন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)