বুধবার ● ২৮ জানুয়ারী ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » জলাভূমি বাংলাদেশের এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ
জলাভূমি বাংলাদেশের এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ
প্রকাশ ঘোষ বিধান
পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের সমৃদ্ধ উদাহরণ হলো জলাভূমি। সুস্থ জলাভূমি জীববৈচিত্র্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে সাহায্য করে। বাংলাদেশে রয়েছে সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে জলাভূমির ভূমিকাগুরুত্বপূর্ণ।
প্রতি বছর ২রা ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে বিশ্ব জলাভূমি দিবস পালিত হয়। ১৯৭১ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী ইরানের রামসার শহরে কনভেনশন অন ওয়েটল্যান্ডস বা রামসার কনভেনশন গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিনটি উদযাপন শুরু হয়। জলাভূমির অবক্ষয় রোধ, এর টেকসই ব্যবহার এবং পরিবেশ ও মানবজীবনে জলাভূমির গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। জলাভূমির গুরুত্ব, পরিবেশগত ভূমিকা এবং এর সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই দিনটি পালিত হয়। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদীনালা, বিল, হাওর, বাঁওড়ের মতো বহু জলাভূমি এ দেশকে ঘিরে রেখেছে। দেশের ৭ থেকে ৮ লাখ হেক্টর ভূমি কোনো না কোনোভাবে জলাভূমির অন্তর্ভুক্ত। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মত্স্য, পর্যটনসহ নানা ক্ষেত্রে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো জলাভূমি। জীব বৈচিত্র্য সহ খাদ্য নিরাপত্তার জন্যে এই জলাভূমির ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড ২০০০ সালের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করেছে, হাওর ও জলাভূমি এলাকা অর্থ নিচু প্লাবিত অঞ্চল যাহা সাধারণত হাওর এবং বাওর বলিয়া পরিচিত। ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ১৯৯০-এর ১৮৭ নং অনুচ্ছেদে আছে, বদ্ধ জলমহাল বলিতে এরূপ জলমহাল বুঝাইবে যাহার চতুঃসীমা নির্দিষ্ট অর্থাৎ স্থলবেষ্টিত এবং যাহাতে মৎস্যসমূহের পূর্ণতা প্রাপ্তির জন্য বৎসরের নির্দিষ্ট সময়ে মৎস্য ধরার উপযোগী। সাধারণত, হাওর, বিল, ঝিল, হ্রদ, দিঘি, পুকুর ও ডোবা ইত্যাদি নামে পরিচিত জলমহালকে বদ্ধ জলমহাল বলিয়া গণ্য করা হয়। জাতীয় পানি নীতিতে আরও উল্লেখ আছে, হাওর, বাঁওড় ও বিল জাতীয় জলাভূমিগুলো বাংলাদেশের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যর ধারক এবং এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ।
পরিবেশ এর ভারসাম্য রক্ষা, জীব বৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস ও পর্যটন সহ নানা ক্ষেত্রে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হল জলাভূমি। এদেশের প্রাকৃতিক স্বাদু পানির মাছের প্রধান উৎস হল হাওর বেসিন অঞ্চল। জীব বৈচিত্র্য এর ক্ষেত্রে এদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ উদাহরণ হল হাওড় অঞ্চল ও সুন্দরবন। এছাড়া আড়িয়াল বিল ও চলন বিল এদেশের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি।
পৃথিবী বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ জলাভূমি সমৃদ্ধ সুন্দরবন। শুধু সমৃদ্ধ জীব বৈচিত্র্যই নয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষত সাইক্লোন এর হাত থেকে এদেশকে বাঁচানো এক অতন্দ্র প্রহরী হল সুন্দরবন।সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম অবিচ্ছিন্ন ম্যানগ্রোভ জলাভূমি, যা গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা ব-দ্বীপে বিস্তৃত। লবণাক্ত জলাভূমি জীববৈচিত্র্য, বিশেষ করে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, কুমির, এবং নানা প্রজাতির পাখির আবাসস্থল। বনে ২৯০টি পাখি, ১২০টি মাছ, ৪২টি স্তন্যপায়ী, ৩৫টি সরীসৃপ এবং ৮টি উভচর সহ ৪৫৯টি প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বাসস্থান রয়েছে। সুন্দরবন শুধুমাত্র একটি বন নয়, এটি একটি জটিল ও বৈচিত্র্যময় জলাভূমি যা দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং ১৯৯২ সালে সুন্দরবনকে রামসার সাইট হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ জলাভূমি পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী প্রাকৃতিক কার্বন সিংক। যা রেইনফরেস্টের তুলনায় ৫০ গুণ বেশি কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম । এগুলো বায়ুমণ্ডল থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে মৃত উদ্ভিদ পচে যাওয়ার আগেই মাটিতে সংরক্ষণ করে। সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ জোয়ারের জলাভূমি এবং সামুদ্রিক ঘাস কার্বন সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সমৃদ্ধ জীব বৈচিত্র্য এর আরেক নিদর্শন হল টাংগুয়ার হাওর। সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত টাংগুয়ার হাওরে ২০৮ প্রজাতির পাখি, ১৫০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, ১৫০ প্রজাতির মাছ, ৩৪ প্রজাতির সরীসৃপ ও ১১ প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে। প্রতি বছর শীতকালে প্রায় ২০০ প্রজাতির পরিযয়ী পাখির আগমন ঘটে এখানে। ২০০০ সালে টাংগুয়ার হাওরকে বাংলাদেশের ২য় রামসার সাইট হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা জেলায় ৩৭৩টি হাওর রয়েছে।
জলাভূমি মানে পতিত জমি না। প্রকৃতপক্ষে জলাভূমি হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ। আমাদের প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদের সিংহভাগের উৎস এবং নানা ধরনের জলজ সবজি ও পাখির আবাসস্থল জলাশয়গুলো। জলাভূমি জীববৈচিত্র্যের মূল্যবান আবাস্থল। জলাভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শস্য উৎপাদন কমার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের প্রাণ এই জলাভূমি তথা নদী, নালা, হাওর এর পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এর কোন বিকল্প নেই
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত দিক থেকে জলাভূমির গুরুত্ব অসীম। জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য জলাভূমি সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। জীববৈচিত্র্য, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য জলাভূমির ভূমিকা অপরিসীম।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট






ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা হুমকির মুখে
নারীর জীবিকা লড়াই
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে প্রাকৃতিক ভাবে সমৃদ্ধ
আফ্রিকার আকি ফল
সরস্বতী পূজার শাস্ত্রীয় গুরুত্ব
লোকাচার এবং শাস্ত্রীয় ধর্ম এক নয়
সুন্দরবন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বনবিবি পূজা
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
তীব্র শীত-কুয়াশায় কৃষিখাতে বিরূপ প্রভাব ; বাড়ছে কৃষকের দুশ্চিন্তা 