শিরোনাম:
পাইকগাছা, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩

SW News24
শুক্রবার ● ৬ মার্চ ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » নারী দিবসের গুরুত্ব
প্রথম পাতা » মুক্তমত » নারী দিবসের গুরুত্ব
১০৩ বার পঠিত
শুক্রবার ● ৬ মার্চ ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

নারী দিবসের গুরুত্ব

--- প্রকাশ ঘোষ বিধান

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ৮ মার্চ। বিশ্বজুড়ে নারীদের অধিকার রক্ষা, কৃতিত্বের স্বীকৃতি এবং লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের অবদান ও সাফল্যকে এই দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানো হয়।  নারী শ্রমিকদের মজুরিবৈষম্য ও কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনের স্মরণে দিনটি পালন করা হয়, যা নারী অধিকার, সমঅধিকার, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। জাতিসংঘ ১৯৭৫ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিবসটি পালন করে আসছে, যা নারী মুক্তি ও ক্ষমতায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কের নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য ও বৈরী পরিবেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনের স্মরণে এই দিনটি পালিত হয়। নারী ও পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করে সমানাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরি করা এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। এই দিনটি নারী ক্ষমতায়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে অঙ্গীকার গ্রহণের তাৎপর্য বহন করে।

সারা পৃথিবীতেই সমাজের বেশির ভাগ জায়গায় লিঙ্গবৈষম্য বর্তমান রয়েছে। পুরুষরা এখনও বহু ক্ষেত্রে বেশি মাত্রায় সুবিধা ভোগ করেন। আর সেই কারণেই এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বৃপূর্ণ। শিল্প-সাহিত্যসহ সব ধরনের ক্ষেত্রে এবং সমাজের সমস্ত কাজে মহিলাদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতেই এই দিনটি পালিত হয়।

নারী দিবস উদ্‌যাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে এই ঐক্যবদ্ধ মিছিলে সরকারী বাহিনীর দমন-পীড়ন সারা বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হলো। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ; জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। সম্মেলন থেকে জোর দাবি জানানো হয় ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়ার। ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ দিবসটি পালিত হতে লাগল। অতঃপর ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করে জাতিসংঘ এবং দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায়। এরপর থেকে নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার অভীপ্সা নিয়ে সারা বিশ্বের সকল দেশে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস।

উন্নয়নের গতিধারায় বাংলাদেশে নারীরা যেভাবে উৎপাদনে নিজেদের নিয়জিত করেছে তা অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তি। কৃষি, শিল্প- কারখানা, অবকাঠামোগত নির্মাণ, অফিস-আদালতসহ সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীর কর্মক্ষমতা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। শ্রমবাজারে নারীরা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ সেটা যেমন স্বীকার্য একইভাবে আর্থিক অসঙ্গতির দুর্বিপাকে পড়ে বঞ্চিত হওয়ার দুঃসহ যন্ত্রণাও নারী-কর্মীদের নিত্য সঙ্গী। এই নির্মম অভিঘাতের আবর্তে  বঞ্চনার  শিকার শ্রমজীবী নারীরা। পোশাক শিল্পে দেশের অর্থনীতির সম্ভাবনায় নারীদের রয়েছে যুগান্তকারী ভূমিকা। সরকারী কিংবা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য নেই বললেই চলে। কিন্তু ব্যক্তি মালিকানাধীন কৃষি উৎপাদনশীল এবং শিল্প কারখানায় নারীরা বৈষম্যের দুর্বিপাকে আটকা পড়েছে। একজন সক্ষম কর্মজীবী নারী ওপর আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের চরম লঙ্ঘন। অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন রাস্তাঘাট, কালভার্ট, সেতু এবং বহুতল ভবন নির্মাণে নারী শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা পুরুষের তুলনায় কম দেয়া হয়, যা নীতিবহির্ভূত। শ্রম সময় ও ধরনের বেলায় কোন ফারাক নেই। কিন্তু শ্রমমূল্যে রয়েছে বিভাজন। নারী শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে তার মূল্যবান সময় এবং শ্রম বিনিয়োগ করে কিন্তু মজুরি আদায়ে তারা ভোগান্তির কবলে পড়ে। একইভাবে কৃষি কাজে নারী কৃষকের ভূমিকা কোন অংশে কম নয়। চারা রোপণ থেকে শুরু করে ধানের সার্বিক পরিচর্যা করে ঘরে তোলা পর্যন্ত নারীরা যেভাবে পায়ের ঘাম মাথায় ফেলে তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সেটা কোনভাবেই একজন পুরুষ কৃষকের চাইতে কম নয়। আর অবকাঠামো নির্মাণে শত শত নারী শ্রমিক এই বিভাজন থেকে মুক্ত নয়। নারীরা শুধু যে দেশের উৎপাদনশীলতায় কাজ করে তা নয় গৃহস্থালীয় যাবতীয় কাজকর্মও একজন গৃহিণীকেই সামলাতে হয়। সে শ্রমের মূল্য তো ধরাই হয় না। আর পারিবারিক এবং সাংসারিক কাজের দায় শুধুমাত্র মহিলাদের মনে করা হয়।

নারী দিবসের লক্ষ্য হলো এমন একটি পৃথিবী গড়া, যেখানে নারী-পুরুষের সমতা থাকবে এবং নারীরা কোনো ভয় বা বৈষম্য ছাড়াই নিজের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারবে। শুধুমাত্র ৮ মার্চের মধ্যে দিনটির গুরুত্ব আটকে রাখলে দিবসটি তার মর্যাদা হারাতে পারে। প্রতিদিনের কাজে নারীরা তার যথার্থ অধিকার এবং মর্যাদা অর্জন করতে না পারলে দিবসটির তাৎপর্য গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে।

লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)