শিরোনাম:
পাইকগাছা, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩

SW News24
বৃহস্পতিবার ● ২ জুলাই ২০২৬
প্রথম পাতা » উপকূল » জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষের জীবন জীবিকা বদলে যাচ্ছে
প্রথম পাতা » উপকূল » জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষের জীবন জীবিকা বদলে যাচ্ছে
৫ বার পঠিত
বৃহস্পতিবার ● ২ জুলাই ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষের জীবন জীবিকা বদলে যাচ্ছে

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের প্রথাগত জীবন-জীবিকাকে মারাত্মক সংকটের মুখে ফেলেছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কৃষি, মৎস্য চাষ ও সুন্দরবন-ভিত্তিক সনাতন পেশাগুলো ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর আয় কমে যাচ্ছে এবং তারা বাধ্য হয়ে বাস্তুচ্যুত ও ঋণের জালে জর্জরিত হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ঘন ঘন দুর্যোগ উপকূলীয় মানুষের জীবিকায় ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস, ও নদীভাঙন তাদের প্রধান পেশা কৃষি ও মৎস্য আহরণকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। সুপেয় পানির তীব্র সংকট ও স্থায়ী জলাবদ্ধতায় অসংখ্য মানুষ বাধ্য হয়ে নিজেদের পেশা পরিবর্তন করতে বা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং জলোচ্ছ্বাসের সময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ায় বিস্তীর্ণ আবাদি জমি ফসল উৎপাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ধানসহ অন্যান্য প্রচলিত ফসল ফলাতে না পেরে কৃষকরা মারাত্মক খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছেন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক জলাশয় ও ঘেরের মাছ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক প্রজাতির মাছ ও কাঁকড়া বিলুপ্তির পথে, যা জেলেদের আয়ের প্রধান উৎসে বড় আঘাত হেনেছে।

জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশের ফলে আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে এবং ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। জলোচ্ছ্বাস ও বন্যায় চিংড়ি ঘের ও পুকুর ভেসে যাচ্ছে, এবং নদী-সাগরে মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় জেলেরা আয় হারাচ্ছেন।  দুর্যোগের কারণে বনের বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাওয়ালি ও মাওয়ালিদের আয় কমে গেছে।

নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত  প্রান্তিক কৃষক ও দিনমজুররা তাদের ঐতিহ্যগত পেশা হারিয়ে রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক বা দিনমজুর হিসেবে নতুন জীবিকা খুঁজছেন। স্থানীয়ভাবে কাজের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় প্রান্তিক দিনমজুররা তীব্র অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে ঘরবাড়ি মেরামত ও নতুন করে জীবিকা শুরু করতে মানুষ স্থানীয় মহাজন ও এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।

দুর্যোগের পর পুরুষরা কাজের সন্ধানে অন্যত্র পাড়ি জমালে নারীদের ওপর পরিবারের হাল ধরার পাশাপাশি গবাদিপশু রক্ষা ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার দ্বিগুণ চাপ তৈরি হচ্ছে। সুপেয় পানির তীব্র সংকটের কারণে উপকূলীয় নারীদের পানি সংগ্রহের পেছনে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়, যা তাদের আয়বর্ধক কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়। খাবার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া প্রতি বছর ঘরবাড়ি হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দুর্যোগের সময় গবাদিপশুর জন্য প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ খাবার পানি ও চারণভূমি তলিয়ে যায়। গবাদিপশুর খাদ্য সংকট এবং রোগবালাই বেড়ে যাওয়ায় প্রান্তিক খামারিরা নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। ভিটেমাটি হারিয়ে এবং জীবিকার উপায় না পেয়ে অনেকেই জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তারা দিনমজুর, রিকশাচালক বা ইটভাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ নিচ্ছেন। অনেক নারী উপকূল ছেড়ে শহরে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছেন। জীবিকা হারিয়ে উপকূলের হাজার হাজার মানুষ গ্রাম ছেড়ে ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরে বস্তিবাসী বা জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

আইপিসিসি ও বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তীব্র লবণাক্ততা, নদীভাঙন এবং উপর্যুপরি ঘূর্ণিঝড়ের কারণে উপকূলের প্রায় ৪ কোটি মানুষের আয়ের প্রধান উৎসগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে লাখ লাখ মানুষ স্থায়ীভাবে কাজ হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে বাধ্য হচ্ছেন।

দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় ও উপকূলীয় জীবিকা রক্ষার্থে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।





আর্কাইভ