সোমবার ● ২২ জুন ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » বর্ষায় উপকূলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা
বর্ষায় উপকূলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা
বর্ষায় বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকার মানুষের জীবন হয়ে ওঠে চরম সংকটাপন্ন ও বিপর্যস্ত। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে নিয়মিত বৃষ্টি, পূর্ণিমার অস্বাভাবিক জোয়ার, এবং ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের কারণে প্রতি বছর উপকূলীয় জনপদের হাজার হাজার মানুষকে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়।
বর্ষায় আকাশের কালো মেঘ এবং উপকূলের কান্না এক আবেগঘন দৃশ্য। আকাশে কালো মেঘ জমে প্রকৃতির রূপ যেমন থমথমে ও বিষণ্ণ হয়ে ওঠে, তেমনি উপকূলের কান্না প্রকৃতির দুর্যোগ বা মানুষের দুঃখ-দুর্দশার প্রতীক। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষত আর উপকূলের কান্না ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা অবিরাম বর্ষণে উপকূলবাসীর ঘরবাড়ি ও জীবনের যে ক্ষতি হয়, তাকে বোঝায়। বর্ষায় এ অভিগজ্ঞতা উপকূলবাসীর জন্য নতুন কিছু নয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে বর্ষায় কালো মেঘ সবসময়ই আতঙ্কের নাম। আকাশজুড়ে যখন ভারী কালো মেঘ জমে, তখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে এবং শুরু হয় অঝোর বৃষ্টি। ঝড়-বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস আর বাঁধ ভাঙা নদীর রূপ তাদের জীবনে নিয়ে আসে কান্না ও হাহাকার। উত্তাল সমুদ্রের গর্জন, উপকূলের ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ আর বর্ষার দুর্যোগে তাদের ঘরবাড়ি হারানোর ভয়, সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে উপকূলের মানুষের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।
গ্রীষ্মের দাবদাহ শেষে যখন আকাশ ভারী কালো মেঘে ঢেকে যায়, তখন চারপাশ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায়। কালো মেঘের আড়ালে বিদ্যুতের চমকানি আর গর্জনে প্রকৃতি যেন তার রুদ্র রূপ প্রকাশ করে। মেঘলা দিনের এই থমথমে রূপ মানুষের মনে লুকানো বিষাদ ও গভীর আবেগ জাগিয়ে তোলে। সাগরের উত্তাল ঢেউ আর উপকূলের ভাঙন যেন মানুষের না বলা কষ্টের কান্না। বর্ষার মেঘের মতোই উপকূলের মানুষের হাহাকার আর অশ্রু মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসরত লাখ লাখ মানুষের জীবনপ্রবাহ প্রতি মুহূর্তে জলবায়ু পরিবর্তন এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে টিকে থাকার এক কঠিন উদাহরণ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার মতো স্থায়ী সমস্যাগুলো তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
অধিকাংশ উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধ অত্যন্ত নাজুক বা জরাজীর্ণ। বর্ষার জোয়ারের পানি ও প্রবল বৃষ্টিতে এই বাঁধ ভেঙে বা উপচে লোকালয় ও ফসলি জমি তলিয়ে যায়, যার ফলে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়। জোয়ারের নোনা পানি বাড়ির আঙিনা ও পুকুরে ঢুকে পড়ে। এর ফলে বর্ষার সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং পানিবন্দী মানুষদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। বছরের এ সময়টাতে উপকূলীয় এলাকায় ডায়রিয়া, আমাশয় ও চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ে। বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং স্যাঁতসেঁতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে। বর্ষায় নদী উত্তাল থাকায় জেলেরা মাছ ধরতে যেতে পারেন না। এছাড়া জলোচ্ছ্বাসের পানিতে ভেসে যায় চিংড়ি ঘের ও ফসলি জমি। এতে কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের মানুষের ঘরে ঘরে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দেয়। ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বর্ষা এলেই নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। অনেক পরিবার চোখের পলকে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়।
সিডর, আইলা, আম্ফান বা রেমালের মতো প্রবল শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলো বারবার আঘাত হেনে উপকূলের বেড়িবাঁধ ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। ফলে জোয়ারের নোনা পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে, ফসল ও মাছের ঘের তলিয়ে যায়। দুর্যোগের পরে সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ দেখা দেয় বিশুদ্ধ পানির। লবণাক্ত পানির কারণে চর্মরোগ ও পানিবাহিত রোগ মহামারি আকার ধারণ করে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে কৃষিজমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে স্থানীয় কৃষকরা ফসল ফলাতে পারে না। ফলে পেশা হারিয়ে বাধ্য হয়ে অনেকে পরিবেশগত উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়।
জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ এবং প্রয়োজনের তুলনায় সাইক্লোন সেন্টারের স্বল্পতার কারণে মানুষ চরম আতঙ্কে থাকে। দুর্যোগের পর ত্রাণ সহায়তা পৌঁছাতেও নানাবিধ আমলাতান্ত্রিক ও পরিবহন জটিলতা দেখা দেয়, যার ফলে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘমেয়াদী কষ্টের মধ্যে পড়েন। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য টেকসই কংক্রিটের বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নিরাপদ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা এবং কার্যকরী সাইক্লোন সেন্টার তৈরি করা সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।






বিশ্বজুড়ে সংকটে শরণার্থী
সংগীত মানুষের মনে নাড়া দেয়
বাদুড় কৃষি ও প্রকৃতির অপরিহার্য প্রাণী
শিকারি সাংবাদিকতা
ভিউ বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য ; সংকটে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা
মানুষের নামে পশুর নাম রাখা মানবমর্যাদার অপমান 