শিরোনাম:
পাইকগাছা, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

SW News24
শুক্রবার ● ২ অক্টোবর ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রাণীর ভূমিকা অপরিসীম
প্রথম পাতা » মুক্তমত » পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রাণীর ভূমিকা অপরিসীম
১২ বার পঠিত
শুক্রবার ● ২ অক্টোবর ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রাণীর ভূমিকা অপরিসীম

--- প্রকাশ ঘোষ বিধান

পরিবেশ ও প্রকৃতিতে প্রাণীর ভূমিকা অপরিসীম এবং পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বন্যপ্রাণী ও কীটপতঙ্গ এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করে। একটি সুস্থ ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে অণুজীব থেকে শুরু করে বিশাল আকারের হাতি পর্যন্ত প্রতিটি প্রাণীরই নির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।

৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণী দিবস অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হয়। গৃহপালিত কিংবা বন্য সব ধরনের প্রাণীর প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতা বন্ধ করা এবং তাদের নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করার জন্য সচেতনতা তৈরি করতে এই দিনটি পালন করা হয়।

প্রাণীদের অধিকার রক্ষা, তাদের কল্যাণের মাধ্যমে সার্বিক অবস্থার উন্নতি করা এবং বিশ্বজুড়ে প্রাণী কল্যাণ আন্দোলনকে জোরদার করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। প্রাণীদের কল্যাণ নিশ্চিত করা, অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ বাড়াতে সচেতনতা তৈরি করা। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণীকুলের ভূমিকা ও অবদানকে স্বীকার করা।

জার্মান লেখক ও প্রকাশক হেনরীক জিম্নারমেন প্রথম এই দিবসের প্রবর্তক। ১৯২৫ সালের ২৫শে মার্চ জার্মানির বার্লিন স্পোর্ট প্যালেসে ৫ হাজারেরও বেশি মানুষের উপস্থিতিতে প্রথম প্রাণী দিবস উদযাপন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯২৯ সালে প্রথমবার এই দিবসটি ৪ঠা অক্টোবরে পালন করা হয়। ১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রাণী সুরক্ষা কংগ্রেসে ৪ঠা অক্টোবরকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব প্রাণী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রতিটি প্রাণীর ভূমিকা অপরিসীম। পৃথিবীতে কোনো প্রাণীই অপ্রয়োজনীয় নয়; ছোট একটি কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে বিশাল আকারের তিমি বা হাতি সবাই মিলে প্রকৃতির একটি জটিল ও স্বয়ংক্রিয় ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে।

একটি সুস্থ ও সচল বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলতে প্রতিটি ছোট-বড় প্রাণীরই নিজস্ব এবং নির্দিষ্ট কার্যকারিতা রয়েছে। প্রতিটি প্রাণীই কোনো না কোনো খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ। তৃণমূল বা উদ্ভিদভোজী প্রাণী উদ্ভিদ খেয়ে বেঁচে থাকে, আবার মাংসাশী প্রাণী তাদের শিকার করে। এর ফলে কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির সংখ্যা অতিরিক্ত বাড়তে বা কমতে পারে না, যা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে।

ব্যাঙ, চড়ুই পাখি, মাকড়শা এবং বিভিন্ন ছোট পাখি ফসলের ক্ষতিকারক পোকা-মাকড় খেয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে বালাই নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না, যা পরিবেশ ও মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

বানর, পাখি, কাঠবিড়ালি ইত্যাদি প্রাণী ফল খাওয়ার পর তার বীজ দূরে ফেলে দেয় বা মলের মাধ্যমে ত্যাগ করে। এর ফলে বনের পরিধি বাড়ে এবং নতুন নতুন উদ্ভিদ জন্মায়। মৌমাছি, প্রজাপতি, পাখি এবং বাদুড়ের মতো প্রাণীরা উদ্ভিদের পরাগায়নে সরাসরি সাহায্য করে। পরাগায়ন না হলে ফুল থেকে ফল বা বীজ হতো না, যার ফলে পৃথিবীর অধিকাংশ উদ্ভিদ একসময় বিলুপ্ত হয়ে যেত। পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী ফল খাওয়ার পর মলত্যাগের মাধ্যমে বা শরীরের সাথে আটকে রেখে দূর-দূরান্তে উদ্ভিদের বীজ ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে নতুন নতুন এলাকায় বনাঞ্চল গড়ে ওঠে।

মৃত প্রাণী ও বর্জ্য পদার্থগুলোকে বিভিন্ন ছোট পোকা-মাকড় এবং অণুজীব ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দেয়। এই পচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাইট্রোজেন, কার্বন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান পুনরায় মাটিতে ফিরে আসে এবং নতুন উদ্ভিদ জন্মাতে সাহায্য করে। কেঁচো, উইপোকা এবং বিভিন্ন অণুজীব মাটিকে আলগা করে, যা উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদান গ্রহণে সাহায্য করে এবং মাটির উর্বরতা বাড়ায়। কেঁচোকে প্রকৃতির লাঙল বলা হয়, কারণ এটি মাটির উর্বরতা বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।

কিছু প্রাণী প্রকৃতির ঝাড়ুদার হিসেবে কাজ করে পরিবেশকে রোগজীবাণু মুক্ত রাখে। শকুন, কাক, হায়েনা এবং গুই সাপের মতো প্রাণীরা মৃত ও পচা প্রাণীর দেহাবশেষ খেয়ে পরিবেশকে দুর্গন্ধ ও রোগজীবাণুর হাত থেকে মুক্ত রাখে। তারা মূলত প্রকৃতির ময়লা পরিষ্কারকারী হিসেবে কাজ করে। এরা না থাকলে প্রকৃতিতে মহামারী বা নানাবিধ রোগ ছড়িয়ে পড়ত। মরা ও পচা জন্তু-জানোয়ার খেয়ে এরা পরিবেশ পরিষ্কার রাখে। এতে ব্যাকটিরিয়া বা মহামারী ছড়াতে পারে না।

জলজ ও স্থলজ প্রাণীরা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড ও অক্সিজেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। প্রাণীরা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করে, যা উদ্ভিদ নিজের খাদ্য তৈরির সালোকসংশ্লেষণ জন্য গ্রহণ করে। আবার উদ্ভিদ যে অক্সিজেন ত্যাগ করে, তা গ্রহণ করে প্রাণীকুল বেঁচে থাকে। এই পারস্পরিক আদান-প্রদান বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য বজায় রাখে।

প্রকৃতি একটি বিশাল জালের মতো, যেখানে প্রতিটি সুতো হলো একটি প্রাণী। একটি সুতো ছিঁড়ে গেলে পুরো জালটিই দুর্বল হয়ে পড়ে। বাস্তুতন্ত্রের একটি ছোট অংশ বা কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেলে পুরো শৃঙ্খলটি ভেঙে পড়ে। তাই মানবজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই আমাদের চারপাশের জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীজগৎকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ