শিরোনাম:
পাইকগাছা, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২

SW News24
শুক্রবার ● ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » সুন্দরবন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বনবিবি পূজা
প্রথম পাতা » মুক্তমত » সুন্দরবন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বনবিবি পূজা
১১১ বার পঠিত
শুক্রবার ● ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

সুন্দরবন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বনবিবি পূজা

---প্রকাশ ঘোষ বিধান

বনবিবি হলেন বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত সুন্দরবন অঞ্চলে মৎস্যজীবী, মধু-সংগ্রহকারী ও কাঠুরিয়া জনগোষ্ঠীর দ্বারা পূজিত এক লৌকিক দেবী। উক্ত জনগোষ্ঠীর মানুষেরা বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে বনবিবির পূজা করে। বনবিবি বনদেবী, বনদুর্গা, ব্যাঘ্রদেবী বা বণচণ্ডী নামেও পরিচিত।

বনবিবি অরণ্যের দেবী রূপে কল্পিত এবং অরণ্যচারী মানুষের দ্বারা পূজিত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি কখনও মুরগি বা কখনও বাঘের রূপ ধারণ করেন। ভক্তবৎসলা এই দেবীর কারও প্রতি আক্রোশ নেই বলেই কথিত। সুন্দরবনের মৎস্যজীবী, বাউয়ালি ও মৌয়ালরা তাঁকে রক্ষয়িত্রী জ্ঞানে পূজা করেন। তাঁদের ধারণা, বনের বাঘ ও ভূত-প্রেত প্রভৃতি অপশক্তির উপর কর্তৃত্ব করেন বনবিবি। তাই গভীর বনে কাঠ, গোলপাতা, মধু ও মোম সংগ্রহ করতে বা মাছ ধরতে যাওয়ার আগে তাঁরা বনবিবির উদ্দেশ্যে সিন্নি, ক্ষীর ও অন্নভোগ নিবেদন করেন। প্রতি বছর মাঘ-ফাল্গুন মাস নাগাদ বনবিবির বাৎসরিক পূজা হয়। এই পূজায় ব্রাহ্মণেরা পৌরোহিত্য করেন না, করেন নিম্নবর্ণীয় হিন্দুরা। বনবিবির পূজায় নিরামিষ নৈবেদ্য নিবেদনের রীতি আছে, বলি হয় না; কখনও বা তাঁর নামে জীবন্ত মুরগি ছেড়ে দেওয়া হয়।

ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোহর খুলনার ইতিহাস গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সুন্দরবন এলাকায় দক্ষিণরায়, বণিক ধোনাই ও মোনাই এবং গাজীর অস্তিত্বের কথা জানা যায়। ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের সুন্দরবন অঞ্চলেই মৎস্যজীবী, মধু-সংগ্রহকারী ও কাঠুরিয়া জনগোষ্ঠীর মানুষেরা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঘের হাত থেকে রক্ষা পেতে বনবিবির পূজা করেন। বনবিবি পূজা হল সুন্দরবন ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পূজা। যেখানে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বাঘ ও অন্যান্য হিংস্র প্রাণী থেকে সুরক্ষা পেতে বনবিবি নামক লৌকিক দেবীর আরাধনা করেন। যিনি বনের রক্ষাকর্ত্রী দেবী হিসেবে পূজিত হন এবং তার সাথে দক্ষিণ রায় ও কালুরায়ের মতো অন্যান্য বনদেবতাদেরও পূজা করা হয়। এই পূজা সাধারণত মাঘ মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয় এবং মধু সংগ্রহকারী, বাওয়ালি ও জেলেদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পূজার জন্য বনের ধারে বা লোকালয়ে ছোট ছোট থান (বেদী) তৈরি করা হয়। অনেক সময় বনের ভেতরেও স্থায়ী মন্দির থাকে। পূজায় সাধারণত মাটির তৈরি বনবিবি, তাঁর ভাই শাহ জঙ্গালী এবং শিশু দুখের মূর্তি ব্যবহার করা হয়। পূজাতে সিঁরনি (গুড় ও চালের মিশ্রণে তৈরি এক প্রকার প্রসাদ), বাতাসা এবং মুরগির ডিম বা মাংস (হাজত) উৎসর্গ করা হয়। এই পূজায় সাধারণত কোনো ব্রাহ্মণ পুরোহিতের প্রয়োজন হয় না। বরং স্থানীয় মুসলমান ফকির বা অ-ব্রাহ্মণ পূজারী পূজা পরিচালনা করেন।

ঐতিহ্যগতভাবে প্রতি বছর মাঘ মাসের শুরুতে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সুন্দরবনে প্রবেশ করার আগে বাঘের আক্রমণ থেকে বাঁচতে এবং মধু বা কাঠ সংগ্রহের সময় সুরক্ষা পাওয়ার জন্য বনবিবিকে স্মরণ ও পূজা করা হয়। মানুষজন বনবিবিকে ফুল, ফল, মিষ্টি ও মোমবাতি নিবেদন করেন এবং তাদের সুরক্ষার জন্য প্রার্থনা করেন।

বনবিবি হিন্দুসমাজে বনদুর্গা, বনচণ্ডী বা বনদেবী নামেও পূজিতা হন। তিনি মাতৃদেবতা, ভক্তবৎসলা ও দয়ালু। তাঁর মূর্তিও সুশ্রী ও লাবণ্যময়ী। হিন্দুদের পূজিতা মূর্তিতে তাঁর গায়ের রং হলুদ, মুকুট, কণ্ঠহার ও বনফুলের মালা পরিহিতা এবং লাঠি অথবা ত্রিশূলধারিণী। মুসলমান সমাজে বনবিবি পিরানি হিসেবে পরিচিত। ইসলামি-প্রভাবান্বিত মূর্তিগুলিতে তিনি টিকলির সঙ্গে টুপি পরিধান করেন, চুল বিনুনি করা, ঘাগরা-পাজামা বা শাড়ি এবং জুতো পরিহিতা। তবে উভয় মূর্তিকল্পেই তাঁর কোলে পুত্র রূপে দুখেকে দেখা যায়। বনবিবির বাহন বাঘ বা মুরগি। কোনও কোনও মন্দিরে তিন ব্যাঘ্র-দেবদেবী বনবিবি, দক্ষিণরায় ও কালুরায় একসঙ্গে পূজিত হন। আবার কোথাও বনবিবি-শাজঙ্গুলির যুগ্ম বিগ্রহও পূজিত হতে দেখা যায়।

বনবিবির পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি সুন্দরবনের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এটি মানুষকে লোভ সীমিত করতে এবং বন ও মানুষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে অনুপ্রাণিত করে। পূজার সময় স্থানীয়ভাবে মেলা, যাত্রা পালা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বনবিবি পূজা সুন্দরবনের জীবনযাত্রার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এক সম্মিলিত ধর্মীয় ঐতিহ্য, যা প্রকৃতির শক্তি এবং মানবজাতির পারস্পরিক নির্ভরতার প্রতীক।

লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ