শিরোনাম:
পাইকগাছা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২

SW News24
বুধবার ● ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
প্রথম পাতা » মুক্তমত » বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
৩০ বার পঠিত
বুধবার ● ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

---বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুমুখী ভূমিকা রয়েছে। সুন্দরবন বনজ সম্পদ, মৎস্য সম্পদ, পর্যটন এবং প্রাকৃতিক সুরক্ষার মাধ্যমে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখে। যা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

হিমালয়ের ভূমি ক্ষয়জনিত পলি, বালি ও নুড়ি হাজার বছর ধরে বয়ে আনা পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র নদ উপকূলে চরের সৃষ্টি করেছে। এ চর এবং জমা পলি মাটি সমুদ্র তীরবর্তী হওয়ায় লবণাক্ত জলের ধারায় সিক্ত হয়েছে। কালক্রমে সেখানে জন্ম নিয়েছে বিচিত্র জাতের উদ্ভিদ এবং গড়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা লোনা পানির বন। সুন্দরবনকে জালের মতো জড়িয়ে রয়েছে সামুদ্রিক স্রোতধারা, কাদা চর এবং ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ক্ষুদ্রায়তন দ্বীপমালা।

সুন্দরবন প্রাকৃতিক সম্পদের উৎস। কাঠ, জ্বালানি, মধু, মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতার মতো বনজ সম্পদ আহরণ,পর্যটন থেকে আয় করে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। বনের সুন্দরী, গেওয়া, গরান, জ্বালানি কাঠ, মন্ড এবং ঘর ছাওয়ার গোর পাতার মতো কাঁচামাল সরবরাহ করে কাঠশিল্প ও অন্যান্য শিল্পকে সহায়তা করে। বন থেকে বিপুল পরিমাণ কাঠ, জ্বালানি, গোলপাতা, মধু, মোম এবং ওষুধি গাছ আহরণ করা হয়, যা স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে।

দেশের মোট মৎস্য চাহিদার একটি বড় অংশ সুন্দরবন থেকে আসে। বনের নদ-নদী ও খালে প্রচুর পরিমাণে মাছ, কাঁকড়া এবং চিংড়ি পাওয়া যায়। যা বিদেশের বাজারে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। মোহনা অঞ্চল মাছ, কাঁকড়া, এবং শামুক-ঝিনুকের প্রজনন ক্ষেত্র, যা মৎস্যজীবীদের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করে। সামুদ্রিক খনিজ, মৎস্যচাষ এবং পরিবহণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বন্যপ্রাণী দেখতে দেশি-বিদেশি অসংখ্য পর্যটক ভিড় করেন। এটি বাংলাদেশের পর্যটন খাতের অন্যতম প্রধান উৎস এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে,যা শিল্প ও জীবিকার উৎস। ইকোট্যুরিজম গাইড, বোট অপারেটর ও হস্তশিল্প স্থানীয়দের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং রাজস্ব আয় বাড়ায়। পর্যটন, দুর্যোগ থেকে রক্ষা ও জীবিকার মাধ্যমে এই অবদান রাখছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। সুন্দরবন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই বনের আর্থিক অবদান বছরে পাঁচ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা।

সুন্দরবন সুরক্ষায় নানা অবহেলা থাকলেও সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে। সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল পেশাজীবীরা প্রধানত আটটি পণ্য বন থেকে সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তারা প্রধানত জ্বালানি কাঠ, মধু ও মোম, গোলপাতা, মাছ, চিংড়ি ও চিংড়ি পোনা, কাঁকড়া আহরণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। এই সাত পণ্য আহরণের মাধ্যমে এক হাজার ১৬১ কোটি টাকার সমপরিমাণ আর্থিক সম্পদ পাওয়া যায় সুন্দরবন থেকে।

প্রাকৃতিক সুরক্ষায় সুন্দরবন একটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করে।  ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি, শিল্প এবং জানমাল রক্ষা করার মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি সাশ্রয় করে। এ বন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় এলাকা ও সম্পদ রক্ষা করে, যা প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়াতে সাহায্য করে। কার্বন শোষণের মাধ্যমে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়তা করে।

বনের ওপর নির্ভর করে কাঠুরে, বাওয়ালি, মৌয়াল এবং জেলেসহ কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়। মধু সংগ্রহ, মাছ ধরা, বনজ সম্পদ আহরণ এবং পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে প্রায় অর্ধ মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান হয়। পশু-পাখি ও উদ্ভিদের আবাসস্থল হিসেবে সুন্দরবন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।

সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের অখণ্ড বনভূমি। ১৯৯৭ সালে সুন্দরবন ইউনেস্কো বিশ্বঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এর বাংলাদেশ ও ভারতীয় অংশ বস্তুত একই নিরবচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের সন্নিহিত অংশ হলেও ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্যের তালিকায় ভিন্ন ভিন্ন নামে সূচিবদ্ধ হয়েছে।সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিষয়াবলির অন্যতম।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (আইএফইএসসিইউ) এর সুন্দরবনের ওপর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, সুন্দরবন থেকে চার খাতে মোট ২২ ধরনের সেবা মেলে। এর মধ্যে তিন খাতের ওপর জরিপ চালিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এবং গবেষক দল। তাদের সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের পর্যটন খাত থেকে বছরে আসে ৪১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৫৩ মিলিয়ন ডলার। সুন্দরবন থাকার কারণে ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলীয় অঞ্চলের জীবন ও সম্পদ বড় ধরনের ক্ষতি ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। এই বনের কারণে বছরে তিন হাজার ৮৮১ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা পায়। জীবিকার মাধ্যমে বছরে এক হাজার ১৬১ কোটি টাকার সমপরিমাণ আর্থিক সম্পদ পাওয়া যায় এই বন থেকে। সুন্দরবন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নানা সেবা দিয়ে গেলেও টাকার অংকে এ সেবার মূল্যমান সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়নি এতদিন। যে কারণে আমাদের অর্থনীতিতে সুন্দরবনকে ততটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয়নি।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের গুরুত্ব অপরিসীম।  দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে যেমন, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সুন্দরবনকে ঘিরে অনেক সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। সুন্দরবনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা যথাযথ প্রকাশ ও প্রয়োগ করতে হবে। কোনোরকম অবহেলা না করে জাতীয় অর্থনীতিতে সুন্দরবনের অসামান্য অবদানকে কাজে লাগাতে হবে।





আর্কাইভ