শিরোনাম:
পাইকগাছা, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ৩০ চৈত্র ১৪৩১

SW News24
মঙ্গলবার ● ১৯ মার্চ ২০২৪
প্রথম পাতা » মুক্তমত » জীবন রক্ষায় বন বাঁচাতে হবে
প্রথম পাতা » মুক্তমত » জীবন রক্ষায় বন বাঁচাতে হবে
৮২ বার পঠিত
মঙ্গলবার ● ১৯ মার্চ ২০২৪
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

জীবন রক্ষায় বন বাঁচাতে হবে

---

প্রকাশ ঘোষ বিধান

জলবায়ু পরিবর্তনের  বিপদ থেকে পরিবেশ রক্ষা করতে বনের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গাছ থাকলে নিরাপদ থাকবে পরিবেশ। অক্সিজেন বৃদ্ধির পাশাপাশি সবুজ বন পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় রাখে।

পৃথিবীতে প্রাণীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তাই সব ধরনের বনের গুরুত্ব ও তা টিকিয়ে রাখতে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই দিবসটির মূল লক্ষ্য। দিবসটিতে সবাইকে বন এবং বৃক্ষ সম্পর্কিত কার্যক্রম সংগঠিত করার জন্য স্থানীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়। এই কর্মকাণ্ডের মধ্যে বৃক্ষরোপন অভিযানও অন্তর্ভুক্ত। ১৯৭১ সালে ইউরোপীয় কনফেডারেশন অব এগ্রিকালচারের ২৩তম সাধারণ পরিষদে বিশ্ব বনায়ন দিবস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই চিন্তাধারাকে সামনে রেখে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা গাছের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১২ সালের ২৮ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বন দিবস প্রথম পালিত হয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দুটি আন্তর্জাতিক স্মারক যেমন বিশ্ব বন দিবস এবং আন্তর্জাতিক বন দিবসকে একত্রিত করে প্রতি বছর ২১ মার্চ উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। বন ও বনভূমির নিরাপত্তা রক্ষার্থে ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ২১ মার্চকে আন্তর্জাতিক বন দিবস ঘোষণা করা হয়। বিশ্বের প্রতিটি দেশে বন রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টির আহ্বান জানিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের বন বিভাগের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বন আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মোট ভূমির ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। এর আগে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী যা ছিল ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। এই হিসাবে বনের বাইরের গাছ আমলে নেয়া হয়নি। কিন্তু বন বিভাগের নতুন সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বনের বাইরে গাছের পরিমাণ মোট ভূমির ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এসব গাছের বেশির ভাগই বেড়ে উঠেছে মূলত সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে। সেই হিসাবে বনের ভেতর ও বাইরে বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মোট ভূমির সাড়ে ২২ শতাংশ। গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের মতে, পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বনভূমি। একটি বনে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ গাছ থাকে। একজন মানুষের শ্বাস নিতে বছরে ৭৪০ কেজি অক্সিজেন প্রয়োজন। আর গড়ে, একটি গাছ বছরে ১০০ কেজি পর্যন্ত অক্সিজেন দেয়। এ হিসেবে একজন মানুষের জন্য প্রয়োজন পড়ছে ৮টি গাছ।

২০১৫ সালে নেচার জার্নালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষের গাছ নিধনের কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত ৪৬ শতাংশ গাছ কাটা হয়েছে। আর তাই গাছের পরিমাণ কমে বিশ্বে বর্তমানে গাছ রয়েছে ৩.০৪ লাখ কোটি। ট্রপিক্যাল ফরেস্ট অ্যালায়েন্স ২০২০ অনুসারে, আমরা যদি কোনো পরিবর্তন না করি, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৭ লাখ বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে বিস্তৃত গ্রীষ্মমন্ডলীয় বন শেষ হয়ে যাবে।

সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, যদি এই হারে গাছ-গাছালি মারা যেতে থাকে, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতের আয়তনের সমান বনভূমি ধ্বংস হয়ে যাবে। অথচ ২০০০ এরও বেশি আদিবাসী সংস্কৃতিসহ প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মা দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন জঙ্গল পৃথিবীর বৃহত্তম বন। বিশ্বের ২০ শতাংশ অক্সিজেন উৎপন্ন হয় এ বন থেকে। তাই এ বনটিকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। এ বনটির সাথে সীমানা জুড়ে আছে নয়টি দেশের। দেশগুলো হলো ব্রাজিল, বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, গায়ানা, সুরিনাম এবং ফ্রেঞ্চ গুয়ানা। এই বনের ৬০ শতাংশই ব্রাজিলে অবস্থিত। বিশ্বের পরিবেশ গবেষকরা এ বনটি নিয়েও দুশচিন্তায় পড়েছেন। কারণ   বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ এই আমাজন বন প্রতি বছর আগুনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে, কিছু দাবানল এতটাই মারাত্মক ছিল যে যা সবাইকে পরিবেশ নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছে।

বাংলাদেশের বন বিভাগের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বন আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মোট ভূমির ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। এর আগে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী যা ছিল ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। এই হিসাবে বনের বাইরের গাছ আমলে নেওয়া হয়নি। কিন্তু বন বিভাগের নতুন সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বনের বাইরে গাছের পরিমাণ মোট ভূমির ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এসব গাছের বেশির ভাগই বেড়ে উঠেছে মূলত সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে। সেই হিসাবে বনের ভেতর ও বাইরে বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মোট ভূমির সাড়ে ২২ শতাংশ।

গাছ বা বৃক্ষ বিশুদ্ধ বাতাসের একটি উৎস এবং মানুষের জন্য নানা রকম ফল ও উপকরণ সরবরাহ করে। গাছপালা বা জঙ্গল রয়েছে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশে। ওই সব বন ও জঙ্গলে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মানুষ এবং ২ হাজারের বেশি আদিবাসী তাদের সংস্কৃতিসহ জীবিকা, ওষুধ, জ্বালানি, খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভর করে। দারিদ্র্য বিমোচনে ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বন শুধু আমাদের অক্সিজেনই সরবরাহ করে না, মানুষ, প্রাণী, পোকামাকড়, বন্য প্রাণীকে আশ্রয় দেয় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে ও আর্দ্রতার ভারসাম্য রক্ষা করে। পৃথিবীতে জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে, অক্সিজেন সরবরাহ করতে, পর্যটনশিল্প বিকাশে ও শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে গাছপালা কিংবা বনভূমি।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্বে মোট বনভূমির পরিমাণ ৪.০৬ বিলিয়ন হেক্টর। বনভূমির পরিমাণ পৃথিবীব্যাপী সমানভাবে বিস্তৃত নয়। বিশ্বের অর্ধেকের বেশি বনভূমি মাত্র বৃহৎ পাঁচটি দেশের (ব্রাজিল, কানাডা, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন) অধীন এবং বাকি বনভূমি পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে আছে।

দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন জঙ্গল পৃথিবীর বৃহত্তম বন। বিশ্বের ২০ শতাংশ অক্সিজেন উৎপন্ন হয় এ বন থেকে। তাই এ বনটিকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। বিশ্বের পরিবেশ গবেষকরা এ বনটি নিয়েও দুশচিন্তায় পড়েছেন। কারণ   বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ এই আমাজন বন প্রতি বছর আগুনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ শিল্পায়ন, কৃষি সম্প্রসারণ ও নগরায়নের ফলে বিশ্বব্যাপী বন ও বনভূমি হ্রাস পাচ্ছে। পৃথিবীতে জীবের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বন অপরিহার্য। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করেছে। এতে করে সমুদ্র উপকূলের নিচু এলাকা তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আমাদের দেশের নিচু এলাকাও সাগরের লোনা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য সারা বিশ্বে বনভূমি বৃদ্ধি করা উচিত বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে প্রতি বছর উজাড় হচ্ছে বনভূমি।

সুন্দরবন, প্রশস্ত বনভূমি যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলীর অন্যতম। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ তিনটি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের একটি হিসেবে গঙ্গা অববাহিকায় অবস্থিত।     দুই প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ এবং ভারত জুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের বৃহত্তর অংশটি ৬৬ শতাংশ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত। বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলীর অন্যতম সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। এই বনের রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমিরও খ্যাতি। প্রাণ ও প্রকৃতির এক লীলাভূমি এই বনে রয়েছে পাঁচ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৯৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৭৯ প্রজাতির পাখি, ১২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। সুন্দরবনের প্রধান বনজ বৈচিত্রের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে সুন্দরী, গেওয়া, ঝামটি গরান এবং কেওড়া। ১৯০৩ সালে প্রকাশিত প্রেইন এর হিসেব মতে সর্বমোট ২৪৫টি শ্রেণী এবং ৩৩৪টি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে।

বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঝড়-ঘূর্ণিঝড়, ভৌগোলিক অবস্থান ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে সুন্দরবন এবং এর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস তথা প্রাকৃতিক দুর্যোগের অশনিসংকেত শুনলেই বাংলাদেশের প্রত্যেক সচেতন মানুষের হৃদয়ের মানসপটে আশার প্রদীপ হয়ে ভেসে উঠে সুন্দরবন।   প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম সুন্দরবন। যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলসংলগ্ন মানুষকে প্রলয়ংকরী ঝড় বা সুপার সাইক্লোনের ছোবল থেকে জীবন রক্ষা করে চলেছে। বিশ্বের জীববৈচিত্র্যের বৃহত্তম আধার এই ম্যানগ্রোভ বনটি বাংলাদেশের অক্সিজেন ভান্ডার বা ফুসফুস হিসেবে আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অপরিসীম ভূমিকা পালন করছে। লাখ লাখ মানুষ সুন্দরবনের মাছ, মধু, গোলপাতা প্রভৃতি আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। সুন্দরবনের নদী-খাল বাংলাদেশের মাছের চাহিদার একটা বিরাট অংশ জোগান দিচ্ছে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনশিল্পে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। সরকারও এ বন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করছে। বর্তমানে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন এখন দাড়িয়েছে ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার। অক্সিজেনের অফুরান্ত ভান্ডার দেশের ফুঁসফুঁসখ্যাত ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইড সুন্দরবন এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেও সুন্দরবন এখন বেশ ঝুঁকির মধ্যে আছে। অতীতে নোনা ও মিষ্টিপানির সংমিশ্রণে সুন্দরীসহ অসংখ্য উদ্ভিদে পরিপূর্ণ ছিল সুন্দরবন।

মানুষ এবং বিভিন্ন আদিবাসী সংস্কৃতি তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য বনের উপর নির্ভরশীল। শুধু মানুষের অস্ত্বিই নয়, প্রাণী এবং পোকামাকড়কে আশ্রয়স্থল , বাতাসে অক্সিজেন, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং আর্দ্রতার ভারসাম্য বজায় রাখা, নদীতে মিষ্টি পানি সরবরাহকারী জলাশয়গুলো রক্ষাসহ পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রাখতে পৃথিবীতে বনের বিকল্প অসম্ভব। তাই প্রত্যেকেরই উচিত নিজ ও ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বার্থে বেশি বেশি গাছ লাগানো। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল এবং বনসংলগ্ন জনপদের মানুষের সচেতনতা বাড়াতে তাদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সভা, সেমিনারের আয়োজন করতে হবে। সুন্দরবন ব্যবহারকারীদের বন ও বনজসম্পদ সুরক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে হবে।

লেখক; সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)