শিরোনাম:
পাইকগাছা, বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩

SW News24
বুধবার ● ২৬ আগস্ট ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » মানবতার সেবায় মাদার তেরেসা
প্রথম পাতা » মুক্তমত » মানবতার সেবায় মাদার তেরেসা
১৫ বার পঠিত
বুধবার ● ২৬ আগস্ট ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

মানবতার সেবায় মাদার তেরেসা

--- প্রকাশ ঘোষ বিধান

মাদার তেরেসা ছিলেন মানবতার এক মহান ফেরিওয়ালা, যিনি নিজের পুরো জীবন গরিব, অসুস্থ, অনাথ ও অসহায় মানুষের সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন।

১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট টেরিজার জন্মস্থান অটোমান সাম্রাজ্যের আলবেনিয়া রাজ্যের স্কপিয়ে, বর্তমান উত্তর মেসিডোনিয়া।   তাঁর মূল নাম অ্যাগনিস গঞ্জা বোজাঝিউ। তিনি মাদার টেরিজা বা তেরেসা নামে অধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন একজন আলবেনীয়-বংশোদ্ভুত ভারতীয় ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী এবং ধর্মপ্রচারক। আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত তিনি সেখানেই কাটান। ১৯২৮ সালে তিনি আয়ারল্যান্ড হয়ে তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতে খ্রিস্টধর্ম প্রচার অভিযানে আসেন। জীবনের বাকি অংশ তিনি ভারতেই থেকে যান।

মাদার তেরেসা ছিলেন ভালোবাসার এক মূর্ত প্রতীক, যিনি নিজের পুরো জীবনটাই বিলিয়ে দিয়েছিলেন অসহায় এবং নিরন্ন মানুষের সেবায়। তাঁকে মানবতার ফেরিওয়ালা বলা সম্পূর্ণ যথার্থ, কারণ তিনি জাত-পাত, ধর্ম বা বর্ণের বৈষম্য না করে পৃথিবীর সবচেয়ে অবহেলিত ও মুমূর্ষু মানুষের দ্বারে দ্বারে পরম মমতা নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন।

অবহেলিত ও রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষদের আশ্রয় দিতে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন মিশনারিজ অব চ্যারিটি। ১৯৫০ সালে কলকাতায় তিনি এই দাতব্য সংস্থা গড়ে তোলেন। বর্তমানে এটি বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে অসহায় মানুষের সেবা দিচ্ছে।
১৯৫২ সালে কলকাতার কালিমন্দিরের পাশে রাস্তা থেকে তুলে আনা মৃত্যুপথযাত্রী ও অসহায় মানুষদের মর্যাদাপূর্ণ আশ্রয়  নির্মল হৃদয় প্রতিষ্ঠা করেন। মুমূর্ষু ও গৃহহীন মানুষদের শেষ দিনগুলো যেন শান্তিতে কাটে, সেজন্য তিনি এই আশ্রম গড়ে তোলেন।

সমাজে অবহেলিত ও অস্পৃশ্য কুষ্ঠরোগীদের চিকিৎসার জন্য তিনি বিশেষ ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করেন। কুষ্ঠরোগীদের পুনর্বাসনে তিনি বিশেষ হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। সমাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া কুষ্ঠ রোগীদের জন্য তিনি শান্তিনগর নামের একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরি করেন। অনাথ, পরিত্যক্ত ও বাস্তুহারা শিশুদের জন্য তিনি আশ্রয় ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। এতিম শিশুদের জন্য শিশু ভবন স্থাপন করেন। তাঁর এই কাজের পরিধি শুধু ভারত ছাড়িয়ে বিশ্বের শতাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত সীমান্ত এলাকায় অবস্থানরত বাঙালি শরণার্থীদের সেবা ও চিকিৎসায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

মানবতার সেবায় তাঁর অসামান্য আত্মোৎসর্গের জন্য তিনি সারাজীবনে বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হন। আর্তমানবতার সেবায় অনন্য অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। দুঃস্থ মানবতার সেবায় অনন্য অবদানের জন্য তিনি এই বিশ্বসেরা পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬২ সালে ভারত সরকার মাদার তেরেসাকে পদ্মশ্রী উপাধিতে তাকে ভূষিত করেন। এ ছাড়া ১৯৭১ সালে পোপ জন শান্তি পুরস্কার, ১৯৭২ সালে জওহরলাল নেহরু পুরস্কার পান। ১৯৮০ সালে ভারত সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক ভারতরত্ন সম্মাননায় ভূষিত করে।

তিনি ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মোট ৮৪টি পুরস্কার ও সাম্মানিক উপাধিতে ভূষিত হন।  মাদার তেরেসাকে অমর করে রাখার সবচেয়ে বড় প্রয়াস হলো জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার। সেরেস মেডেল হলো জাতিসংঘের এর খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত একটি বিশিষ্ট পদক। রোমান কৃষিদেন্ত ও শস্যের দেবী সেরেস এর নামানুসারে এই মেডেলের নামকরণ করা হয়েছে। বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে যারা দুই মুঠো অন্ন পৌঁছে দেন তাদের পক্ষে এই স্বীকৃতি হলো সেরেস মেডেল। এই মেডেলের এক পিঠে রয়েছে ভিক্ষাপাত্র হাতে অপুষ্টিতে ভোগা একটি শিশুর মূর্তি আর অপর পিঠে রয়েছে মাদার তেরেসার ছবি।

১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ২০১৬ সালে পোপ ফ্রান্সিস ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেন্ট বা সন্ত হিসেবে ঘোষণা করেন।

মাদার তেরেসা ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহীয়সী নারী এবং বিশ্বজুড়ে দুঃস্থ ও অসহায় মানুষের সেবায় নিবেদিত এক অনন্য প্রতীক। জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি কলকাতার নোংরা বস্তি থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং আমৃত্যু মানবতার সেবা করে গেছেন।

মাদার তেরেসার জীবন ও আদর্শ আমাদের শেখায় যে, সমাজে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্ম।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ