শিরোনাম:
পাইকগাছা, রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

SW News24
শুক্রবার ● ১৯ মে ২০২৩
প্রথম পাতা » মুক্তমত » জীববৈচিত্র্য আমাদের অস্তিত্বের সুরক্ষা
প্রথম পাতা » মুক্তমত » জীববৈচিত্র্য আমাদের অস্তিত্বের সুরক্ষা
২৩৫ বার পঠিত
শুক্রবার ● ১৯ মে ২০২৩
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

জীববৈচিত্র্য আমাদের অস্তিত্বের সুরক্ষা

---

প্রকাশ ঘোষ বিধান

আজ ২২ শে মে জীববৈচিত্র্য দিবস।  জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করতে  ১৯৯৩ সালে দিবসটি পালনের জন্য ২৯ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পৃথিবীর অনেক দেশে এই দিবস পালন বন্ধ করে দিলে ২০০২ সালের ২২ মে পালনের জন্য দিবসটি পুনঃনির্ধারণ করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। তখন থেকে প্রতিবছর ২২ শে মে এ দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হচ্ছে। মূলত ১৯৯২ সালের ২২ মে কেনিয়ার নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত জীববৈচিত্র্য বিষয়ক কনভেনশনে দিনটিকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। মানুষের অপরিণামদশী কর্মকাণ্ডের ফলে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য হারে অবাধে সংকুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাসীর উদ্বেগের প্রেক্ষিতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং তার টেকসই ও সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির উদ্যোগে ১৯৯২ সালে জীববৈচিত্র্য কনভেনশন নামে একটি আন্তর্জাতিক দলিল চূড়ান্ত করা হয়। বাংলাদেশ উক্ত কনভেনশনের অন্যতম অনুমোদনকারী দেশ।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীব বৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ সেল ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের ২২ মে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে বায়োডাইভার্সিটি (সিবিডি) চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এরপর ৫ জুন ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচীর ধরিত্রী সম্মেলনে সিবিডি বিভিন্ন দেশের স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ১৬৮টি দেশ সিবিডি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এবং সিবিডি ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। বর্তমানে এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা ১৯৫ টি।

মানুষের জন্য অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও সেবার উৎস হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন জীবের জীন, প্রজাতি ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা তথা ইকোসিস্টেম সমূহের প্রকারভেদ। পৃথিবীর জৈব-বৈচিত্র্য জেনেটিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক, বিনোদনগত ও সৌন্দৰ্য্যগত বিভিন্ন দিক থেকে অতি মূল্যবান। প্রাণের ক্রম বিবর্তন এবং পৃথিবীতে জীবের বিকাশ লাভের ক্ষেত্রে জৈব-বৈচিত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য, ঔষধ ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার অতি গুরুত্বপূর্ণ অথচ জীববৈচিত্রের প্রতি মানুষেরই বিরূপ কর্মকাণ্ড যেভাবে অবাধে চলছে তাতে আশংকা হচ্ছে যে, ২০২৫ সালের মধ্যে ২০-২৫% প্রাণী ও উদ্ভিদ পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। তাই জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণে ও টেকসই ব্যবহারে তৎপর হওয়ার আহবানেই হচ্ছে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসের আহবান।

মানুষ, প্রাণী ও প্রকৃতি মিলিয়েই আমাদের পৃথিবী। মানুষ এটিকে নির্দয়ভাবে ও নির্বিচারে ব্যবহার করছে, ফলে বিশ্ব ব্যবস্থাই আজ হুমকির মুখে। জীব-বৈচিত্র্য বিশ্ব পরিবেশের এক অনন্য উপকারী সত্ত্বা। বাস্তুতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জীব-বৈচিত্র্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস পালিত হচ্ছে। অথচ মানুষ এখনো এ ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠতে পারেনি। প্রতিনিয়ত মানুষ জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে গাছ কাটার মতো জঘন্য কাজ করে।  বিশেষত বিশ শতকের ৭০-এর দশক থেকে খাদ্য-বস্ত্রসহ মানুষের নানান ধারার চাহিদার পরিসর বিস্তৃত হওয়ার কারণে লাখ লাখ প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সম্প্রতি টিআইবির গবেষণায় বলা হয়, বন উজাড় হওয়ায় জীববৈচিত্র্য ধ্বংসসহ পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। টিআইবি জানায়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশে বার্ষিক বন উজাড় হওয়ার হার বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ, ২.৬ শতাংশ। গত ১৭ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৬৬ বর্গকিলোমিটার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইন ফরেস্ট ধ্বংস করা হয়েছে। আর বন বিভাগের হিসেবে সারাদেশে দখল হয়ে গেছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫৩ একর বনভূমি।

জীববৈচিত্র্য হলো পৃথিবীতে জীবনের জৈবিক বৈচিত্র্য এবং পরিবর্তনশীলতা।পৃথিবীর ১০ বিলিয়ন ভাগের একভাগ অংশতেই ৫০ মিলিয়ন প্ৰজাতির বিভিন্ন জীবজন্তু এবং উদ্ভিদের বসবাস।  বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য হলো জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে পৃথিবীব্যাপী সচেতনতা।  এদিকে মানুষ বংশ বিস্তার করছে চক্রবৃদ্ধি হারে।প্রতিনিয়ত খাবার ও বসবাসের জায়গা খুঁজছে মানুষ। বন জঙ্গল কেটে ফেলছে। নদীতে বাঁধ দিচ্ছে এবং বালু বা  মাটি কেটে নিচ্ছে।   ১৯৯২ সালের ২২ মে রাষ্ট্র, সরকার ও পৃথিবীর বড় বড় সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে ব্রাজিলের রিওতে শীর্ষ ধরিত্রী সম্মেলনএ জীব বৈচিত্র্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।মানুষের অমানবিকতা এবং অসচেতনতার অভাবে প্রতিনিয়তই এ সমস্যা প্রকট রূপ ধারণ করছে। ফলে বিপণ্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্যতা। বিশেষ করে শিল্পোন্নত ২০ দেশের উৎপাদিত ৮০ শতাংশ ক্লোরোফ্লোরো কার্বনডাই অক্সাইড দিচ্ছে বিশ্বের তাপমাত্রা। যার ফলে প্রাণীজগতের টিকে থাকার স্ব স্ব পরিবেশ বিপণ্ন হয়ে পড়েছে। যানবাহনের জন্য ব্যাপকহারে জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে। উন্নত জীবন যাত্রার জন্য বন্য প্রাণীর আবাস উজাড় হচ্ছে।

বিশ্ববাসীর ব্যবহারের জন্য একটি মাত্র পৃথিবী রয়েছে। আমাদের এই পৃথিবীতে বাস করে হাজারো প্রাণী। আধুনিক পৃথিবীতে এখন সব জায়গাতেই মানুষের পদচারণা। মানুষ এটিকে এতোটাই নির্দয়ভাবে ও নির্বিচারে ব্যবহার করছে। বর্তমানে সমস্ত বিশ্ব ব্যবস্থাই হুমকির দরজায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীর সৌন্দর্যের প্রধান অনুসঙ্গই হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। জীববৈচিত্র্যই পৃথিবীর সবুজ জীবের উপযোগিতা বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে জীববৈচিত্র্য চরমভাবে হুমকিতে পড়ে পৃথিবীর বৈচিত্র্যময়তাকেই ধ্বংস করছে। শিল্পের বহুমুখী বিকাশের সাথে সাথে বিভিন্ন দেশে যে হারে জল, বায়ু, মাটি, সবুজ এবং প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ সমূহের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, তাতে পরিবেশ দূষণ ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বময়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থা খুবই করুণ। এছাড়া, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ক্ষেত্রে নদীর মুমূর্ষতাও একটি বড় কারণ। এক সময় বাংলাদেশে দেড় হাজারের মতো নদী ছিলো। এর মধ্যে ১৭টি নদী ইতোমধ্যেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। আর একশত ৫৮টি নদী এখন রুগ্ন। আটটি নদী বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে দেশে মাত্র একশ’ নদী রয়েছে যেগুলোতে স্বাচ্ছন্দ্যে নৌ চলাচল করতে পারে। এটা মনে রাখতে হবে যে, এই মাটি, ভূমি, বাতাস, পানি সবকিছুরই অংশীদার শুধু মানুষই নয় অপরাপর সব প্রাণী ও প্রজাতি। মানুষই বিভিন্ন ভাবে পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি করে পৃথিবীর পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। যার ফলে বিপন্ন হচ্ছে জীব বৈচিত্র্য। দূষণের পেছনে মানুষের চাহিদা আর অবস্থানের বিষয়টি দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত । যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণেও বেড়ে চলছে বিপর্যয়। পাহাড় কাটা,নদী ও মাটির গভীর থেকে বালু তোলার মতো অবিবেচক কাজও করে চলছে মহল একটি বিশেষ। শখের চাহিদা মেটাতে কিংবা ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে ও আসবাবপত্র বানাতে অবাধে নিজদের গাছ কাটা হচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে।

জীববৈচিত্রের কথা শুনলেই, আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুন্দরবনের চিত্র। তবে এই সময়ে সুন্দরবন আবারও প্রমাণ করল এটি বাংলাদেশের শুধু জীববৈচিত্রের সবচেয়ে বড় আধারই নয়, তা আমাদের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচও। প্রাকৃতিক দূর্যোগে বরাবরই সুন্দরবন মাতৃসুলভ আচরণ করে আসছে। ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের লোকালয়ে আঘাত হানার আগেই তার প্রবল শক্তি হ্রাস করে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে দেয় সুন্দরবন। ম্যানগ্রোভ বনটি বা্রবার যে ঘূর্ণিঝড়, ঝড়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে। তথ্য মতে, আমাদের দেশে সুন্দরবনসহ ৪০ প্রকারের স্তন্যপায়ী প্রাণী আজ বিপণ্ন। অতিবিপণ্ন বা সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে একশ’ আট প্রকারের উদ্ভিদ ও প্রাণী-প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। এছাড়া ৩৩ প্রজাতির পাখি, ৩৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২১ প্রজাতির গাছ এবং ২১ প্রজাতির মাছ এখন বিপন্ন। বন  ধ্বংস, পিটিয়ে মারা, শিকার, পর্যাপ্ত খাবারের অভাব ও প্রাকৃতিক বন্যা, মহামারি, দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড় ও আশ্রয়ের অভাবে এসব প্রাণীর সংখ্যা দিনে দিনে কমছে।

জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় একটি বৈশ্বিক। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা কোনো ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ নয়। প্রকৃতি, পরিবেশ ও জলবায়ুর সঙ্গে জীব বৈচিত্র্যের সম্পর্ক বিদ্যমান। পৃথিবীকে সুন্দর, পরিছন্ন ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষা করতে উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশকে জলবায়ুর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে বাঁচতে হলে একযোগে কাজ করতে হবে। মানুষ, প্রাণী ও প্রকৃতি মিলিয়েই আমাদের পৃথিবী। কিন্ত এই জীবমন্ডলের সঙ্গে মানুষ এতটাই নির্দয় ও নির্বিচার আচরণ করছে, যার ফলাফল হিসেবে বিশ্ব ব্যবস্থা হুমকির মুখে।

চারদিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, নদীভাঙন, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার, বহু বন্য প্রাণীর সংকটাপন্ন অবস্থায় চলে যাওয়া-সব মিলিয়ে এবার দিবসটি বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে। জীববৈচিত্র্য আমাদের অস্তিত্বের সুরক্ষা।তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। এটি অরক্ষিত করে আমরা সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকতে পারি না। এজন্য আমাদের ঐতিহ্যকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।

লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)