শিরোনাম:
পাইকগাছা, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩

SW News24
বুধবার ● ৪ মার্চ ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » নদীর অধিকার রক্ষায় মানুষ দায়বদ্ধ
প্রথম পাতা » মুক্তমত » নদীর অধিকার রক্ষায় মানুষ দায়বদ্ধ
৯৬ বার পঠিত
বুধবার ● ৪ মার্চ ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

নদীর অধিকার রক্ষায় মানুষ দায়বদ্ধ

---প্রকাশ ঘোষ বিধান

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। হাজারো ছোট বড় নদী জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে এ দেশজুড়ে। কালের বিবর্তনে বর্তমানে অনেক নদ-নদী সংকটাপন্ন। দখলদারদের দৌরাত্ম্যে অনেক নদ-নদী ভরাট হয়ে অস্তিত্ব হারিয়েছে। এসব নদী মরে যাওয়ায় চাষবাসে সংকট, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসসহ অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। নদীগুলি আবাসস্থল সংরক্ষণের জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এগুলি অনেক জলজ ও নদীতীরীয় উদ্ভিদ, বাসিন্দা এবং পরিযায়ী মাছ, জলপাখি, শিকারী পাখি, পরিযায়ী পাখি এবং অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নদীর প্রধান তিনটি কাজ হলো ক্ষয়, বহন, এবং সঞ্চয়। পার্বত্য প্রবাহে নদী পাথর কেটে ক্ষয় করে, মধ্যপ্রবাহে পলি-বালি বহন করে এবং নিম্নপ্রবাহে তা সঞ্চয় করে বদ্বীপ ও সমভূমি সৃষ্টি করে। এছাড়া, বন্যা, নদীভাঙ্গন এবং প্লাবনভূমির মাধ্যমে নদী প্রকৃতিরূপ পরিবর্তন করে।

নদীর উৎস বা পার্বত্য অঞ্চলে স্রোতের বেগ বেশি থাকায় নদী অববাহিকা ও তলদেশ কেটে গভীর উপত্যকা বা ভি আকৃতির উপত্যকা সৃষ্টি করে। ক্ষয়প্রাপ্ত বালি, পাথর, পলি ও কাদা নদীর স্রোতের সাথে প্রবাহিত হয়ে নদীপথে বাহিত হয়। নদীর গতি কমে গেলে বা মোহনায় পৌঁছালে বাহিত পলি ও বালি জমে প্লাবনভূমি, স্বাভাবিক বাঁধ, এবং বদ্বীপের মতো নতুন ভূমি তৈরি করে।

নদীপথে যাতায়াত সুবিধা এবং নদী উপত্যকাসমূহের পলিমাটি উৎকৃষ্ট কৃষিভূমি হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাসমূহ নদী উপত্যকায় গড়ে উঠেছে। নাব্য নদ-নদীসমূহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নগর গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের প্রায় সকল প্রধান শহর, নগর ও বাণিজ্যকেন্দ্রসমূহ বিভিন্ন নদীর তীরে গড়ে উঠেছে; যেমন- বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ঢাকা মহানগরী, শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দর, কর্ণফুলি নদীর তীরে চট্টগ্রাম, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ময়মনসিংহ শহর গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের নদীমালা এর গর্ব। দেশে নদ-নদীর সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক চলছে বছরের পর বছর। নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের গণনার সঙ্গে মেলে না নদী রক্ষা কমিশনের হিসাব, আবার এ দুই সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংখ্যার ছিল গরমিল। দেশে ১ হাজার ৪১৫টি নদ-নদীর নতুন তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে বাপাউবোর ওয়েবসাইটে। সরকারের দুটি মন্ত্রণালয় ও তিনটি সংস্থা এবং নদীকর্মীদের সমন্বয়ে এটি প্রস্তুত করা হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে নদ-নদীর সংখ্যা এক হাজার আটটি। নদী গবেষক ও নদীকর্মীদের বেশ আপত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে। তারা বলছেন, দেশে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। এসব নদ-নদীর উপনদী ও শাখা নদী রয়েছে। উপনদী, শাখা নদীসহ দেশের নদীর মোট দৈর্ঘ্য হলো প্রায় ২২ হাজার ১৫৫ কিলোমিটার। দেশে হাজারো নদী-উপনদী সমন্বয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নদীব্যবস্থা গড়ে ওঠেছে। ছোট ছোট পাহাড়ি ছড়া, আকাবাঁকা মৌসুমি খাড়ি, কর্দমপূর্ণ খালবিল, যথার্থ দৃষ্টিনন্দন নদ-নদী ও এদের উপনদী এবং শাখানদী সমন্বয়ে বাংলাদেশের বিশাল নদীব্যবস্থা গড়ে ওঠেছে। কিছু কিছু স্থানে যেমন, পটুয়াখালী, বরিশাল এবং সুন্দরবন অঞ্চলে নদীনালা এতো বেশি যে সে অঞ্চলে প্রকৃতই নদীজালিকার সৃষ্টি হয়েছে।

নদী হারাচ্ছে তার বৈশিষ্ট্য, অন্যদিকে দূষণের মাত্রাও বাড়ছে। বিশেষ করে পানিতে বর্জ্য মিশ্রণের ফলে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে নদীগুলো। নদীর প্রতি দায়বদ্ধতা মনে করিয়ে দিতে ১৪ মার্চ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস। নদী রক্ষা ও এর প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা মনে করিয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। নদী দখল ও দূষণ রোধ, জলাধার রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নদীর ওপর ক্ষতিকর অবকাঠামো নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো। সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে দিবসটি পালন করা হয়। দখল হওয়া নদী ও বিভিন্ন স্থানে গতিপথ পরিবর্তন, নাব্য হারিয়ে নদীভাঙন ব্যাপক হচ্ছে। এ নদীগুলো বাঁচানোর আকুতি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন পরিবেশবাদীরা।

১৯৯৭ সালে ব্রাজিলে কুরিতিবা শহরে এক সমাবেশ থেকে এ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে এক হয়েছিলেন বিভিন্ন দেশে বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। নদীর প্রতি মানুষের করণীয় কী, নদী রক্ষায় দায়িত্ব, মানুষের দায়বদ্ধতা কতটুকু, এসব বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে নদীকৃত্য দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১৯৯৭ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সাল থেকে নদী সুরক্ষায় করনীয় অর্থাৎ নদীকৃত্য দিবস বিশ্বব্যপী পালিত হয়ে আসছে।

২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট একটি রায়ে নদীকে জীবন্ত সত্তা (লিভিং এনটিটি) বলে আদেশ জারি করেন। এর অর্থ মানুষের মতো নদীরও সুস্থ-সুন্দর থাকার অধিকার রয়েছে। রায়ে রাষ্ট্রকে এই অধিকার নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। নদী দখল, দূষণ ও ভরাটের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই নির্দেশনা কার্যকর হয়নি। এরপর ২০১৯ ও ২০২০ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন প্রায় ৬৬ হাজার নদী দখলদারকে চিহ্নিত করে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করলেও সেই উচ্ছেদ সফল হয়নি। ফলে জীবন্ত সত্তা নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে।

মানবসৃষ্ট কারণগুলি, যেমন অতিরিক্ত শোষণ এবং দূষণ, সবচেয়ে বড় হুমকি এবং উদ্বেগ যা নদীগুলিকে পরিবেশগতভাবে মৃত এবং নদীগুলিকে শুকিয়ে দিচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণ প্রাকৃতিক পরিবেশে প্লাস্টিকের স্থায়িত্বের কারণে জলজ জীবন এবং নদীর বাস্তুতন্ত্রের উপর হুমকির সৃষ্টি করে।  প্লাস্টিক ধ্বংসাবশেষের ফলে কচ্ছপ, পাখি এবং মাছের মতো জলজ প্রাণী আঘাত প্রাপ্ত হয়, স্বাভাবিকভাবে খাদ্য গ্রহণ করতে   পারে না, যা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।  নদ-নদীর আশেপাশে মানুষের জীবিকাও প্লাস্টিক দূষণ দ্বারা প্রভাবিত হয় শিপিং এবং পরিবহন জাহাজের সরাসরি ক্ষতি, পর্যটন বা রিয়েল এস্টেট মূল্যের উপর প্রভাব, এবং ড্রেন এবং অন্যান্য জলবাহী অবকাঠামো আটকে যাওয়ার ফলে বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ঘরোয়া ও শিল্পবর্জ্য নদীতে ফেলার অপসংস্কৃতি বহুকাল থেকেই চলে আসছে। ছোট-বড় শিল্প-কারখানাগুলো ভারী ধাতুর অপরিশোধিত বর্জ্যগুলো সরাসরি নদীতে ফেলছে। দেশের বেশির ভাগ নদীই দূষণ ও দখলের শিকার। সবচেয়ে দূষিত নদী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঢাকার বুড়িগঙ্গা। এই নদীতে ট্যানারি, টেক্সটাইল ও ইলেকটোপ্লেটিং কারখানাসহ শিল্প-কারখানার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে দূষিত হয়েছে। এতে নদী দূষিত ও ভরাট হচ্ছে। একই সঙ্গে দখল চলছে, যা পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে এবং জীবন-জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)