শিরোনাম:
পাইকগাছা, রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩

SW News24
মঙ্গলবার ● ১৭ মার্চ ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » পানিই জীবন
প্রথম পাতা » মুক্তমত » পানিই জীবন
১৩৮ বার পঠিত
মঙ্গলবার ● ১৭ মার্চ ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

পানিই জীবন

---প্রকাশ ঘোষ বিধান

পানির অপর নাম জীবন কথাটি আক্ষরিক অর্থেই সত্য। পৃথিবীর সকল জীবের বেঁচে থাকার জন্য পানি অপরিহার্য। মানুষের শরীরের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এবং প্রোটোপ্লাজমের অধিকাংশ উপাদানই পানি। এটি বিপাকীয় কাজ, পুষ্টি উপাদান পরিবহন, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং কোশ বা কোষের কার্যকারিতা বজায় রাখতে অত্যাবশ্যক। পানি ছাড়া জীবন কল্পনা করা অসম্ভব, তাই পানিকে জীবনের সমার্থক বলা হয়।

পৃথিবী এবং মানবদেহের একটি বড় অংশ পানি দিয়ে গঠিত, যা বেঁচে থাকার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। মানবদেহের প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে ৭০শতাংশই পানি। শরীরের প্রতিটি কোষ, টিস্যু এবং অঙ্গের সঠিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে এটি সাহায্য করে। রক্ত সঞ্চালন, পুষ্টি সরবরাহ এবং খাদ্য হজমের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পানির মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। ঘাম এবং নিঃশ্বাসের মাধ্যমে পানি শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে ভূমিকা রাখে।

পৃথিবীর মোট আয়তনের প্রায় ৭১শতাংশ পানি। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরির জন্য পানি ব্যবহার করে, যা পরোক্ষভাবে প্রাণিজগতের অক্সিজেন এবং খাদ্যের জোগান দেয়। পানি ছাড়া আমাদের জীবন ধারণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমাদের শরীরের ৩ ভাগের ২ ভাগই পানি। প্রতিদিনের খাদ্য মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ভাত, রুটি, শাকসবজি, ফলমূল সবকিছুর মধ্যেই পানি রয়েছে। চুমুক দিয়েই কেবল পানি পান করা হয় তা নয়, আমরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতিনিয়ত পানি পান করছি। পানি পরিপাকতন্ত্রকে স্বাস্থ্যকর রাখে। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, পেটের পীড়া, পেটের রোগ না হতে সাহায্য করে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। পানি স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং শরীরকে চাঙা রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আমাদের দেহ একাধিক কোষের সমন্বয়ে গঠিত। দেহের গঠন ও কাজের একক হচ্ছে কোষ। কোষের অভ্যন্তরে স্বচ্ছ, আঠালো, জেলীর ন্যায় অর্ধতরল একধরনের পদার্থ আছে যাদেরকে বলা হয় প্রোটোপ্লাজম। এই প্রোটোপ্লাজমই কোষের তথা দেহের সকল মৌলিক জৈবিক কাজ সম্পন্ন করে থাকে। আর এজন্য প্রোটোপ্লাজমকে জীবনের ভৌত ভিত্তি বলা হয়। জীবনের ভৌত ভিত্তি প্রোটোপ্লাজমের ৭০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশই হচ্ছে পানি। এ জন্যই পানির অপর নাম জীবন বলার অন্যতম প্রধান একটি কারণ।

বিশুদ্ধ পানি পানে শরীর সচল ও শারীরিক সক্ষমতায় রাখে। শারীরিক সক্ষমতা হলো সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকার একটি অবস্থা, যা ক্লান্তি ছাড়াই দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদী রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। সারা দিন আমরা যত ধরনের খাবার খাই, তার মধ্যে একমাত্র পানিই ক্যালরি যা চর্বি, শর্করা ও চিনিমুক্ত। তবে পানির নিজস্ব কোনো ক্যালরি শক্তি নেই। পানি খাদ্য কিনা সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। আবার শরীরে ক্যালরি উৎপন্ন করা পানি ছাড়া সম্ভব নয়।

আমাদের শরীরের দুই-তৃতীয়াংশই হচ্ছে পানি। শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর সঠিক কর্মসম্পাদনে প্রয়োজন হয় পানি। পানি পান করলে তৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি শরীরের পানিশূন্যতা দূর হয়। ফলে শারীরিক ক্লান্তি দূর হওয়ার পাশাপাশি শক্তিও ফিরে আসে। পানি রক্তে ও কোষে অক্সিজেন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। এ ছাড়া সারা শরীরের রক্ত সরবরাহ ও সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়।

পানি রোগ প্রতিরোধে যুদ্ধ করে। শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে- যা সবসময় জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। পেটের অসুখ, ডায়রিয়া, পাইলস, ডায়াবেটিস,বমির ভাব, জরায়ু ক্যান্সার, ঋতুস্রাব সঠিক রাখে। চোখ, নাক-কান-গলা রোগ না হতে সাহায্য করে। পানি শরীরের রক্ত পরিষ্কার রাখে। ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে ও ত্বক পরিষ্কার রাখে। কিডনির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে ও মূত্রতন্ত্রের রোগ না হতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

মানুষের জীবন ধারণের জন্য অক্সিজেনের পরই পানি দ্বিতীয় উপাদান। মানুষের রক্তে ও কোষে পানি অক্সিজেন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে থাকে। মানবদেহে ২৫ শতাংশ অক্সিজেন পানি থেকেই আসে। পৃথিবীর সকল প্রকার প্রাণী, গাছপালা পানির ওপর নির্ভরশীল। বিষাক্ত পানি পান করে রোগ জটিলতায় মৃত্যুবরণ পর্যন্ত ঘটতে পারে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত গবেষণা মতে, পাইপলাইনের পানির ৮০ ভাগেই ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। পুকুর ও টিউবওয়েলের পানিতেও এই ক্ষতিকর অণুজীবের অস্তিত্ব মিলেছে। পাকস্থলী ও অন্ত্রের প্রদাহের জন্য ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়াকে দায়ী করা হয়। ভারী ধাতু মিশ্রিত পানি পান করলে দেহের এনজাইমের কার্যকারিতা নষ্ট, মস্তিষ্ক ও হাড়ের ক্ষয় এবং পঙ্গুত্ব হতে পারে। শুধু দুষিত পানি পানে প্রতিদিন বিশ্বে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন লোক মারা যায়। আর বাংলাদেশে প্রায় ৮০ জন লোকের মৃত্যু হয়।

পানির সংকট একটি বৈশ্বিক সংকট। পৃথিবীর মোট জলভাগের প্রায় ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশ হচ্ছে লোনাপানি আর বাকি ২ দশমিক ৭ শতাংশ হচ্ছে স্বাদু পানি। বিশ্বে স্বাদু পানির প্রায় ৬৯ শতাংশ রয়েছে ভূগর্ভে আর ৩০ শতাংশ মেরু অঞ্চলে বরফের স্তূপ হিসেবে জমা আছে এবং মাত্র ১ শতাংশ আছে নদী ও অন্যান্য উৎসে।

বাংলাদেশে কৃষি কাজে ব্যবহৃত মোট পানির ৭৮ ভাগ পানি হচ্ছে ভূগর্ভস্থ। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও অন্যান্য চাহিদা মিটাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। পরিবেশ বিপর্যয়, বিশ্বায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ণ, পানি দূষণ ও অপচয় হলো পানিসংকটের অন্যতম কারণ। মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পানি সংকট সৃস্টি হয়েছে। ওয়াটার এইডের গবেষণা মতে সুপেয় পানি পাচ্ছে না দেশের প্রায় আড়াই কোটি মানুষ। নিরাপদ পানির অধিকারবঞ্চিত বিপুল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই চরম দরিদ্র।

পানি ছাড়া মানব অস্তিত্ব অসম্ভব। পানির অপর নাম জীবন হলেও বাংলাদেশের ৪০ শতাংশ মানুষ এখনও সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত। পানি ছাড়া আমাদের জীবন ধারণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে, শুধুমাত্র বিশুদ্ধ এবং সুপেয় পানিই জীবনের জন্য উপকারী। পানি-ই জীবন আবার পানি-ই মরণ যদি তার ব্যবহার পদ্ধতিগতভাবে না হয়। কারণ পানিবাহিত অনেক রোগ আছে। এক ফোঁটা নোংরা পানিতে ৫ কোটির ও বেশি জীবাণু থাকতে পারে। অনিরাপদ বা দূষিত পানি পান করলে পানিবাহিত নানা রোগের ঝুঁকি থাকে।

পানির প্রতিটি ফোঁটা মূল্যবান। আমাদের ছোট ছোট সচেতনতাই সবার জন্য নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে পারে। নিরাপদ পানি ও এর অপচয় রোধ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা, কারণ পৃথিবীর মাত্র ২.৫ শতাংশ পানি পানযোগ্য। পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা আমাদের পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ