শিরোনাম:
পাইকগাছা, বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

SW News24
বৃহস্পতিবার ● ১৮ জানুয়ারী ২০২৪
প্রথম পাতা » মুক্তমত » সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া আহরণ বন্ধ করতে হবে
প্রথম পাতা » মুক্তমত » সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া আহরণ বন্ধ করতে হবে
৪২ বার পঠিত
বৃহস্পতিবার ● ১৮ জানুয়ারী ২০২৪
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া আহরণ বন্ধ করতে হবে


     --- প্রকাশ ঘোষ বিধান

  জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম। এ সময় সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরা নিষিদ্ধ। তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে  বনের বিভিন্ন নদী ও খালে অবাধে ডিমওয়ালা মা কাঁকড়া শিকার চলছে।প্রজনন মৌসুম ডিমওয়ালা কাঁকড়া শিকার করায়  কাঁকড়া বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।তেমনি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়েছে। 

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশ।আর জলভাগের পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার, যা পুরো সুন্দরবনের আয়তনের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ। সুন্দরবনের জলভাগে ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া ও ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ আছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এ দুই মাস কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম হওয়ায় ৫৯ দিনের জন্য জেলেদের সুন্দরবনে প্রবেশ করে কাঁকড়া ধরার অনুমতি বন্ধ রাখে বন বিভাগ।


বিশ্বের অন্যতম মৎস্য সম্পদ কাঁকড়ার প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র হলো ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল।আর বিশ্বের প্রধানতম ম্যানগ্রোভ এলাকা হলো সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকা। এখান থেকে আহরিত কাঁকড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে।বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ও দাম বেশি থাকায় প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা মানছেন না কাঁকড়া আহরণকারী ও ব্যবসায়ীরা। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এই ২ মাস জুড়ে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, হংকং, চীনসহ বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। আর এসব উৎসবের খাদ্য তালিকায় ডিমওয়ালা কাঁকড়ার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে ডিমওয়ালা ১ হাজার ৪শ থেকে ১ হাজার ৮শ টাকা কেজি দরে মা-কাঁকড়া বিক্রি হচ্ছে। এভাবে প্রজননকালীন কাঁকড়া শিকার চলতে থাকলে বাগদা ও গলদা চিংড়ির চেয়েও উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় এ সম্পদ অচিরেই বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।


বিশ্বখ্যাত শিলা কাঁকড়ার প্রধান উৎস সুন্দরবন।তাছাড়া এই বনে রয়েছে প্রায় ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া। প্রজনন বাড়ানোর লক্ষ্যে বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি সুন্দরবনে কাঁকড়া আহরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। কিন্তু এর তোয়াক্কা না করে সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগের বিভিন্ন স্টেশনের নদী ও খালে অবাধে ডিমওয়ালা মা কাঁকড়া শিকার করছেন অসাধু জেলেরা। ১ জানুয়ারি থেকে সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরার ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই জেলেদের কাঁকড়া ধরার পাস (অনুমতিপত্র) বন্ধ রাখা হয়েছে।

জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এই দুই মাস কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুমে  সুন্দরবনের লোনা পানিতে কাঁকড়া ডিম ছাড়ে। তবে মাঘ মাসের প্রথম আমবস্য বা পূর্ণিমায় সুন্দরবনের শিলা কাঁকড়া সব থেকে বেশী ডিম  ছেড়ে থাকে। ডিম ছাড়ার সময় নদ-নদী ও খালের কুল দিয়ে বিচারণ করে ডিমওয়ালা কাঁকড়া। এসময় ডিমওয়ালা কাঁকড়া কিছুটা শান্ত ও স্থির থাকে। সুন্দরবন ও উপকুল সংলগ্ন নদনদী খালে বন বিভাগের চোখ ফাকি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিম ওয়ালা কাঁকড়া ধরা হচ্ছে। ডিম ছাড়ার মৌসুমে অবাধে কাঁকড়া ধরায় কাঁকড়ার প্রজনন ও উৎপাদন আশংখাজনক হারে কমে যাওয়ায় ধারণা করছে বিশেষজ্ঞরা। ডিসেম্বর থেকে কাঁকড়ার ডিম হওয়া শুরু করে এবং জানুয়ারী ও ফেব্রুয়ারী মাস কাঁকড়ার ডিম ছাড়া শুরু করে। তাই প্রজনন মৌসুমে সরকারীভাবে কাঁকড়া ধরার উপর এই ২ মাস নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তার পরেও বন বিভাগের নির্দেশ অমান্য করে সুন্দরবন এলাকায় সারা বছরের মত ব্যাপক হারে কাঁকড়া ধরা অব্যাহত রয়েছে।

উপকূল এলাকার মৎস্য লীজ ঘের গুলিতে প্রচুর পরিমাণ কাঁকড়া পাওয়া যায়। তবে এ সময় মৎস্য লীজ ঘের গুলি আগামী মৌসুমের জন্য পানি নিষ্কাশন করে ঘের প্রস্তুত করায় ঘেরে কাঁকড়ার সংখ্যা কমে গেছে। ঘের এলাকায় কাঁকড়া না পাওয়ায় জেলেরা সুন্দরবন ও উপকুল সংলগ্ন নদনদী খাল থেকে কাঁকড়া শিকার করছে। বনের আহরণকৃত কাঁকড়া আড়ৎ বা বাজারে পৌছাতে পারলে সেটি হ্যাচারী কাঁকড়া বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। শীত মৌসুমে কাঁকড়ার ডিম হওয়ায় কাঁকড়া খেতে খুব সুস্বাদু হয়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁকড়ার চাহিদা ও দাম বেশি থাকায় জেলেরা মাছ ধরার পাস নিয়ে বনে ঢুকে কাঁকড়া শিকার করছে।

বন বিভাগের দাবি মতে শুধুমাত্র সুন্দরবনের নদনদীতে প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া আহরণ নিষিদ্ধ থাকলেও লোকালয়ের জলাভূমিতে এ আইন কার্যকর না থাকায় তেমন কোনো সফলতা আসছে না। তবে বনবিভাগের বিভিন্ন রেজ্ঞ অফিস  নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সুন্দরবন থেকে অবৈধভাবে কাঁকড়া শিকারের দায়ে জেলেদের আটক  করে আদালতে সোপর্দ করছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির চেয়ে কাঁকড়ার দাম ও চাহিদা বেশি। এ কারণে প্রজনন মৌসুম ও পরবর্তী সময়ে কাঁকড়ার শিকার বন্ধ এবং এ মূল্যবান মৎস্য সম্পদ রক্ষায় অভয়াশ্রম ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনসহ আইনি পদক্ষেপ গ্জরহণ করা রুরি হয়ে পড়েছে। শিকার নিষিদ্ধ সময়ে ডিমওয়ালা অন্য সব প্রজাতির পাশাপাশি শিলা কাঁকড়া প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে আহরণ করার ফলে কাঁকড়াভাণ্ডার খ্যাত সুন্দরবনে অচিরেই এ কাঁকড়ার বিলুপ্তি ঘটবে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে দ্রুত শিকার নিষিদ্ধ প্রজনন মৌসুমে সব ধরনের কাঁকড়া আহরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে সরকার ও বন বিভাগকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)