শিরোনাম:
পাইকগাছা, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২

SW News24
সোমবার ● ১৬ মার্চ ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » বন ও গাছের গুরুত্ব
প্রথম পাতা » মুক্তমত » বন ও গাছের গুরুত্ব
৬৬ বার পঠিত
সোমবার ● ১৬ মার্চ ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

বন ও গাছের গুরুত্ব

--- প্রকাশ ঘোষ বিধান

পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষের ভূমিকা অপরিহার্য। এটি শুধু প্রকৃতির শোভাই বৃদ্ধি করে না, বরং আমাদের গ্রহের বাস্তুতন্ত্রের মূল ভিত্তি স্থাপন করে। বন ও গাছপালা পৃথিবীর ফুসফুস এবং প্রাণের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। এরা কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন সরবরাহ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ায় এবং মাটির ক্ষয়রোধ করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। এছাড়া, বন খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ, আশ্রয়স্থল এবং জীববৈচিত্র্যের অমূল্য ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে, যা জীবনের জন্য অপরিহার্য।

বন উজাড়ের ফলে জলবায়ুর ভারসাম্যহীনতা এবং জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটে। বন উজাড়ের ফলে আর্দ্রতার মাত্রা হ্রাস পায়, যার ফলে বাকি গাছপালা শুকিয়ে যায় এবং দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে। বনভূমি ধ্বংসের কারণে জীবের আবাসস্থল বিনষ্ট হচ্ছে, ফলে ধীরে ধীরে অনেক প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটছে। বন হলো পৃথিবীর ফুসফুস। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, বিশুদ্ধ পানি, বাতাস এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে বন। বনের গুরুত্ব শুধু পরিবেশের জন্যই নয়,মানুষের জীবনেও অপরিসীম। অক্সিজেন, পরিবেশের ভারসাম্য, প্রাণীজগতের আশ্রয় সবকিছুই বনের ওপর নির্ভরশীল।

বন, বন্যপ্রাণী এবং বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে উৎসাহিত করতে প্রতি বছর ২১ মার্চ বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক বন দিবস পালিত হয়। ২০১২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বন ও গাছের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বনায়ন উৎসাহিত করতে এই দিনটি ঘোষণা করে । দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো সব ধরণের বনের সুরক্ষা এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করা।

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী চরম উৎকণ্ঠার কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ংকর পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। অসময়ে ঝড়-বন্যার কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মানুষের জীবন। এ বিপর্যয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে বন। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বৃক্ষ মৌলিক ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৃক্ষ মিথস্ক্রিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। যেখানে গাছপালা ও বনভূমি বেশি, সেখানে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। ফলে ভূমিতে জলের পরিমাণ বাড়ে, যা কৃষিকাজ ও ফসলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও, বৃক্ষ মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, মাটির ক্ষয়রোধ এবং ঝড়বৃষ্টি ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় বন বা বনভূমির তুলনা চলে না। তাই মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু হলো বনভূমি।

বিশ্বের বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের একটি বিশাল অংশ বনের ওপর নির্ভরশীল। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বন কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে মুখ্য ভূমিকা রাখে। খাদ্য, জ্বালানি এবং কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বন মাটির উর্বরতা ও পানি সম্পদ রক্ষা করে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন, কৃষিভূমি সম্প্রসারণ, আবাসন প্রভৃতি নানা কারণে সংকুচিত হচ্ছে বনাঞ্চল। ফলে দেশের বন ও বন্যপ্রাণী আজ হুমকির সম্মুখীন। সারা দেশে বনভূমির অবৈধভাবে দখলের প্রবণতা দেখা যায়। দেশের সংরক্ষিত বনভূমির ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৩ একর জবরদখল হয়ে গেছে। অবৈধ জবরদখল উচ্ছেদের মাধ্যমে বনভূমি পুনরুদ্ধার ও তা সংরক্ষণে সরকার কাজ করছে এবং ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অবৈধ দখলে থাকা বনভূমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশে সরকার নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ হেক্টর, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৫.৫৮ শতাংশ। এর মধ্যে বন অধিদফতর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১৬ লাখ হেক্টর, যা দেশের আয়তনের প্রায় ১০.৭৪ শতাংশ। সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম এবং জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বর্তমানে বাংলাদেশের বৃক্ষ আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দেশের মোট আয়তনের ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

বন আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষ এবং বিভিন্ন আদিবাসী সংস্কৃতি তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য বনের উপর নির্ভরশীল। শুধু মানুষের অস্তিত্ব নয়, প্রাণী এবং পোকামাকড়কে আশ্রয় দেয়া, বাতাসে অক্সিজেন, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং আর্দ্রতার ভারসাম্য বজায় রাখা, নদীতে মিষ্টি পানি সরবরাহকারী জলাশয়গুলিকে রক্ষা করতে বনের গুরুত্ব অপরিসীম।

গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের মতে, পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বনভূমি। একটি বনে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ গাছ থাকে। একজন মানুষের শ্বাস নিতে বছরে ৭৪০ কেজি অক্সিজেন প্রয়োজন। গড়ে একটি গাছ বছরে ১০০ কেজি পর্যন্ত অক্সিজেন দেয়। ফলে মানুষের বেঁচে থাকা আর পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা একা হাতেই সামলায় বনাঞ্চলগুলো।

পৃথিবীর বৃহত্তম বন দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন জঙ্গল। বিশ্বের ২০ শতাংশ অক্সিজেন উৎপন্ন হয় এ বন থেকে। তাই এ বনটিকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। এ বনটির সাথে নয়টি দেশের সীমানা জুড়ে আছে। দেশগুলো হলো ব্রাজিল, বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, গায়ানা, সুরিনাম এবং ফ্রেঞ্চ গুয়ানা।

গাছ পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অপরিহার্য উপাদান। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় গাছ অনস্বীকার্য। একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকার দেশের বিদ্যমান বনাঞ্চল সংরক্ষণ এবং বনায়ন কার্যক্রম জোরদার করেছে। জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে টেকসই বন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ ও বনের পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে বেশি বেশি গাছ লাগানো এবং বনাঞ্চল সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)