শিরোনাম:
পাইকগাছা, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

SW News24
শুক্রবার ● ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » পাটকাঠি জ্বালানি থেকে বাণিজ্য
প্রথম পাতা » মুক্তমত » পাটকাঠি জ্বালানি থেকে বাণিজ্য
১৭ বার পঠিত
শুক্রবার ● ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

পাটকাঠি জ্বালানি থেকে বাণিজ্য

---প্রকাশ ঘোষ বিধান

জ্বালানি হিসেবে পাটকাঠির চাহিদা ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও শিল্প খাতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এক সময় কেবল রান্নার সাধারণ খড়ি বা ঘরের বেড়া তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হলেও, বর্তমানে বহুমুখী বাণিজ্যিক ব্যবহারের কারণে এটি কৃষকদের জন্য বাড়তি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।

পাটকাঠির চাহিদা বৃদ্ধির মূল কারণ ও এর বহুমুখী ব্যবহার হচ্ছে চারকোল বা কার্বন ফ্যাক্টরিতে। পাটকাঠি পুড়িয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয় চারকোল বা হাই-কোয়ালিটি ছাই। এই ছাই কার্বন পেপার, কম্পিউটার প্রিন্টারের কালি, এবং মোবাইল ব্যাটারির কাঁচামাল হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে চীনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন মাঝারি ও ভারী শিল্পকারখানায় বয়লারের বিকল্প পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে পাটকাঠির ব্যবহার বাড়ছে। এছাড়া পার্টিকেল বোর্ড ও হার্ডবোর্ড তৈরির কারখানায় এটি অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পানের বরজে মাচা তৈরি, পানের লতা পিলিং এবং ঘর-বাড়ির বেড়া বা ছাউনি নির্মাণে এখনও এর ব্যাপক দেশীয় চাহিদা রয়েছে।

বাজারে অনেক সময় পাটের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে কৃষকরা হতাশ হলেও, পাটকাঠি বিক্রি করে সেই লোকসান পুষিয়ে নিচ্ছেন। অনেক অঞ্চলের কৃষকদের মতে, পাট বিক্রির টাকা দিয়ে উৎপাদন খরচ উঠলে, পাটকাঠি বিক্রির সম্পূর্ণ টাকাই লাভ হিসেবে ঘরে আসে। বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়ায় ফরিদপুর, মাগুরা, তাড়াইলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখন বড় বড় পাটকাঠি কেনাবেচার আড়ত ও হাট গড়ে উঠেছে।

গ্রাম ও শহরের রান্নার কাজে এবং বহুমুখী শিল্পে ব্যবহারের কারণে বর্তমানে জ্বালানি ও বাণিজ্যিকভাবে পাটকাটির চাহিদা ও দাম দুটোই অনেক বেড়ে গেছে। গ্রামের পাশাপাশি এখন শহরাঞ্চলেও রান্নার কাজে জ্বালানি হিসেবে পাটকাঠির কদর ও চাহিদা ব্যাপক। গ্যাসের দাম বৃদ্ধি ও সহজলভ্যতার কারণে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এর ব্যবহার বাড়ছে।

পাটের পাশাপাশি পাটকাঠি বিক্রি করে এখন কৃষকরা বাড়তি আয় করছেন, যা তাদের আর্থিক স্বস্তি দিচ্ছে। একসময় যাকে অবহেলা করা হতো, আজ তা লাভজনক ব্যবসায় রূপ নিয়েছে। সোনালি আঁশের দেশে সম্ভাবনাময় নতুন এ রফতানি পণ্যটির বিকাশে একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়। নীতিমালায় পাটকাঠির ছাই শিল্পকে একটি উদীয়মান শিল্প হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

একসময় কেবল গ্রামীণ রান্নার সাধারণ জ্বালানি বা ঘরের বেড়া তৈরির কাজে ব্যবহৃত পাটকাঠি এখন বাংলাদেশের অন্যতম একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও বহুমুখী ব্যবহারের কারণে অবহেলিত এই কৃষিপণ্যটি আজ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক দুয়ার খুলে দিয়েছে।

অতীতে পাটের আঁশ ছাড়ানোর পর পাটকাঠিকে ফেলে দেওয়া হতো কিংবা বড়জোর গৃহস্থালির টুকটাক কাজে লাগানো হতো। তবে বর্তমানে এটি একটি লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। পাটকাঠিকে বিশেষ চুল্লিতে উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে ছাই বা চারকোল তৈরি করা হচ্ছে। ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই চারকোল তৈরির অর্ধশতাধিক ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। সাধারণত বাজারে পাট বিক্রি করে কৃষকদের উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয়। কিন্তু বর্তমানে পাটকাঠি বিক্রি করে পাওয়া পুরো টাকাটাই কৃষকদের বাড়তি লাভ হিসেবে ঘরে উঠছে। দেশের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের পার্টিকেল বোর্ড বা পারটেক্স বোর্ড তৈরির প্রধান কাঁচামাল হিসেবে এখন পাইকারি দরে পাটকাঠি কিনছে।

পাটকাঠি পুড়িয়ে উৎপন্ন এই চারকোল বা ব্ল্যাক গোল্ড এখন সম্পূর্ণ রপ্তানিমুখী পণ্য। উন্নত দেশগুলো এই চারকোল থেকে অ্যাক্টিভেটেড কার্বন তৈরি করে, যা জল বিশুদ্ধকরণ ফিল্টার, ফেসওয়াশ ও প্রসাধনী, কার্বন পেপার, ফটোকপিয়ারের কালি এবং নানা ধরনের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশ থেকে এই চারকোল মূলত চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

পাটকাঠি সাধারণত বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে ওঠে। ফলে ফ্যাক্টরিগুলো অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সচল থাকলেও বছরের বাকি সময় কাঁচামালের অভাবে বন্ধ রাখতে হয়। সঠিক ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে বর্ষার পর অনেক পাটকাঠি নষ্ট হয়ে যায়। দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন পাটকাঠি উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ৫০ শতাংশের সঠিকভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে পাটকাঠির ছাইয়ের বার্ষিক উৎপাদন দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টন। সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং কাঁচামাল সংরক্ষণের সুব্যবস্থা থাকলে এই খাত থেকে বছরে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

পরিবেশবান্ধব পণ্যের বিশ্বব্যাপী চাহিদা বাড়ায় সোনালী আঁশের পাশাপাশি এই রুপালী কাঠিও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে অবহেলিত এই পাটকাঠি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্যে রূপান্তরিত হতে পারে।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ