শিরোনাম:
পাইকগাছা, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২

SW News24
বৃহস্পতিবার ● ৫ মার্চ ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » সুন্দরবনের গোলগাছের পাতা ও ফল
প্রথম পাতা » মুক্তমত » সুন্দরবনের গোলগাছের পাতা ও ফল
৬ বার পঠিত
বৃহস্পতিবার ● ৫ মার্চ ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

সুন্দরবনের গোলগাছের পাতা ও ফল

---সুন্দরবনের গোলপাতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থকরী উদ্ভিদ। এটি মূলত পাম জাতীয় উদ্ভিদ। সুন্দরবনের নদী ও খালের পাড়ে যেখানে অল্প বা মাঝারি লবণাক্ততা থাকে, সেখানে এই গাছ সবচেয়ে ভালো জন্মে। বর্তমানে সুন্দরবন ছাড়াও বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন নদ নদীর তিরে ও লোকালয়ে এই গাছ জন্মে।

গোলপাতার নাম গোল হলেও এর পাতাগুলো আসলে ৩ থেকে ৯ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর কাণ্ড মাটির নিচে থাকে, শুধুমাত্র পাতাই ওপরের দিকে দেখা যায়। পূর্ণবয়স্ক ফলের কাঁদি গোলাকার হওয়ায় একে স্থানীয়ভাবে গোলপাতা বলা হয়।

সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ ঘর তৈরির ছাউনি হিসেবে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। এছাড়া এর রস থেকে গুড় তৈরি হয় এবং ফল খাওয়া যায়, যা খেতে বেশ সুস্বাদু। দক্ষিণাঞ্চলের পটুয়াখালী, বরগুনা ও খুলনার গ্রামাঞ্চলে গোলের গুড়ের কদর ব্যাপক। কৃষি বিভাগের হিসাবে উপকূলীয় জনপদে বছরে প্রায় ১০ হাজার টন গোলের গুড় উৎপাদিত হয়। শত শত পরিবার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এই কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

ঐতিহাসিকভাবে গোলফলের কাঁদি থেকে রস সংগ্রহের সংস্কৃতি এসেছে রাখাইন জনগোষ্ঠীর হাত ধরে। ১৭৮৪ সালে আরাকান থেকে আসা রাখাইনরা কক্সবাজার ও পটুয়াখালীতে বসতি গড়ে তারা সঙ্গে আনে রস সংগ্রহ ও গুড় বানানোর কৌশল। সেই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে উপকূলের গ্রামগুলোয়।

গোলপাতা দিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজন ঘরের ছাউনি দেয়। এ পাতার ছাউনি নির্মিত ঘরে গরমের সময় ঠাণ্ডা আর শীতের সময় গরম ভাব অনুভূত হয়। গোলপাতার ছাউনি চার-পাঁচ বছর টেকসই হয়। ঘরের ছাউনি ছাড়াও রান্নার জ্বালানি হিসেবে এটি ব্যবহার করা হয়। গোলপাতা গাছের বয়স পাঁচ বছর হওয়ার পর থেকে প্রতিবছর এই গাছের পাতা একবার কাটা যায়।

গোলফলের বাণিজ্যিক কেনাবেচা এখনো তেমনভাবে চালু হয়নি। সাধারণত বনজীবী বা উপকূলের মানুষই শখ করে শাঁস খেয়ে থাকেন। তবে উপকূলীয় অঞ্চলে সাধারণ মানুষ ও  পর্যটকদের কাছে গোলফল বিক্রি শুরু হয়েছে। অনেকেই গোলফল বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন।

সুন্দরবনে গোলগাছে ফুল ও ফল দেখা যায় সারা বছরই। তবে আষাঢ় মাসের দিকেই সবচেয়ে বেশি কাঁদি ধরে। প্রথমে ফুল ফোটে, তারপর ধীরে ধীরে তালের কাঁদির মতো লম্বা হয়ে ওঠে ফলভরা থোকাগুলো। প্রতিটি কাঁদিতে থাকে ৫০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত ফল। অপরিপক্ব অবস্থায় এগুলো কালচে-বাদামি রং ধারণ করে। তিন থেকে চার ইঞ্চি লম্বা প্রতিটি কোয়া দেখতে অনেকটা ছোট আকারের নারকেলের মতো, ওজন হয় ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম। শক্ত খোসা ভেঙে ভেতরের নরম শাঁস, খেতে অনেকটা তালশাঁসের মতো। এতে আছে প্রচুর ভিটামিন ও খনিজ উপাদান।

লোকজ চিকিৎসায়ও গোলফলের কদর কম না। স্থানীয় লোকজন বলেন, কৃমি দমন, পানিশূন্যতা পূরণ, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা চর্মরোগ নিরাময়ে এটি সহায়ক। শিকড় সেদ্ধ করে খেলে আমাশয় ও অনিদ্রার সমস্যার উপশম হয়।

গোলফলের কাঁদির আসল বিস্ময় লুকিয়ে আছে এর রসে। অগ্রহায়ণ মাস এলেই গাছিরা কাঁদির ডগা নুইয়ে দেন। এরপর ধারালো দা দিয়ে কেটে দেওয়া হয় ফলভরা থোকা, আর ঝরতে থাকে স্বচ্ছ রস। এই রসের ঘনত্ব খেজুরের রসের চেয়ে অনেক বেশি। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর মিষ্টত্ব বেড়ে যায়। এই রস থেকে তৈরি হয় গুড়, পিঠা, পায়েস। আবার অনেকে সরাসরি কাঁচা রসও পান করেন।

বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনের গভীরে যাঁরা অনুমতি নিয়ে গোলপাতা কাটতে যান, তাঁদের বলা হয় বাওয়ালি। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত চলে তাঁদের সংগ্রহ মৌসুম। কিন্তু এই কাজ ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায়ই বেঙ্গল টাইগার লুকিয়ে থাকে গোলপাতার ঝোপে, হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়লে প্রাণ হারানোর শঙ্কা থাকে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এভাবেই টিকে আছে বাওয়ালি সম্প্রদায়ের জীবন ও জীবিকা।

দেশভেদে গাছটির নাম ভিন্ন হলেও বৈশিষ্ট্য এক। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে একে বলা হয় গোলপাতা, মিয়ানমারে দানি, শ্রীলঙ্কায় জিং পল, মালয়েশিয়ায় বুয়াহ নিপাহ, ইন্দোনেশিয়ায় বুয়াহ আতপ, সিঙ্গাপুরে আত্তপ, ফিলিপাইনে নিপা আর ভিয়েতনামে দুয়া নুয়ক।

গোলপাতা শুধু একটি উদ্ভিদ নয়; এটি উপকূলীয় মানুষের জীবন, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঘরের জন্য দেয় ছাউনি, খাবারের জন্য দেয় রস, ওষুধের জন্য দেয় ফল ও শিকড়।  এটি উপকূলীয় মাটির ক্ষয়রোধে এবং সমুদ্রের ভাঙন থেকে তীরভূমি রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করে।

সুন্দরবনের গোলপাতা একটি অতি মূল্যবান পামজাতীয় ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ এবং এর ফলটি গোলফল নামে পরিচিত। এই গাছের পাতা ও ফল উভয়ই উপকূলীয় মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও গবেষণা। তাতে একদিন গোলপাতার গোলফল হয়তো হয়ে উঠবে বাংলাদেশের উপকূলের বড় অর্থনৈতিক সম্পদ।





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)