শিরোনাম:
পাইকগাছা, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩

SW News24
শুক্রবার ● ৩ এপ্রিল ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » দুর্যোগের মৌসুম শুরু; উপকূলে বাড়ছে আতঙ্ক
প্রথম পাতা » মুক্তমত » দুর্যোগের মৌসুম শুরু; উপকূলে বাড়ছে আতঙ্ক
৮৬ বার পঠিত
শুক্রবার ● ৩ এপ্রিল ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

দুর্যোগের মৌসুম শুরু; উপকূলে বাড়ছে আতঙ্ক

---প্রকাশ ঘোষ বিধান

বাংলাদেশে প্রতিবছর এপ্রিল ও মে মাসকে ঘূর্ণিঝড় ও কালবৈশাখীর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রধান মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময় তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকি ও বজ্রপাতের ঘটনা বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া এপ্রিল-মে ও অক্টোবর-নভেম্বর ঘূর্ণিঝড়ের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সময়। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী হওয়ায় এই সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি পায় এবং উপকূলীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।

প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়মে আমাদের এই বদ্বীপ অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম শুরু। চৈত্র মাস শেষে কালবৈশাখির সময় শুরু হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে এখন বাতাসের গতিপথ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এপ্রিল ও মে মাস বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের জন্য সবসময় এক চরম আতঙ্কের সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের কারণে বঙ্গোপসাগরে এখন ঘন ঘন লঘুচাপ সৃষ্টি হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এই লঘুচাপগুলো খুব দ্রুত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার শক্তি সঞ্চয় করে।

১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে শুরু হয়েছে দুর্যোগের মৌসুম বা ডেঞ্জার পিরিয়ড, যার ফলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ও বেড়িবাঁধ ভাঙনের তীব্র আতঙ্ক বাড়ছে। বিশেষ করে মে মাসে দুর্যোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে, যা উপকূলবাসীকে সারাক্ষণ আতঙ্কে রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের তীব্রতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় জীবন ও জীবিকা হুমকিতে পড়েছে। বহু মানুকে কাঁদিয়ে এ সময়টি বারবার ফিরে আসে। উপকূলের মানুষদের এই সাত মাস বিভিন্ন ধরণের দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়। বিভিন্ন সময়ে প্রলয়ংকরী ঝড়গুলো বারবার উপকূলকে তছনছ করে দিয়েছে।

উপকূলে মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের এক নাম সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড়। বাংলাদেশের দক্ষিণে আছে বঙ্গোপসাগর যেটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য অন্যতম প্রধান সহায়ক। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে এপ্রিল-মে মাসে প্রায়ই শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অধিক ঘূর্ণিঝড় কবলিত দেশ। চৈত্র মাসের শেষ থেকে পুরো বৈশাখ মাসে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা প্রচণ্ড গতির ঝড় বা কালবৈশাখী দেখা যায়। এসময় বজ্র পাত, শিলাবৃষ্টি এবং কালবৈশাখীর মতো আকস্মিক দুর্যোগও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিতভাবে আঘাত হানে এবং ফসলের ক্ষতিসহ নানা ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করে।

উপকূলীয় এলাকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো নড়বড়ে বেড়িবাঁধগুলো। যুগ যুগ ধরে এই বাঁধগুলোই সমুদ্র ও নদীর সঙ্গে মানুষের টিকে থাকার প্রধান ঢাল হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এই বাঁধগুলো এখন আর মোটেই নিরাপদ নয়। সামান্য জলোচ্ছ্বাস হলেই বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেয় এবং পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। একবার লবণাক্ত পানি জমিতে প্রবেশ করলে সেই জমিতে চাষাবাদ খুব একটা ভালো হয় না।

প্রতিবছর বন্যা ছাড়া আরও নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে আঘাত হানে। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় এ দেশের জন্য এক চিরন্তন হুমকি। এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর-নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ে, যার সঙ্গে যোগ হয় ভয়াল জলোচ্ছ্বাস। অন্যদিকে, নদীভাঙন বাংলাদেশের একটি স্থায়ী সমস্যা। প্রতিবছর নদীর তীরবর্তী এলাকার বহু মানুষ তাদের বসতভিটা, জমিজমা নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এপ্রিল-মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের দিক থেকে আসা শক্তিশালী পশ্চিমা বাতাসের কারণে বাংলাদেশে প্রচুর বজ্রপাত ঘটে। এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, যা জনজীবনের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাত্র ২৬ দিনে বাংলাদেশে অন্তত ৯ বার মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ঘনঘন এই ভূকম্পন জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্ডিয়ান, ইউরেশীয় এবং বার্মিজ এই তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ায় এটি উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভূ-অভ্যন্তরে সঞ্চিত শক্তি যেকোনো সময় ভয়াবহ দুর্যোগে রূপ নিতে পারে। ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে বড় ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা কম। তবে ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় মাঝারি বা তীব্র মাত্রার ভূমিকম্পও এখানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে সক্ষম।

উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধিও একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা যা কৃষিজমি ও মিঠা পানির উৎসকে দূষিত করে তুলছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেই একটি বড় বাধা নয় বরং এটি পরিবেশগত ভারসাম্যকেও নষ্ট করে দেয়। দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুতি ঘটে, জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।

এপ্রিল ও মে মাস বাংলাদেশে প্রাক-মৌসুমী দুর্যোগের প্রধান সময়। বিশেষ করে তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও কালবৈশাখী। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে এ সময়ে তীব্র ঝড়, বজ্রপাত ও উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি, তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরম জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস আর ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় উপকূলীয় মানুষের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। প্রতিবছর এই সময়ে দুর্যোগের আমেজ শুরু হলেই বাঁধ ভাঙার ভয় আর জানমাল হারানোর আতঙ্ক জেঁকে বসে।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় আইলা ফণী, নার্গিস ইত্যাদি বিভিন্ন নামের ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের মানুষের উপর মারাত্মক প্রভাব রেখে গেছে। যা জনজীবনে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করেছিলো। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী ঝড়, এবং দুর্বল বেড়িবাঁধের কারণে লাখো মানুষ আতঙ্কে থাকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ মেরামতের উদ্যোগ নিতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব রয়েছে, যা দূর করা দরকার। এ সময় উপকূলীয় অঞ্চলে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

লেখক; সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)