শিরোনাম:
পাইকগাছা, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩

SW News24
মঙ্গলবার ● ১০ মার্চ ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » রূপালী-ধূসর ধাতু ইউরেনিয়াম
প্রথম পাতা » মুক্তমত » রূপালী-ধূসর ধাতু ইউরেনিয়াম
৮০ বার পঠিত
মঙ্গলবার ● ১০ মার্চ ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

রূপালী-ধূসর ধাতু ইউরেনিয়াম

---ইউরেনিয়াম প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ভারী ধাতব মৌল। ইউরেনিয়াম হলো ৯২ পারমাণবিক সংখ্যাবিশিষ্ট একটি অত্যন্ত ভারী ও তেজস্ক্রিয় রূপালী-ধূসর ধাতু। এটি মূলত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে রেডিওআইসোটোপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রকৃতিতে পাওয়া যায় এবং এটি তেজস্ক্রিয় গুণসম্পন্ন।

ইউরেনিয়াম একটি মৌলিক পদার্থ। এর রাসায়নিক প্রতীক U এবং পারমাণবিক সংখ্যা ৯২। এটি পর্যায় সারণীর অ্যাক্টিনাইড সিরিজের একটি রূপালী-ধূসর বর্ণের ধাতু। একটি ইউরেনিয়াম পরমাণুতে ৯২টি প্রোটন এবং ৯২টি ইলেকট্রন রয়েছে, এরমধ্যে ৬টি যোজ্যতা ইলেকট্রন।

ইউরেনিয়াম হলো পর্যায় সারণীর ৯২তম মৌলিক পদার্থ, যা একটি রূপালি-সাদা রঙের ভারী ধাতু। অল্প পরিমাণ ইউরেনিয়াম জ্বালানি থেকে বিশাল পরিমাণ শক্তি পাওয়া যায়। একটি মুরগির ডিমের আকারের ইউরেনিয়াম প্রায় ৮৮ টন কয়লার সমান বিদ্যুৎ দিতে পারে। এক কেজি ইউরেনিয়াম থেকে যে পরিমাণ শক্তি পাওয়া যায়, তা প্রায় ১৫০০ টন কয়লার সমান। এটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান জ্বালানি। মাত্র ১ কেজি ইউরেনিয়াম-২৩৫ থেকে প্রায় ৪,৫০০ টন কয়লার সমান তাপশক্তি পাওয়া সম্ভব।

১৭৮৯ সালে জার্মান রসায়নবিদ মার্টিন হেনরিখ ক্ল্যাপ্রোথ এটি আবিষ্কার করেন। তিনি ইউরেনাস গ্রহের নামানুসারে এর নামকরণ করেন। প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ইউরেনিয়ামে মূলত দুটি আইসোটোপ থাকে: ইউরেনিয়াম-২৩৮ এবং ইউরেনিয়াম-২৩৫। এর মধ্যে ইউরেনিয়াম-২৩৫ হলো সেই বিশেষ উপাদান, যা পারমাণবিক বিক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন করতে পারে।

ইউরেনিয়ামের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান ব্যবহার হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। ইউরেনিয়াম ২৩৫ পারমাণবিক চুল্লিতে ফিশন বা বিভাজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের পরমাণু বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, যা দিয়ে পানি ফুটিয়ে বাষ্প তৈরি করা হয় এবং সেই বাষ্পে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়। বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রেক্ষাপটে ইউরেনিয়াম এখন আমাদের দেশের মানুষের কাছেও অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। এটি ভূত্বকের শিলা, মাটি, পানি এমনকি সাগরের পানিতেও সামান্য পরিমাণে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে মৌলভীবাজারের জুড়ী ও সিলেটের জৈন্তাপুরে এর সন্ধানের কথা জানা গেছে।

ইউরেনিয়ামের সবচেয়ে বড় ব্যবহার হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এর পরমাণু বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপ শক্তি উৎপন্ন হয়, যা দিয়ে বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে কার্বন-মুক্ত বিদ্যুৎ তৈরি করা হচ্ছে। সামান্য পরিমাণ ইউরেনিয়াম থেকে যে শক্তি পাওয়া যায়, তা বিপুল পরিমাণ কয়লা বা তেলের সমান।

উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক বোমা তৈরির মূল উপাদান। এছাড়া এর উচ্চ ঘনত্বের কারণে এটি যুদ্ধের ট্যাংকের বর্ম তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। এর উচ্চ ঘনত্বের কারণে এটি জাহাজের তলদেশ ভারি করতে এবং বিমানের কাউন্টারওয়েট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মহাকাশযানের জ্বালানি এবং দীর্ঘমেয়াদী শক্তি সরবরাহের উৎস হিসেবে ইউরেনিয়ামের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা ও প্রয়োগ রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে কার্বন-মুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উৎস হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা ইউরেনিয়ামের ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে ইউরেনিয়ামকে গ্রিন এনার্জির অন্যতম উৎস ধরা হয়। ইউরেনিয়াম-২৩৫ আইসোটোপের ফিশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয় বলে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎস।

রূপালী-সাদা রঙের এই তেজস্ক্রিয় ধাতুটি নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। ইউরেনিয়াম একটি তেজস্ক্রিয় এবং বিষাক্ত পদার্থ। ক্যান্সার নিরাময়ে রেডিওথেরাপি এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ইউরেনিয়াম থেকে প্রাপ্ত আইসোটোপ ব্যবহৃত হয়। এটি শরীরের সংস্পর্শে বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভেতরে প্রবেশ করলে ক্যান্সার বা কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। বিশ্বের জ্বালানি রাজনীতি এবং শক্তির লড়াইয়ে যে উপাদানটির নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তা হলো ইউরেনিয়াম। এটি যেমন একদিকে পৃথিবীর বুক চিরে অবারিত বিদ্যুৎ শক্তির জোগান দিতে পারে, তেমনি এর অপব্যবহারে মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে সভ্যতা।





আর্কাইভ