শিরোনাম:
পাইকগাছা, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ৩০ চৈত্র ১৪৩১

SW News24
মঙ্গলবার ● ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
প্রথম পাতা » মুক্তমত » মার্কিউরাস নাইট্রাইট-এর আবিষ্কারক প্রফুল্লচন্দ্র রায়
প্রথম পাতা » মুক্তমত » মার্কিউরাস নাইট্রাইট-এর আবিষ্কারক প্রফুল্লচন্দ্র রায়
৮৭ বার পঠিত
মঙ্গলবার ● ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

মার্কিউরাস নাইট্রাইট-এর আবিষ্কারক প্রফুল্লচন্দ্র রায়

---

প্রকাশ ঘোষ বিধান

প্রখ্যাত বাঙালি রসায়নবিদ, বিজ্ঞানশিক্ষক, দার্শনিক  আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে বিশ্বের বুকে উঁচু করে আত্মপরিচয়ে পরিচিত করতে যে ক’জন মহাপুরুষ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের অন্যতম স্যার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তিনি একাধারে বিজ্ঞানী, শিক্ষক, শিল্পোদ্যোক্তা, সমবায়ী, সমাজসেবক ছিলেন। দেশী শিল্পায়ন উদ্যোক্তা প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন বেঙ্গল কেমিকালের প্রতিষ্ঠাতা এবং মার্কিউরাস নাইট্রাইট-এর আবিষ্কারক। ১৮৯৫ সালে তিনি মারকিউরাস নাইট্রিট আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কারটি তাঁকে বিপুল খ্যাতি এনে দেয়। বিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের জন্য ১৮৮৬ সালে তিনি সম্মান সূচক ডিগ্রী ১৮৮৭ সালে পি,এইচ,ডি, ১৯১১ সালে ডি,এস,সি ১৯৯২ সালে সি,আই,ই, এবং একই বছর দ্বিতীয় বার ডি,এস,সি উপাধি লাভ করেন। ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ সালে তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন।

১৮৬১ সালের ২ আগস্ট খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ূলী গ্রামে এক বনেদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তার পিতাহরিশচন্দ্র রায় এবং মা ভূবনমোহিনী দেবী। পিতা হরিশচন্দ্র রায় স্থানীয় জমিদার ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই প্রফুল্লচন্দ্র অত্যন্ত তুখোড় এবং প্রত্যুৎপন্নমতি ছিলেন। তার পড়াশোনা শুরু হয় বাবার প্রতিষ্ঠিত এম ই স্কুলে। ১৮৬৬ থেকে ১৮৭০ সাল এ চার বছর কাটে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রফুল্ল চন্দ্রের পিতা মাতা স্থায়ীভাবে কলকাতায় বসবাস শুরু করলে ১৮৭১ সালে পিতার আগ্রহে তিনি হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন, কিন্তু আমাশা রোগের কারণে তার পড়ালেখায় ব্যাপক বিঘ্নের সৃষ্টি হয়। বাধ্য হয়ে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। গ্রামে থাকার এই সময়টা তার জীবনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনে সাহায্য করেছে।বাবার গ্রন্থাগারে প্রচুর  বইপাঠে তার জ্ঞানমানসের বিকাশসাধনে প্রভূত সহযোগিতা করে। তাঁরপর তিনি ১৮৭৪ এ আলবার্ট স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৮৭৮ সালে এন্ট্রান্স পাস করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন কলেজে পড়েন এবং ১৮৮১ সালে এফ,এ পাশ করেন তিনি। ১৮৮২ সালে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি এবং অনার্স সহ স্নাতক শ্রেণীতে অসাধারণ মেধার বলে তিনি গিলক্রিইষ্ট বৃত্তি নিয়ে চলে যান এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়। এখান থেকেই বি,এস,সি ডিগ্রী নেন। ১৮৮৭ সালে রসায়নশাস্ত্রে মৌলিক গবেষণার জন্য এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিএসসি ডিগ্রি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের হোপ পুরস্কার পান।

১৮৮৮-তে কলকতায় ফিরে প্রফুল্লচন্দ্র শিড়্গকতা করতে চান। কিন্তু প্রথমেই বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো সররকার। তখন ইন্ডিয়ান এডুকেশনাল সার্ভিসের অধিনে শিড়্গকতা করছেন দেশ বরেণ্য সব শিক্ষবিদরা। প্রফুল্লচন্দ্রেরও সেই ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তিনি সেই সুযোগ পেলেন না। তাঁকে বলা হলো বেঙ্গল এডুকেশনাল সার্ভিসের অধীনে শিড়্গকতা করতে। তা-ই করলেন প্রফুল্লচন্দ্র। প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেন। তখন সেই কলেজের অধ্যাপক আরে বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, তিনি আবার প্রফুল্লচন্দ্রের ঘনিষ্ট বন্ধু। জগদীশচন্দ্র তখন গাছ নিয়ে গবেষণা করছেন, তাঁর সহকারী হয়ে প্রফুল্লও যোগ দিলেন সেই গবেষণায়। অধ্যাপনার পাশাপশি  একসময় নিজে নিজেই গবেষণা শুরু করেন। শুরু হয় তাঁর শিক্ষক ও গবেষকজীবন। ঘি সরষের তেল ও বিভিন্ন ভেষজ উপাদান নিয়েই তিনি প্রথম গবেষণা শুরু করেন।  ১৮৯৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে তাঁর প্রথম গবেষণা পত্রের নাম ছিল  অন দি কেমিক্যাল একজামিনেশন অফ সার্টেন ইন্ডিয়ান ফুড স্টাফস, পার্ট ওয়ান, ফ্যাটস অ্যাণ্ড অয়েলস। পরবর্তীকালে প্রফুল্লচন্দ্রের গবেষণার মূল বিষয় ছিল নাইট্রাইট যৌগ নিয়ে কাজ, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়। ১৮৯৬ সাল রসায়ন বিজ্ঞানের এক আশ্চর্য বছর।  সে বছরই প্রফুল্লচন্দ্র আবিষ্কার করলেন প্রায় অসম্ভব এক যৌগ মারকিউরাস নাইট্রাইট। তাঁর এই আবিষ্কার নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে। বিশ্বখ্যাত জার্নাল ন্যাচার তাঁর প্রশংসাবাণীতে লেখে; এ তো কম পাওয়া নয়। মারকিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কার অসম্ভবই বটে। কারণ মারকিউরাস হলো পারদের এক বিশেষ অবস্থা। এই অবস্থা খুব অস্থায়ী। অন্যদিকে নাইট্রোজেন আর হাইড্রোজেনের এক বিশেষ বন্ধনের নাম নাইট্রাইট। এই বন্ধনও খুব অস্থায়ী। দুই অস্থায়ী মিলেমিশে মারকিউরাস অক্সাইড তৈরি করছে সেটা আবার খুব স্থায়ী।

মারকিউরাস নাইট্রাইটের আবিষ্কার খুলে দেয় লবণ আবিষ্কারের নতুন দুয়ার। প্রফুল্লচন্দ্র একের পর এক নাইট্রাইট আবিষ্কার করেছেন। রসায়ন শাস্ত্রে গবেষণারত প্রফুল্ল চন্দ্র মারকুইরাস নাইট্রাইট এর মত রসায়ন শাস্ত্রে মৌলিক পদার্থ উদ্ভাবনে চমকে দেন বিশ্বকে। একসময় বিশ্বাবিজ্ঞানীরা তাঁকে একটা নতুন নামে ডাকতে শুরু করেন-মাস্টার অব নাইট্রাইটস। পি, সি, রায়ের কর্মকান্ডে লন্ডনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভারতবর্ষের মহীশুর, বেনারস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত করেন।

ব্যক্তিজীবনের চেয়ে দেশের ভালোটাই ছিল প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের কাছে সবচেয়ে বড়। তিনিই উপমহাদেশে প্রথম রাসায়নিক ও ওষুধ তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। নাম বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিটিউক্যাল লিমিটেড। এদেশের মানুষের বেকারত্ব ও দারিদ্র তাঁকে পিড়া দিত। দেশেরে মানুষের কর্মসংস্থান ও দেশীয় পন্য উত্পাদনে উত্সাহী করতে তিনি একে একে গড়ে তুলেছেন বেঙ্গল পটারি, বেঙ্গল এনামেল ওয়ার্কস, ক্যালকাটা সোপ, ন্যাশনাল ট্যানারিজের মতো শীল্প প্রতিষ্ঠান। লিখেছেন দেড়শোটিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ আর ইংরেজি বাংলা মিলিয়ে গোটা তিরিশেক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের ইতিহাস বিষয়ক বই। তাঁর সেরা কাজ উপমহাদেশের রসায়নচর্চার ইতিহাসহিন্দু রসায়ন শ্রাস্ত্রের ইতিহাস।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ১৮৮৯ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত ২৭ বছর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের শিক্ষকতা করেন। এরপর ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ১৯৩৭ সাল থেকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এত দীর্ঘ বর্ণাঢ্য শিক্ষকতার জীবন খুব কম মানুষের ভাগ্যে হয়েছে। তার বাচনভঙ্গী ছিল অসাধারণ যার দ্বারা তিনি ছাত্রদের মন জয় করে নিতেন খুব সহজেই। তিনি সকল ক্ষেত্রেই ছিলেন উদারপন্থী। বাংলা ভাষা তার অস্তিত্বের সাথে মিশে ছিল। তিনি বুঝেছিলেন, বাংলায় বক্তৃতা ছাত্রদের অনুধাবনের পক্ষে সহায়ক। তাই ক্লাসে বাংলায় বক্তৃতা দিতেন এবং পড়ার সময় বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের জীবনকাহিনী এবং তাদের সফলতার কথা তুলে ধরতেন। ফাদার অব নাইট্রাইট খ্যাত বিশ্ব বরেণ্য বিজ্ঞানী স্যার পি,সি, রায় ৭৫ বছর বয়সে পালিত অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেওয়ার পরও আট বছর বেঁচে ছিলেন। তিনি তুরণদের মাতৃভাষায় বিজ্ঞাচর্চায় উত্সাহী করেছেন । নিজে কখনো বিলাসীতা ধার ধারেননি।তার একটা বাড়ি পর্যন্ত্ম ছিল না। প্রেসিডেন্সি কলেজের একটা ঘরে বাকি জীবন কাটিয়েছেন। সেই সময়ও কেটেছে বিজ্ঞান কলেজের একটি ছোট কক্ষে, যেখানে ছিল একটি খাটিয়া, দুটি চেয়ার, খাবার ছোট একটি টেবিল, একটি পড়ার টেবিল ও একটি আলনা। খুব সাদামাটা পোশকা পরতেন।তবে তাঁর কাছে হাত পেতে কোনো গরীব-দুঃখি খালি হাতে ফেরেনি। অবসরের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে যা কিছু পাওনা ছিল, সব বিশ্ববিদ্যালকে দান করে গেছেন।  যেসব ছেলে তাঁর কাছে থাকত, তাদেরই একজনের হাতে মাথা রেখে তিনি ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন মাত্র ৮৩ বছর বয়সে বিশ্ব বরেণ্য বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)