শিরোনাম:
পাইকগাছা, শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

SW News24
সোমবার ● ২৫ মার্চ ২০২৪
প্রথম পাতা » মুক্তমত » স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতনের মূর্ত প্রতীক গুরুদাসী মন্ডল
প্রথম পাতা » মুক্তমত » স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতনের মূর্ত প্রতীক গুরুদাসী মন্ডল
২১৬ বার পঠিত
সোমবার ● ২৫ মার্চ ২০২৪
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতনের মূর্ত প্রতীক গুরুদাসী মন্ডল

 --- প্রকাশ ঘোষ বিধান

উনিশশো একাত্তরের অপারেশন সার্চলাইটে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের দ্বারা সংঘটিত একাত্তরের গণহত্যা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাত থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী নিজ দেশের জনগণের ওপর গণহত্যার যে পরিকল্পিত নৃশংসতা শুরু করে, তার ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এ গণহত্যাযজ্ঞে পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে যুক্ত হয় এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটি ও অবাঙ্গালি বিহারীরা। একাত্তরে এদের হাতে শিশু থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ,বয়ঃবৃদ্ধ কেউই রেহাই পায়নি। ধর্ম ও জাতিবিদ্বেষের শিকার হয়ে এদের দ্বারা নিগৃহিত ও নির্যাতিত হয়েছে লক্ষ-লক্ষ্ মানুষ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতনের এক মূর্ত প্রতীক  গুরুদাসী মন্ডল। লাখো ধর্ষিতার কাতারের একজন গুরুদাসী। ১৯৭১-এর রাজাকার, আলবদর ও পাক হানাদার বাহিনীর দোসরদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রেহাই পায়নি গুরুদাসী। খুলনা জেলার বটিয়াঘাটার বারোয়াড়িয়াতে স্বামী ও সন্তানদেরকে নিয়ে সুখের সংসার করছিলেন তিনি। কিন্তু নরপশুরা গুরুদাসীর স্বামী-সন্তানদেরকে তার চোখের সামনে নির্মমভাবে হত্যা করে।নির্বাক নিঃসঙ্গ গুরুদাসীকে তারা পালাক্রমে প্রতি রাতে বারোয়াড়িয়া রাজাকার ক্যাম্পে ধর্ষণ করত। গুরুদাসীকে পরিনত করেছিল যৌনদাসীতে। এখানেই শেষ নয়- তাকে দিয়ে রান্না করানো, কাপড় কাচানো, ঘর মোছা, থালাবাসন পরিস্কার করানোসহ ঝিয়ের মত ব্যবহার করত।

খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়নের কালিনগর গ্রামের  সাধারণ পরিবারের সুন্দরী গৃহবধু ছিলেন গুরুদাসী মণ্ডল।  গুরুদাসীর স্বামীর নাম ছিল গুরুপদ। পাইকগাছার বারোআড়িয়া বাজারে গুরুপদ-র দোকান ছিল, পেশায় ছিল দর্জি। গুরুপদ ছিল একজন সৎ কর্মঠ মানুষ। স্ত্রী গুরুদাসী, বড় পুত্র অংশুপতি, মেয়ে অঞ্জলি, খোকন ও পারুলকে নিয়ে ছিল তাঁদের সুখের সংসার। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁদের সুখের সংসারে দুর্যোগের মেঘ ঘনিয়ে আসে। এপ্রিলের শেষের দিকে গুরুপদ সপরিবারে ভারতে চলে যায়। মাতৃভূমির আকর্ষণ আবার তাদের দেশে ফিরিয়ে আসে। সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা শুনে তারা সীমান্ত পার হয়ে পাইকগাছা ফিরে আসে। আবার বারোআড়িয়ায় নতুন করে তার দোকান চালু করার উদ্যোগ নেয়। ইতোমধ্যে বারোআড়িয়ায় রাজাকার ক্যাম্প বসে গেছে। এখানে তারা সৃষ্টি করেছে এক ত্রাসের রাজত্ব। হত্যা, নির্যাতন, নারী ধর্ষণ তাদের কাছে ছিল এক প্রাত্যহিক ঘটনা। সাধারণ ক্ষমার ঘোষণায় বিশ্বাস করে গুরুপদ ফিরে আসায় তার প্রতি রাজাকারদের চোখ পড়ে যায়। বিশেষ করে তার ঘরে রয়েছে সুন্দরী যুবতী স্ত্রী। বারোআড়িয়ার রাজাকারেরা মুক্তিযোদ্ধা বলে ঘোষণা দিয়ে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায় গুরুপদকে। অকথ্য নির্যাতনের পর পরদিন সকলের চোখের সামনে নদীতে নামিয়ে গুলি করে হত্যা করে গুরুপদকে। শুধু তাঁকে নয়- তাঁর সঙ্গে হত্যা করা হয় বড় ছেলে অংশুপতি, ছোট ছেলে খোকন ও বড় মেয়ে অঞ্জলিকে। কোলের শিশু কন্যা পারুলকে কাঁদায় পুতে গুলি করে হত্যা করার পর গুরুদাসী জ্ঞান হারায়। এরপর রাজাকারেরা গুরুদাসীকে ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। ঐ ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়।---

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপ এ খবর পেয়ে ঈদের দিন রাজাকার ক্যাম্পটি আক্রমণ করে। স্থানীয় মুজিববাহিনীর কমান্ডার বিনয় সরকারের নেতৃত্বে এই রাজাকার ক্যাম্প আক্রমনে সেদিন খুলনার দু’জন মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ বিসর্জন দেন।এই ক্যাম্প দখলের যুদ্ধে শহীদ হন দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা জ্যোতিষ ও আজিজ। জ্যোতিষ ও আজিজ যুদ্ধ ও গোলাগুলি চলাকালীন ঐ মেয়েটি সামনের ঘর থেকে আর্ত চিৎকার করতে থাকে। জ্যোতিষ এ চিৎকার শুনে তার পজিশন থেকে উঠে দাঁড়াতেই  অমনি গুলিবিদ্ধ হয়। পাশে আজিজ ছিল সে জ্যোতিষকে ধরতে উঠে দাঁড়ালে সাথে সাথেই গুলিবিদ্ধ হয় এবং একই জায়গায় ২ জনেই মারা যায়। খুলনার সদর থানার ‘আজিজ-জ্যোতিষ’ সরণী আজও সে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। সন্মুখ-যুদ্ধে ওই রাজাকার ক্যাম্পের পতন হলে গুরুদাসী মুক্তি পান।

বারোআাড়িয়া ক্যাম্প থেকে আসার পর থেকে গুরুদাসী উন্মাদিনী। চোখের সামনে রাজাকার বাহিনীর হাতে স্বামী দুই পুত্র মেয়ে ও শিশুকন্যার নির্মম হত্যাযজ্ঞ তাঁকে তাড়িয়ে ফিরছে। যশোর খুলনার বিভিন্ন স্থানে তাঁকে দেখা যায়। শোক দুঃখের প্রতীক হয়ে সে লাঠি হাতে সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়, যাকে কাছে পায় তাকে সন্তান মনে করে আদর করতে চায়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার করুণ ক্রন্দন, বাংলাদেশ স্বাধীন করে কী পেইলাম। পেইয়েছি একখানা লাঠি যা দিয়ে তোদের পিঠে একটা বাড়ি দিয়ে বলি দশটা টায়া দে। তোরা না দিলি খাব কি ক’ দিবিনে তো একাত্তরে মা বললি ক্যান একথা বলে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলতো। ৭১-ই ছেলেমেয়ে সব হারাইছি। এত গুলি খরচ করলি আর একটা গুলি মারিলি না ক্যান। আমারে যে রাজাকার ধরে নিছিল সে এখনো বে্যঁইচে আছে। আমার কোলের বাচ্চাডারে মাটির মধ্যি পুঁতে গুলি করে মারিল। কত পায়ে ধরলাম ও আমার বুকের দুধ খায় ওরে মাইরো না। শুনলো না।

খুলনার মুক্তিযোদ্ধারা তাকে মা বলে সম্বোধন করতেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর খুলনার বিভন্ন রাস্তায় তাকে দেখা যেত বাঁশের চিকন একটি কঞ্চি নিয়ে ঘুরে বেড়াতে। হাত পেতে খাবারের জন্য টাকা চাইত।  মুক্তিযোদ্ধাদের বড় কোন অনুষ্ঠান হলে তাকে সেখানে দেখা যেত। মায়ের অধিকার নিয়েই প্রশ্ন করত, তোরা আজও ওদের বিচার করতে পারলি নে- যারা আমার স্বামী-সন্তানদের হত্যা করেছে।

গুরুদাসী মন্ডল বৃহত্তর খুলনার মুক্তিযোদ্ধাদের নয় খুলনাবাসীর অতি পরিচিত। কপিলমুনিবাসী তাঁকে মাসী বলে ডাকতেন, খুলনার মুক্তিযোদ্ধারা ডাকতেন মা বলে। স্বাধীনতা-উত্তর খুলনায় বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবস উদযাপন, ঘাতক দালালদের বিচারের দাবীতে অনুষ্ঠিত মানবন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠানে প্রায়ই তাকে দেখা যেত। হাতে বাঁশের ছোট কুঞ্চি নিয়ে ঘোরাঘুরি করতেন। উপস্থিত পরিচিত অপরিচিতদের আলতোভাবে আঘাত করে আনন্দ পেতেন গুরুদাসী। তাঁকে কেউ উত্যক্ত করলে বাঁশের কুঞ্চি উচিয়ে মারার ভয় দেখাতেন। সুযোগ বুঝে হাত পেতে টাকা চাইতেন। প্রায়ই খুলনা শহরে কামরুজ্জামান টুকুর বাসায় আসতেন এবং খাওয়ার সময় হলে না খেয়ে যেতেন না। শহরে পরিচিত মুক্তিযোদ্ধের বাসায় তাঁর আনাগোনা ছিল।

হাজারো শহীদের রক্ত ও মা-বোনের আত্মত্যাগের মহিমায় সঞ্জীবিত আমাদের দেশ, আমাদের স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছে। পাকহানাদার বাহিনীর দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন লক্ষ লক্ষ  নারী। স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্ষণের শিকার নারীদের সমাজে পুনর্বাসনের জন্য ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বর্তমানে তাঁদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের  ৩০ নভেম্বর কপিলমুনিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সচিব তপন কান্তি ঘোষের উপস্থিতিতে ৯ ডিসেম্বর কপিলমুনি মুক্ত দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন ও বীরাঙ্গনা গুরুদাসির স্বীকৃতির দাবি উত্থাপন করা হয়। এলাকাবাসীর দীর্ঘ দিনের প্রাণের দাবির প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়েরর সচিব তপন কান্তি ঘোষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ৭০ তম সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ২০২০ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাঁকে বীরাঙ্গনা হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়। গুরুদাসী মণ্ডলসহ ৬১ জন নারীর বিরঙ্গনা হিসেবে তালিকাভূক্ত করে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে সরকারের তালিকা ভুক্ত বীরাঙ্গনার সংখ্যা চারশত জনে উন্নীত হলো। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে সেই গুরুদাসী মণ্ডলকে ‘নারী মুক্তিযোদ্ধা’ স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। মৃত্যুর এক যুগ পর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান বীরঙ্গনা গুরুদাসী মন্ডল (মাসী)।

ইয়াসমিন কবীর গুরুদাসীকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরী করেছেন।এটি এখন একটি প্রামান্য দলিল। এ ছবিতে গুরুদাসী ইচ্ছা পোষণ করে গেছেন তার মৃত্যুর পর তাকে স্মরণে রাখতে যেন একটি সৌধ নির্মাণ করা হয়। এছাড়া শাহরিয়ার কবীর তার মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রামান্য দলিল ডকুমেন্টারীতে গুরুদাসীকে ধরে রেখেছেন।  যেগুলি বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসে প্রচারিত হয়ে থাকে।

পাগলীবেশে  বিভিন্ন প্রান্তে লাঠি হাতে ঘুরে ঘুরে পথচারীদের ভয় দেখিয়ে দু/পাঁচ টাকা উপার্জনকারী মানুষটি সব সময় বেশি কথা বলতেন। অতি প্রলাপের মূল বিষয় ছিল, কবে তার স্বামী-সন্তানদের হত্যাকারীদের বিচার হবে কবে। তার মাথা গোঁজার ঠাঁই বা আশ্রয়ের জন্য সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট স ম বাবর আলী এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (সাবেক সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব) মিহির কান্তি মজুমদার স্থানীয় কপিলমুনিতে সরকারি জায়গায় তার বসবাসের জন্য একটি বাড়ি তৈরি করে দেন।

খুলনায় ৭১-এর নির্যাতিত নারীর মূর্ত-প্রতীক বীরাঙ্গনা গুরুদাসী মন্ডল। গুরুদাসীর জীবন ও জগৎ ১৯৭১-এর দাবদাহে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। তার চোখের সামনে স্বামী ও সন্তানদের একে একে হত্যা করা হয়। প্রিয়জনদের চোখের সামনে বিভীষিকাময় মৃত্যু আর নিজের ওপর পাশবিক নির্যাতনে গুরুদাসী একসময় মানসিক ভারসাম্য হারান। কিন্তু স্বাধীন দেশে গুরুদাসী স্বস্তিতে জীবনযাপন করতে পারেনি। একটা লাঠি হাতে তাকে প্রায়ই পাইকগাছা-কপিলমুনি সড়কে উন্মাদিনীর মতো ঘুরতে দেখা গেছে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা তাকে মা বলে সম্বোধন ও সম্মান করতো  তবুও হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষগুলোর অম্লান স্মৃতি তাকে আমৃত্যু তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। ২০০৮ সালের ৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে  না ফেরার দেশে চলে যান বীরাঙ্গনা গুরুদাসী মন্ডল। গুরুদাসীর মরদেহ কপিলমুনি শ্মশানঘাটে দাহ করা হয়। বিজয়ের মাসে গুরুদাসীর চির বিদায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক; সংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)